জ্বর না কমলে কী করবেন
Advertisement
অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাধারণত জ্বর কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং শরীরে কোনো সংক্রমণ বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু যদি ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর না কমে বা বারবার ফিরে আসে, তবে তা মোটেও অবহেলা করা উচিত নয়। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে জ্বর, মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথার জন্য প্যারাসিটামলের সাধারণ মাত্রা হলো একবারে ৫০০ থেকে ১ হাজার মিলিগ্রাম, যা প্রয়োজনে প্রতি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পরপর সেবন করা যেতে পারে। ২৪ ঘণ্টায় কোনোভাবেই ৪ হাজার মিলিগ্রামের বেশি প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে না।
* জ্বর না কমার প্রধান কারণ
প্যারাসিটামল খাওয়ার পরেও যদি জ্বর ৩ থেকে ৫ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তবে এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে-
▶ ডেঙ্গু : তীব্র জ্বর, শরীর ব্যথা এবং মাথাব্যথা ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ। ডেঙ্গুজ্বর অনেক সময় প্যারাসিটামলেও সহজে কমতে চায় না। যে কোনো তীব্র ভাইরাল ইনফেকশনের কারণে যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লুতে জ্বর কয়েকদিন টানা থাকতে পারে এবং এর সঙ্গে কাশি, গলাব্যথা, তীব্র মাথাব্যথা, সর্দি বা নাক বন্ধ থাকে।
▶ টাইফয়েড ও ম্যালেরিয়া : ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ টাইফয়েড কিংবা পরজীবী ঘটিত রোগ ম্যালেরিয়ার কারণে দীর্ঘদিন শরীর উচ্চ তাপমাত্রায় ভুগে থাকে।
▶ ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) : মূত্রনালির সংক্রমণের কারণেও অনেকের বারবার কাঁপুনি দিয়ে উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর আসে।
▶ অ্যান্টিবায়োটিকের অপপ্রয়োগ : চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে শরীরে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, ফলে জ্বর কমে না।
* জ্বর হলে প্রাথমিকভাবে বাড়িতে করণীয়
জ্বর পুরোপুরি না কমা পর্যন্ত রোগীকে সঠিক নিয়ম মেনে ঘরে যত্ন নিতে হবে-
▶ পর্যাপ্ত বিশ্রাম : শরীরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার সুযোগ দিতে রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখুন।
▶ শরীর স্পঞ্জ করা : কুসুম গরম পানিতে সুতি কাপড় ভিজিয়ে রোগীর পুরো শরীর বারবার মুছে দিন। কপালে জলপট্টি দিন। ভুলেও অতিরিক্ত ঠান্ডা বা বরফ পানি ব্যবহার করবেন না।
▶ প্রচুর তরল খাবার পান : জ্বরের সময় ঘামের কারণে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে। তাই রোগীকে প্রচুর পানি, ডাবের পানি, ফলের রস এবং পাতলা স্যুপ খাওয়ান।
▶ রোগীকে ভারী কম্বল বা মোটা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখবেন না। এতে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়। হালকা সুতি পোশাক পরিয়ে রাখুন।
▶ খাবারে সচেতনতা : সহজে হজম হয় এমন নরম খাবার যেমন জাউ ভাত দিন। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত, ভাজাপোড়া এবং দুধ-চা বা কফি এড়িয়ে চলুন।
* কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ বা হাসপাতালে যাবেন
জ্বর কমানোর জন্য নিজে থেকে কোনো অতিরিক্ত বা ব্যথানাশক ওষুধ (যেমন আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিন) খাওয়া একদমই উচিত নয়, বিশেষ করে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক হতে পারে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে-
▶ জ্বর যদি টানা ৩ দিনের বেশি ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে থাকে।
▶ তীব্র পেট ব্যথা, অনবরত বমি বা বমির সঙ্গে রক্ত গেলে।
▶ শরীর বা ত্বকে লালচে র্যাশ বা কালো দাগ দেখা দিলে।
▶ মাড়ি, নাক বা মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হলে বা আলকাতরার মতো কালো নরম পায়খানা হলে।
▶ শ্বাসকষ্ট বা তীব্র বুক ব্যথা হলে।
▶ রোগী অতিরিক্ত ক্লান্ত, অচেতন বা উলটোপালটা আচরণ করলে।
* বিশেষ সতর্কবার্তা
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে অনেক সময় জ্বর কমে যাওয়ার পরের ২৪ থেকে ৯৬ ঘণ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়। এ সময়ে রক্তচাপ কমে যেতে পারে, তাই জ্বর কমলেও রোগীর অবস্থার দিকে কড়া নজর রাখুন। জ্বর শরীরের একটি সংকেত মাত্র। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিলে যে কোনো বড় বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
লেখক : মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, এসএমসি ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, দারুস সালাম, মিরপুর, ঢাকা।
