Logo
Logo
×

Advertisement

সুস্থ থাকুন

পিএমওএস : নারীর হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নীরব সংকেত

Advertisement

Icon

ডা. নাজমা আক্তার

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

অনিয়মিত মাসিক, মুখে অতিরিক্ত লোম, ব্রণ কিংবা বিয়ের পর সন্তান ধারণে দীর্ঘদিন ব্যর্থতা-এসব সমস্যাকে অনেক নারী স্বাভাবিক বলে এড়িয়ে যান। কেউ আবার মনে করেন, ওজন বেশি হওয়া বা শুধু ডিম্বাশয়ে সিস্ট থাকলেই এ সমস্যা হয়। অথচ এসব লক্ষণের পেছনে থাকতে পারে একটি জটিল হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যা, যার প্রভাব প্রজননস্বাস্থ্যের পাশাপাশি শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার ওপরও পড়ে। রোগটি আগে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এটি পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিএমওএস) নামে পরিচিত।

* রোগটি কী এবং কেন হয়

PMOS একটি দীর্ঘমেয়াদি হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যা। এতে শরীরে অ্যান্ড্রোজেন নামের হরমোনের মাত্রা বা কার্যকারিতা বেড়ে যেতে পারে, ডিম্বস্ফোটন অনিয়মিত হতে পারে এবং অনেকের শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধের প্রবণতা দেখা দেয়। এ রোগের সুনির্দিষ্ট একক কারণ এখনো জানা যায়নি। বংশগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের পরিবর্তন এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়া এতে ভূমিকা রাখে। পরিবারের মা, বোন বা অন্য নিকটাত্মীয়ের এ সমস্যা কিংবা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে সব রোগীর উপসর্গ এক রকম নয়। কারও প্রধান সমস্যা অনিয়মিত মাসিক, কারও অতিরিক্ত লোম বা ব্রণ, আবার কারও ক্ষেত্রে ওজন ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা বেশি দেখা যায়।

* লক্ষণগুলো চিনবেন কীভাবে

মাসিক অনিয়মিত হওয়া PMOS-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। কারও মাসিক দীর্ঘ বিরতিতে হয়, কারও বছরে আটবারের কম হয়, আবার কারও কয়েক মাস মাসিক বন্ধ থাকতে পারে। ডিম্বস্ফোটন নিয়মিত না হওয়ায় সন্তান ধারণেও সমস্যা হতে পারে। এ ছাড়া মুখ, থুতনি, বুক বা পেটে অতিরিক্ত লোম, মাথার চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, ব্রণ, ত্বক তৈলাক্ত হওয়া এবং ওজন বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে কোমর ও পেটের চারপাশে চর্বি জমা অনেকের ক্ষেত্রে বিপাকীয় ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এসব লক্ষণের এক বা একাধিকটি থাকলেই PMOS হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। থাইরয়েডের সমস্যা, প্রোল্যাক্টিন হরমোন বৃদ্ধি এবং অন্য কিছু হরমোনজনিত রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

* রোগ নির্ণয় ও স্ক্রিনিং কেন জরুরি

PMOS নির্ণয়ের জন্য কোনো একটি পরীক্ষাই যথেষ্ট নয়। প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে অন্য সম্ভাব্য কারণ বাদ দেওয়ার পর সাধারণত নিচের তিনটি বৈশিষ্ট্যের অন্তত দুটি থাকলে রোগ নির্ণয় করা হয়-

▶ মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা

▶ শরীরে অ্যান্ড্রোজেনের আধিক্যের লক্ষণ, যেমন মুখে অতিরিক্ত লোম, অথবা রক্ত পরীক্ষায় অ্যান্ড্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি

▶ আলট্রাসনোগ্রামে ডিম্বাশয়ের পলিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য দেখা যাওয়া।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন (AMH) পরীক্ষা আলট্রাসনোগ্রামের বিকল্প হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। তবে সব পরীক্ষা সবার প্রয়োজন হয় না। কিশোরীদের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড আলাদা এবং শুধু আলট্রাসনোগ্রাম বা AMH পরীক্ষার ভিত্তিতে রোগ নির্ণয় করা উচিত নয়। রোগ শনাক্ত হলে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও অন্যান্য বিপাকীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন করা জরুরি। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী গ্লকোজ পরীক্ষা, লিপিড প্রোফাইল এবং অন্য হরমোন পরীক্ষা দিতে পারেন। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও মূল্যায়ন করা উচিত।

* কী কী স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে

PMOS শুধু প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়। দীর্ঘমেয়াদে এর সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, রক্তে চর্বির অস্বাভাবিকতা, হৃদরোগের ঝুঁকি এবং ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক রয়েছে। ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকলে জরায়ুর ভেতরের আবরণে অতিরিক্ত বৃদ্ধি বা অ্যান্ডোমেট্রিয়াল হাইপারপ্লাসিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়, যদিও সামগ্রিকভাবে এর পরম ঝুঁকি কম। তাই দীর্ঘদিন মাসিক না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া সন্তান ধারণে সমস্যা, শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, সামাজিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা অনেক নারীর জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দিতে পারে।

* প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

PMOS সম্পূর্ণ প্রতিরোধের নিশ্চিত কোনো উপায় নেই। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বিপাকীয় জটিলতা কমাতে এবং উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস কমানো গুরুত্বপূর্ণ। ওজন বেশি থাকলে ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ধীরে ধীরে ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা উপকারী। তবে ওজন স্বাভাবিক হলেও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখা জরুরি।

চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর বয়স, উপসর্গ, বিপাকীয় অবস্থা এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার ওপর। মাসিক নিয়মিত করা, ব্রণ ও অতিরিক্ত লোম নিয়ন্ত্রণ এবং জরায়ুর আবরণের সুরক্ষায় চিকিৎসক উপযুক্ত হরমোনাল ওষুধ দিতে পারেন। ইনসুলিন প্রতিরোধ বা নির্দিষ্ট বিপাকীয় সমস্যায় মেটফরমিনের মতো ওষুধ বিবেচিত হতে পারে।

যারা সন্তান নিতে চান, তাদের ক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটন ঘটানোর ওষুধসহ প্রয়োজনীয় প্রজনন চিকিৎসা দেওয়া যায়। বিশেষজ্ঞের পরামর্শে অনেক নারী সফলভাবে গর্ভধারণ করতে পারেন। তবে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপসহ কিছু জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

নিজের ইচ্ছায় হরমোনের ওষুধ, ওজন কমানোর ওষুধ কিংবা তথাকথিত হরমোন ভারসাম্যকারী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।

▶ প্রচলিত ধারণা : PMOS হলে সন্তান ধারণ সম্ভব নয়। সত্য হলো, এ রোগে ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা হলেও চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক নারী গর্ভধারণ করতে পারেন।

▶ প্রচলিত ধারণা : শুধু মোটা নারীদের এ রোগ হয়। সত্য হলো স্বাভাবিক ওজনের নারীরও PMOS হতে পারে।

▶ প্রচলিত ধারণা : আলট্রাসনোগ্রামে সিস্ট দেখা গেলেই রোগটি নিশ্চিত। সত্য হলো ডিম্বাশয়ে পলিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য থাকলেই PMOS প্রমাণিত হয় না; অন্য লক্ষণ ও পরীক্ষার ফলও বিবেচনা করতে হয়।

▶ প্রচলিত ধারণা : বিয়ে বা গর্ভধারণ হলেই রোগ সেরে যায়। সত্য হলো, এটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা। উপসর্গ পরিবর্তিত হতে পারে, তবে বিপাকীয় ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগ, মার্কস মেডিকেল কলেজ ও

হাসপাতাল ঢাকা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

গোড়ালির ব্যথায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন

গোড়ালির ব্যথায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন

শীতের শুরুতে ফ্লু ও নিউমোনিয়ার টিকা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কেন জরুরি

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কেন জরুরি

পিএমওএস : নারীর হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নীরব সংকেত

পিএমওএস : নারীর হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নীরব সংকেত

শীত আসছে বাড়ছে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস

শীত আসছে বাড়ছে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম