আজকের সচেতনতা, আগামীর সুরক্ষা
স্তন ক্যানসার প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হই
Advertisement
ডা. তামান্না আহমেদ
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রতি বছর অক্টোবর মাস বিশ্বজুড়ে স্তন ক্যানসার সচেতনতার মাস হিসাবে পালিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য শুধু মানুষকে স্তন ক্যানসার সম্পর্কে জানানো নয়, বরং নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করা। কারণ স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে সময়মতো শনাক্তকরণ চিকিৎসার ফলাফলকে অনেকটাই প্রভাবিত করে।
* ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি
স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি শুধু বংশগত কারণে হয়-এমন ধারণাও সঠিক নয়। পারিবারিক ইতিহাস ও নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন, যেমন BRCA1 ও BRCA2 মিউটেশন, কিছু নারীর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে বংশগত কারণ ছাড়াও বয়স, হরমোনজনিত বিভিন্ন বিষয়, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ওজন, জন্মনিয়ন্ত্রণকারী পিল, বাচ্চাকে বুকের দুধ না খাওয়ানো, ধূমপান ও কিছু জীবনযাপনগত এবং পরিবেশগত কারণ স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। ঝুঁকি বুঝে ব্যক্তিভেদে উপযুক্ত স্ক্রিনিং ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
* প্রাথমিক অবস্থায় অনেক সময় কোনো উপসর্গ থাকে না
স্তন ক্যানসারের অন্যতম সমস্যা হলো-প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক রোগীর তেমন কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। ফলে শুধু ব্যথা বা দৃশ্যমান পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়ে যেতে পারে। স্তনে নতুন কোনো চাকা বা শক্ত অংশ অনুভূত হওয়া, স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন, নিপল থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ, নিপলের পরিবর্তন, বগলের নিচে চাকা বা গোটা কিংবা স্তনের ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যানসার হয়েছে-এমনও নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে হয়।
* স্ক্রিনিংকে গুরুত্ব দিতে হবে
স্তন ক্যানসার শনাক্ত করার ক্ষেত্রে স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ। তবে কার কখন স্ক্রিনিং শুরু করা উচিত, তা সবার জন্য এক নয়। নারীর বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, জিনগত ঝুঁকি ও অন্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক স্ক্রিনিংয়ের উপযুক্ত পদ্ধতি ও সময় নির্ধারণ করতে পারেন।
বিশেষ করে যেসব নারীর রক্ত-সম্পর্কিত নিকটাত্মীয়ের স্তন ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে, BRCA1/BRCA2-এর মতো জিনগত পরিবর্তনের ঝুঁকি রয়েছে অথবা অল্প বয়সে বুকের অংশে রেডিয়েশন থেরাপি নেওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের উচ্চঝুঁকির নারী হিসাবে বিবেচনা করে আলাদা স্ক্রিনিং পরিকল্পনা প্রয়োজন হতে পারে। ম্যামোগ্রাম নিয়ে অনেকের মধ্যে রেডিয়েশনভীতি রয়েছে। এতে অল্পমাত্রার এক্স-রে রেডিয়েশন ব্যবহার করা হয়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্ক্রিনিংয়ের ক্ষেত্রে এর উপকারিতা ও ঝুঁকি বিবেচনা করা হয়। শুধু রেডিয়েশনের ভয়ে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। ম্যামোগ্রাম ছাড়াও বর্তমানে আল্টাসনোগ্রাম ব্রেস্ট ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ে বহুলভাবে ব্যবহৃত এবং এতে কোনো রেডিয়েশনের ঝুঁকিও থাকে না।
* চিকিৎসা নির্ধারণে বায়োপসি ও রিসেপ্টর পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ
স্তন ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসার ধরন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু টিউমার আছে কি না, সেটিই যথেষ্ট নয়। বায়োপসির মাধ্যমে রোগের প্রকৃতি নির্ণয়ের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি বা হরমোন রিসেপ্টর পরীক্ষাও জরুরি। ER, PR এবং HER2-এর মতো বায়োমার্কার বা রিসেপ্টরের ফলাফলের ওপর চিকিৎসার ধরন নির্ভর করতে পারে। কোনো রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার আগে হবে, নাকি কেমোথেরাপি আগে দেওয়া হবে, হরমোন থেরাপি বা টার্গেটেড থেরাপির প্রয়োজন আছে কি না-এসব সিদ্ধান্ত রোগের বৈশিষ্ট্য ও রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়।
অর্থাৎ স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা কোনো একক পদ্ধতির বিষয় নয়। রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করতে সার্জন, মেডিকেল অনকোলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, প্যাথলজিস্টসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
* স্তন সংরক্ষণ ও ম্যাস্টেকটমি-দুই পদ্ধতিরই নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে
অনেক নারী মনে করেন, পুরো স্তন অপসারণ করলেই চিকিৎসার ফল ভালো হবে। আবার কেউ কেউ স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচারকে কম কার্যকর মনে করেন। বাস্তবে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে ব্রেস্ট কনজারভেটিভ সার্জারি এবং ম্যাস্টেকটমি-দুই পদ্ধতিই কার্যকর চিকিৎসার অংশ হতে পারে। স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে সাধারণত পরবর্তী রেডিয়েশন থেরাপি প্রয়োজন হয়। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে, তা টিউমারের আকার, অবস্থান, রোগের বিস্তার, রোগীর শারীরিক অবস্থা ও অন্য চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়।
কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন থেরাপি নিয়ে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। আধুনিক কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়েছে এবং চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘমেয়াদে কিছু বিরল জটিলতার ঝুঁকি থাকতে পারে, তবে সেই ঝুঁকি সাধারণত খুব কম। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন থেরাপি নিয়ে ভয় পাওয়া বা চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়া সমীচীন নয়।
- ভ্রান্ত ধারণা নয়, সচেতনতাই পারে জীবন বাঁচাতে
স্তন ক্যানসার নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সচেতনতা। নিজের শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন হওয়া, ঝুঁকি সম্পর্কে জানা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্ক্রিনিং করা এবং কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া-এ চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার ফলাফল অনেক ভালো হতে পারে। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতার।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, প্লাস্টিক সার্জারি।
