Logo
Logo
×

Advertisement

সুস্থ থাকুন

শীতের শুরুতে ফ্লু ও নিউমোনিয়ার টিকা

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কেন জরুরি

Advertisement

Icon

ডা. মো. মাহমুদ হাসান

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

শীতের আগমনে আমাদের দেশে সর্দি-কাশি, জ্বর ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বাড়তে দেখা যায়। অনেকেই এসব অসুখকে সাধারণ ঠান্ডা ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ সংক্রমণও কখনো কখনো গুরুতর অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি কিংবা প্রাণঘাতী জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই শীতের আগে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ফ্লু ও নিউমোনিয়ার টিকা নেওয়া শুধু একটি বাড়তি সতর্কতা নয়, বরং সুস্থ থাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।

* ডায়াবেটিসে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি কেন

ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার রোগ নয়; এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে রক্তে শর্করা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে শ্বেত রক্তকণিকার জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করার ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। ফলে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। ডায়াবেটিসের সঙ্গে কিডনি, হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির জটিলতা থাকলে সংক্রমণের পরিণতি আরও গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হলে রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। আবার জ্বর, বমি, পানিশূন্যতা ও স্বাভাবিক খাবার গ্রহণে ব্যাঘাতের কারণে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস বা হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেটের মতো জরুরি জটিলতাও দেখা দিতে পারে। ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকলেও সংক্রমণের গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।

* ফ্লু ও নিউমোনিয়া কি একই রোগ

দুটি আলাদা বিষয়। ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা হলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণ। এতে জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা ও প্রচণ্ড দুর্বলতা হতে পারে। কখনো এ ভাইরাস সরাসরি ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়, আবার কখনো পরবর্তী সময়ে ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। নিউমোনিয়া হলো ফুসফুসের সংক্রমণ, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য জীবাণুর কারণে হতে পারে। নিউমোনিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণ হলো স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনি যা নিউমোকক্কাস নামে পরিচিত। ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে এ দুই সংক্রমণই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ গুরুতর অসুস্থতার সময় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা, কিডনির সমস্যা কিংবা হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

* ফ্লুর টিকা কেন প্রতি বছর নিতে হবে

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ধরন ও বিস্তারের ধরন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এ কারণে ফ্লুর টিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় এবং প্রতি বছর টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ফ্লুর টিকা ডায়াবেটিস রোগীদের ইনফ্লুয়েঞ্জা সম্পর্কিত গুরুতর অসুস্থতা ও হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। তবে টিকা নেওয়ার পরও ফ্লু হতে পারে। টিকার কার্যকারিতা ভাইরাসের ধরন, বয়স, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো এবং বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থতা প্রতিরোধে সহায়তা করা। ডায়াবেটিস রোগীদের সাধারণত ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া নিষ্ক্রিয় বা উপযুক্ত রিকম্বিন্যান্ট ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা নেওয়া উচিত। জীবিত, দুর্বলীকৃত ভাইরাসযুক্ত নাকের স্প্রে টিকা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সাধারণত সুপারিশ করা হয় না।

* নিউমোনিয়ার টিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ

নিউমোকক্কাল টিকা নিউমোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া নিউমোনিয়া এবং কিছু গুরুতর সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এটি সব ধরনের নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করতে পারে না, কারণ নিউমোনিয়ার আরও অনেক জীবাণু রয়েছে। তবু ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এ টিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত নিউমোকক্কাল টিকা গুরুতর সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। আমাদের দেশে নিউমোকক্কাল টিকার ২টি ধরন রয়েছে, যেমন PCV13 এবং PPSV23। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবনে এক ডোজ নিলেই হয়। তবে কোন টিকা প্রয়োজন, এক ডোজে হবে নাকি পরবর্তী সময়ে আরেকটি ডোজ লাগবে-তা নির্ভর করে রোগীর বয়স, আগে কোনো টিকা নেওয়া হয়েছে, কিডনির অবস্থা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং স্থানীয়ভাবে প্রযোজ্য নির্দেশিকার ওপর।

* শীতের কত আগে টিকা নিতে হবে

শীতের মৌসুম বা সংক্রমণ বাড়ার সময় শুরু হওয়ার আগেই টিকা নেওয়া ভালো, যাতে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার সময় পাওয়া যায়। সাধারণভাবে ফ্লুর টিকা নেওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও সংক্রমণের মৌসুমি ধরন বিবেচনায় চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে আগেভাগে টিকা নেওয়ার পরিকল্পনা করা যুক্তিযুক্ত। তবে শীত শুরু হয়ে যাওয়ার পরও টিকা নেওয়া উপকারী হতে পারে, যদি ওই মৌসুমে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে এবং টিকা নেওয়ার উপযুক্ততা বজায় থাকে। ফ্লু ও নিউমোকক্কাল টিকা একই দিনে নেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে টিকার ধরন, আগের টিকাদানের ইতিহাস ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসক এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।

* টিকা নিলে কি ডায়াবেটিসের ওষুধ বন্ধ করা যাবে

কখনোই নয়। টিকা ডায়াবেটিসের চিকিৎসার বিকল্প নয়; এটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার একটি অংশ। নিয়মিত ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ, রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং শারীরিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। জ্বর বা সংক্রমণ হলে রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘনঘন মাপতে হতে পারে। অসুস্থ অবস্থায় ইনসুলিন বা অন্যান্য ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন প্রয়োজন কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে ইনসুলিন নিজে থেকে বন্ধ করা বিপজ্জনক। ফ্লুর উপসর্গ দেখা দিলে ডায়াবেটিস রোগীদের দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। প্রয়োজন হলে অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা যত দ্রুত সম্ভব শুরু করতে হয়। শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, বিভ্রান্তি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, পানিশূন্যতা কিংবা রক্তে শর্করা অত্যন্ত বেড়ে গেলে বা কমে গেলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

* টিকা নেওয়ার আগে কী জানা দরকার

আগে কোনো টিকায় গুরুতর অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকলে, বর্তমানে মাঝারি বা গুরুতর অসুস্থতা থাকলে কিংবা বিশেষ কোনো রোগের চিকিৎসা চললে চিকিৎসককে জানাতে হবে। টিকার পর ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা, সামান্য জ্বর বা শরীর খারাপ লাগার মতো অল্প সময়ের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে; গুরুতর প্রতিক্রিয়া বিরল। টিকা নেওয়ার পাশাপাশি হাত পরিষ্কার রাখা, অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, কাশি-হাঁচির শিষ্টাচার মেনে চলা এবং ঘরের বায়ু চলাচল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : কনসালট্যান্ট, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

গোড়ালির ব্যথায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন

গোড়ালির ব্যথায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন

শীতের শুরুতে ফ্লু ও নিউমোনিয়ার টিকা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কেন জরুরি

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কেন জরুরি

পিএমওএস : নারীর হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নীরব সংকেত

পিএমওএস : নারীর হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নীরব সংকেত

শীত আসছে বাড়ছে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস

শীত আসছে বাড়ছে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম