আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস
মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন জরুরি
Advertisement
ডা. আহসান উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বহুল শ্রোতাপ্রিয় একটি গান আছে, ‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই; মানুষ নামের মানুষ আছে দুনিয়া বোঝাই, এই মানুষের ভিড়ে আমার সেই মানুষ নাই’। সত্যিই তো, কোনো মানুষ নাই, যে মানুষ আমার কথা শুনবে? আমার মনের কথা, আমার অভিজ্ঞতার কথা, আমার কষ্টের কথা শুনবে। কিছু বুঝবে, অন্তর থেকে আমার জন্য কিছু বলবে। আমার জীবনে পরিবর্তনের ছোঁয়া আনবে, সেই মানুষ নাই। মানুষে ভরা এ পৃথিবীতেও কখনো কখনো আমরা ভীষণ একা হয়ে যাই। পাশে অনেক মানুষ থাকলেও মনের কথা বলার মতো একজন মানুষ না থাকলে তৈরি হয় গভীর শূন্যতা। নিজের কথা বলা, মন দিয়ে শোনা এবং অনুভূতিকে স্বীকৃতি দেওয়া মানসিক সুস্থতার জন্য জরুরি। তাই কষ্ট জমিয়ে না রেখে বিশ্বাসের মানুষটির সঙ্গে কথা বলা, প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া-নিজের প্রতি যত্নেরই অংশ। বিস্তারিত লিখেছেন ডা. আহসান উদ্দিন আহমেদ
প্রতি বছরের মতো এবারও (১০ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘Lived experience heard : real voices, real change.’ যার ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়, মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা মনোযোগসহকারে শুনুন, অন্তর দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলুন, ব্যক্তি জীবনে; সমাজ জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে সহায়তা করুন। অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং মানসিক সুস্বাস্থ্য ও তার সুরক্ষার জন্য দিকনির্দেশনামূলক একটি স্লোগান। এই থিমের মাধ্যমে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ মেন্টাল হেলথ (ডব্লিউএফএমএইচ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সার্বিকভাবে গণমানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে নীতি নির্ধারণ, কাজের রূপরেখা প্রণয়ন এবং স্বাস্থ্যখাতকে পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সমন্বিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে। একইসঙ্গে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে কমিউনিটি বেইজড মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর।
আমরা যদি এবারের প্রতিপাদ্যের দিকে তাকাই তবে দেখব, তিনটি ধারা নিয়ে একটি থিম তৈরি করা হয়েছে। প্রথম অংশ হলো জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন, অর্থাৎ যারা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় সরাসরি ভুগছেন বা লড়াই করছেন-এমন ব্যক্তিদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া। তাদের শুধু রোগী বা সেবার নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা হিসাবে না দেখে, তাদের অভিজ্ঞতাকে মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির প্রধান নির্দেশক হিসাবে গণ্য করা। প্রতিপাদ্যে দ্বিতীয় অংশ হলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার কথা শুধু আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, ভুক্তভোগীদের নিজস্ব অনুভূতি বা বাস্তব অভিজ্ঞতা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সত্যিকারের সহানুভূতির সঙ্গে তাদের জন্য কথা বলা এবং বাস্তবিকভাবে তাদের জন্য কিছু বলা এবং করার জন্য এগিয়ে আসা। তৃতীয় অংশ হলো একটি নীতি নির্ধারণী বা দিকনির্দেশনামূলক বিষয়। অর্থাৎ ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত যখন নীতিনির্ধারণ ও সেবামূলক কাজে যুক্ত করা হবে, তখনই শুধু মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় সত্যিকারের ও কার্যকরী পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এ প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে কাজ করবেন।
▶ বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি (People with lived experiences) এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। এবারের প্রচারণার মূল উদ্দেশ্যই হলো মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নীতিনির্ধারণ, সেবাব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ কোনো মতের বদলে সরাসরি ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠস্বরকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। যারা নিজেরা মানসিক স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন, তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তন আনতে মূল ভূমিকা রাখবেন।
▶ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন (ডব্লিউএফএমএইচ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ দিবসটির মূল আয়োজক হিসাবে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করবে।
▶ বিভিন্ন দেশের সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন এবং সেবা ব্যবস্থা সংস্কারে ভুক্তভোগীদের মতামতকে অন্তর্ভুক্ত করতে কাজ করবে।
▶ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীরা রোগীদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে সেবার মান বাড়াতে ভূমিকা রাখবেন।
▶ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ এবং কর্মকর্তারা কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করবেন।
▶ এ প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে সাইক্রিয়াট্রিস্টদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেমন-
▶▶ রোগীর অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া : প্রথাগত চিকিৎসার বাইরে গিয়ে রোগীকে শুধু লক্ষণ হিসাবে না দেখে তার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার কষ্টের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি রোগীর নিজস্ব মতামত ও স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রধান্য দেওয়া সাইক্রিয়াট্রিস্টদের অন্যতম দায়িত্ব।
▶▶ ডি-ইনস্টিটিউলাইজেশন বা কমিউনিটভিত্তিক সেবা বৃদ্ধি : ২০২৬ সালের থিমটি মানসিক হাসপাতালের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখার বদলে সমাজের মধ্যে এবং পরিবারের মধ্যে রেখে চিকিৎসা করার ওপর জোর দেয়। সাইক্রিয়াট্রিস্টরা রোগীদের পুনর্বাসন এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতে নেতৃত্ব দিতে পারেন। এক্ষেত্রে রোগীকে যোগ্যতা এবং অবস্থা অনুযায়ী তার পছন্দমতো কোনো উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে পারলে চিকিৎসার ফলাফল ভালো পাওয়া যায়। মানুষের শরীরের যেমন অসুখ হয় তেমনি মনেরও নানাবিধ অসুখ হতে পারে এবং হয়। এ সত্যটিকে সমাজের এবং পরিবারের লোকদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
▶▶ সাইক্রিয়াট্রিস্টরা সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার ও ট্যাবু ভাংতে রোগীকে নিজেদের গল্প, অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন।
▶ নীতিনির্ধারণে এবং চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রেও রোগীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। রোগীর স্বাচ্ছন্দ্য, তার ভালো থাকা হবে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি।
▶ প্রতিটি মানুষের প্রতিটি রোগীর অনুভূতি, কষ্ট আলাদা। ফলে Empathy-এর সঙ্গে প্রতিটি রোগীকে সেবা দেওয়া জরুরি।
সত্যিকার অর্থে মানসিকভাবে সুস্থ জীবনযাপনের জন্য জীবনের কতগুলো ক্ষেত্রকে সুন্দরভাবে পরিচর্যা করতে হয়। এরকম অনেক ক্ষেত্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রটি। Interpersonal Relationship বা পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম বা ডোমেইন হচ্ছে ফ্যামিলি। যে কোনো সম্পর্কের সাফল্য বা সৌন্দর্য টুপ করে আকাশ থেকে পড়ে না। সম্পর্ককে পরিচর্যা করতে হয়, এগিয়ে নিতে হয়। যে চরিত্রগুলোকে নিয়ে একটা সম্পর্ক তৈরি হয় সেই চরিত্রগুলোর একজনে আরেকজনের কথা শোনা, পরস্পরকে বোঝা এবং গুরুত্ব দেওয়া খুব জরুরি। পার্টনারের কথা শোনা, সন্তানদের কথা শোনা, পরিবারের একজনে আরেকজনের কথা শোনা, অনুভূতিগুলো শেয়ার করা, আবেগ, অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করা, বুঝতে চেষ্টা করা খুব জরুরি। আমি একজন সাইক্রিয়াট্রিস্ট হিসাবে যেহেতু ব্যক্তি মানুষের চিকিৎসা করি, তাই আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে Lived experienceকে পারস্পরিক সম্পর্কের মানোন্নয়নে অর্থবহ করে তোলা। আপনি যখন আপনার কাছের মানুষটির অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, কষ্টের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং একটা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেবেন, তখন সেই মানুষটি অনুভব করবেন যে, তিনি নিরাপদে আছেন এবং এ ধরনের স্বাস্থ্যকর নির্ভরতা তাকে সুন্দরভাবে বাঁচতে অনুপ্রাণিত করবে। এটা কিন্তু মোটেই কোনো বায়বীয় বিষয় নয়। এর সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের অনেক সেন্টার নিউরোট্রন্সমিটার হরমোন, নিউরোমডিউলেটর জড়িত। সেন্টারগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে Ventral tegmental area, Nucleus Accumbency, Amygdala, Prefrontal Cortex, ইত্যাদি এবং তাদের মধ্যকার নিউরোনাল কানেকশন। নিউরোট্রান্সমিটারের মধ্যে ডোপামিন, সেরোটোনিন, গাবা ভূমিকা রাখে। ফলে সঠিক জায়গায় সঠিকভাবে যখন আপনি আপনার অভিজ্ঞতা, কষ্ট হালকা করবেন তখন মস্তিষ্কের এ ক্ষেত্রগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম আপনাকে একটা স্বস্তিদায়ক ভালো লাগার অনুভূতি দেবে, যা আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফলে এ থিমটিকে ব্যক্তিগত জীবনে সরাসরি প্রয়োগ করার জন্য আপনি কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন, যেমন-আপনি যদি আপনার মানসিক কষ্টকে সঠিক এবং স্বাস্থ্যকরভাবে মানিয়ে নিতে না পারেন তাহলে সেটা আপনার বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবার, জীবনসঙ্গী কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে প্রকাশ করুন। লোকলজ্জা বা স্টিগমা থেকে বেরিয়ে, ভয় ঝেড়ে ফেলে মানসিক অসুস্থতাকে অসুস্থতা হিসাবে মেনে নিন, প্রকাশ করুন এবং প্রয়োজনে সাইক্রিয়াট্রিস্ট, সাইকোথেরাপিস্টের সাহায্য নিন। একইভাবে অন্যের কষ্টের কথা, অভিজ্ঞতার কথা, মনোযোগ দিয়ে শুনুন, কখনো বিচার করবেন না। মনে রাখবেন প্রতিটা মানুষের তার নিজের মতো করে কিছু সমস্যা, কষ্ট থাকে যা একেবারেই একান্ত, এটাকে আপনার মতো করে বিচার করলেই ওই মানুষটির প্রতি অন্যায় করা হবে। কাজেই কেউ তার মানসিক কষ্টের কথা বললে তাকে উপদেশ দেওয়া বা বিচার করার আগে তার অনুভূতিটাকে বোঝার চেষ্টা করুন। কোনো সমাধান চাপিয়ে না দিয়ে তাদের নিজের মতো করে কথা বলার সুযোগ দিন-শুনুন। জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করুন। শুধু কথা বলাই যথেষ্ট নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় নিজের অভ্যাসে এবং চারপাশের পরিবেশে পরিবর্তন আনা জরুরি। বর্তমান যুগে অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার তথা অপব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির অন্যতম বড় কারণ, তাই প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে নিন। মানসিক সমস্যা তীব্র হলে সাইক্রিয়াট্রিস্ট অথবা সাইকোথেরাপিস্টের সাহায্য নিন। শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে গেলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত শরীরচর্চা প্রধান শর্ত।
অতএব, মূল স্লোগানটি দিয়েই আজকের লেখা শেষ করি, ‘জীবনের অভিজ্ঞতার কথা মনোযোগসহকারে শুনুন, সত্যিকারের সহানুভূতি নিয়ে কথা বলুন, জীবনে অর্থবহ পরিবর্তন আনতে সাহায্য করুন।’ আমরা যদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এ তিনটি বাক্যের বাস্তবিক প্রয়োগ ঘটাতে পারি তবে আমাদের জীবন হবে অনেক সহজ এবং সুন্দর।
লেখক : সাইক্রিয়াট্রিস্ট এবং সাইকোথেরাপিস্ট, সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা।
