Logo
Logo
×

Advertisement

সুস্থ থাকুন

গোড়ালির ব্যথায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন

Advertisement

Icon

ডা. তাহমীদ কামাল

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

সকালে ঘুম থেকে উঠে মেঝেতে পা রাখতেই গোড়ালিতে তীব্র ব্যথা। কিছুক্ষণ হাঁটলে ব্যথা কমে, কিন্তু দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকা বা কাজের পর আবার বাড়ে। এমন সমস্যা নিয়ে অনেকেই চিকিৎসকের কাছে আসেন। এক্স-রে করার পর কারও কারও গোড়ালির হাড়ে কাঁটার মতো বাড়তি অংশ দেখা যায়। গোড়ালির হাড়ের এই বাড়তি অংশকে বলা হয় ক্যালকেনিয়াল স্পার। তবে এক্স-রেতে স্পার থাকলেই যে সেটি ব্যথার মূল কারণ, তা কিন্তু নয়। ব্যথার প্রকৃত উৎস শনাক্ত করে চিকিৎসা এবং পরিকল্পিত পুনর্বাসনই সুস্থতার প্রধান উপায়। বিস্তারিত লিখেছেন ডা. তাহমীদ কামাল

ক্যালকেনিয়াল স্পার কী

গোড়ালির প্রধান হাড়ের নাম ক্যালকেনিয়াস। এ হাড়ের নিচে বা পেছনে কখনো অতিরিক্ত হাড়ের ছোট প্রবৃদ্ধি তৈরি হয়। একে ক্যালকেনিয়াল স্পার বলা হয়। গোড়ালির নিচের স্পারের সঙ্গে পায়ের তলার প্লান্টার ফ্যাসিয়ার সমস্যা থাকতে পারে। অন্যদিকে, গোড়ালির পেছনের স্পার অ্যাকিলিস টেন্ডনের সংযোগস্থলের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এ দুটি অবস্থার ব্যথার স্থান, পরীক্ষা এবং ব্যায়ামের পরিকল্পনা এক নয়। বিশেষ করে গোড়ালির পেছনে ব্যথা থাকলে পায়ের তলার ব্যথার সব ব্যায়াম একইভাবে করা উচিত নয়।

* স্পার থাকলেই কি ব্যথা হয়

অনেক মানুষের এক্স-রেতে স্পার দেখা যায়, অথচ তাদের কোনো ব্যথা নেই। আবার স্পার ছাড়াও তীব্র গোড়ালির ব্যথা হতে পারে। গোড়ালির নিচের ব্যথার একটি সাধারণ কারণ প্লান্টার ফ্যাসিওপ্যাথি, যা প্লান্টার ফ্যাসাইটিস নামেও পরিচিত। দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত চাপ ও টিস্যুর পরিবর্তনের কারণে এতে ব্যথা হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় বিষয়টি শুধু প্রদাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

তাই চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু এক্স-রেতে দেখা হাড়ের বাড়তি অংশ সরানো নয়; ব্যথা কমানো, টিস্যুর ওপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং হাঁটার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা। স্পার রয়ে গেলেও ব্যথা ভালো হতে পারে।

* কাদের ঝুঁকি বেশি

পায়ের ওপর চাপ হঠাৎ বেড়ে গেলে বা দীর্ঘদিন চাপের সঙ্গে টিস্যুর সহনক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ঝুঁকি বাড়াতে পারে-

▶ দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে কাজ করা বা শক্ত মেঝেতে হাঁটা

▶ হঠাৎ হাঁটা, দৌড়ানো বা শরীরচর্চার পরিমাণ বাড়ানো

▶ অতিরিক্ত ওজন বা সাম্প্রতিক ওজন বৃদ্ধি

▶ পায়ের খিলান খুব নিচু বা বেশি উঁচু হওয়া

▶ প্লিলির পেশি শক্ত থাকা এবং গোড়ালির নড়াচড়া সীমিত হওয়া

▶ পর্যাপ্ত সাপোর্ট ও কুশনিং নেই-এমন জুতা ব্যবহার করা

▶ কাজের ধরন, জুতা, শারীরিক গঠন ও দৈনন্দিন অভ্যাস একসঙ্গে মূল্যায়ন করতে হয়।

* উপসর্গ

প্লান্টার ফ্যাসিয়ার সমস্যায় সাধারণত গোড়ালির নিচে, বিশেষ করে ভেতরের দিকে ব্যথা হয়। সকালে প্রথম কয়েক কদম বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর হাঁটতে শুরু করলে ব্যথা বেশি অনুভূত হতে পারে।

কিছুক্ষণ চলাফেরায় কমলেও দীর্ঘ

সময় হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকার পর আবার বাড়তে পারে।

গোড়ালির পেছনে ব্যথা, জুতার ঘর্ষণে অস্বস্তি বা টেন্ডনের ওপর ফোলা থাকলে অ্যাকিলিস টেন্ডনের সমস্যা বিবেচনা করতে হয়। অন্যদিকে, ঝিনঝিনি, অবশভাব বা জ্বালাপোড়া থাকলে স্নায়ুর সমস্যাও খুঁজতে হয়।

* চিকিৎসার কেন্দ্রে কেন রিহ্যাবিলিটেশন

ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসায় ব্যথার পাশাপাশি রোগীর দৈনন্দিন সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কতক্ষণ হাঁটতে পারেন, কাজে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন কি না, কী ধরনের জুতা ব্যবহার করেন এবং কোন কাজে ব্যথা বাড়ে-এসবের ভিত্তিতে চিকিৎসা সাজানো হয়। পুনর্বাসনের প্রধান উপাদান হলো কাজের চাপ সমন্বয়, উপযুক্ত জুতা, নির্দিষ্ট স্ট্রেচিং, পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কাজে ফেরা। প্রয়োজনে ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে ম্যানুয়াল থেরাপি, টেপিং ও অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়।

▶ প্রথম ধাপ : পায়ের ওপর চাপের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা

ব্যথা বাড়ায় এমন কাজ সাময়িকভাবে কমাতে হবে। একটানা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার বদলে মাঝেমধ্যে বসে বিশ্রাম নেওয়া, হাঁটার সময় ভাগ করে নেওয়া এবং দৌড়ঝাঁপ কিছুদিন সীমিত রাখা উপকারী।

সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় না থেকে সহ্যসীমার মধ্যে সক্রিয় থাকা ভালো। প্রয়োজনে দৌড়ানোর পরিবর্তে সাঁতার বা সাইক্লিংয়ের মতো তুলনামূলক কম চাপের ব্যায়াম বেছে নেওয়া যায়। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ওজন নিয়ন্ত্রণও পরিকল্পনার অংশ হতে পারে।

▶ দ্বিতীয় ধাপ : উপযুক্ত জুতা ও সহায়ক ব্যবস্থা

জুতা হতে হবে সঠিক মাপের, গোড়ালিতে পর্যাপ্ত কুশনিংযুক্ত এবং পায়ের খিলানের জন্য আরামদায়ক সাপোর্টসম্পন্ন। শক্ত মেঝেতে খালি পায়ে হাঁটা এবং পাতলা, ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডেল ব্যবহার কমানো উচিত।

নির্বাচিত রোগীর জন্য হিল কাপ, হিল প্যাড বা আর্চ সাপোর্ট সহায়ক হতে পারে। তবে সবার দামি বা বিশেষভাবে তৈরি ইনসোল লাগে না। এগুলো ব্যায়াম ও চাপ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করতে হয়। টেপিংও কিছু রোগীর সাময়িক আরাম দিতে পারে।

▶ তৃতীয় ধাপ : নিয়মিত ও সঠিক ব্যায়াম

নিচের ব্যায়ামগুলো মূলত প্লান্টার ফ্যাসিয়াজনিত গোড়ালির নিচের ব্যথার জন্য। এগুলো একটি সাধারণ শুরুর উদাহরণ; ব্যথার মাত্রা ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী পরিমাণ পরিবর্তন করতে হয়।

▶▶ পায়ের তলার টিস্যুর স্ট্রেচিং

চেয়ারে বসে ব্যথাযুক্ত পা অন্য হাঁটুর ওপর রাখুন। হাত দিয়ে পায়ের আঙুলগুলো আলতোভাবে নিজের দিকে টানুন, যাতে পায়ের তলায় মৃদু টান অনুভূত হয়। প্রায় ১০ সেকেন্ড ধরে রেখে ছেড়ে দিন। সহ্যসীমার মধ্যে কয়েকবার করুন। সকালে বিছানা থেকে নামার আগে এবং দীর্ঘক্ষণ বসার পর এটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

▶▶ প্লিলির পেশির স্ট্রেচিং

দেওয়ালে হাত রেখে দাঁড়ান। ব্যথাযুক্ত পা পেছনে এবং অন্য পা সামনে রাখুন। পেছনের হাঁটু সোজা ও গোড়ালি মেঝেতে রেখে ধীরে সামনে ঝুঁকুন। প্লিলিতে মৃদু টান অনুভূত হলে ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে রাখুন। দুই থেকে তিনবার দিয়ে শুরু করা যায়। ঝাঁকুনি দিয়ে টান দেবেন না।

▶▶ গোড়ালি ওঠানো বা হিল রেইজ

চেয়ার বা দেওয়াল ধরে সমতল মেঝেতে দাঁড়ান। দুই পায়ের সামনের অংশে ভর দিয়ে ধীরে গোড়ালি তুলুন, তারপর নামান। শুরুতে অল্প কয়েকবার করুন। দাঁড়িয়ে করতে কষ্ট হলে বসে শুরু করা যায়। পরে তত্ত্বাবধানে পুনরাবৃত্তি ও প্রতিরোধ বাড়ানো হয়।

▶▶ পায়ের ছোট পেশি সক্রিয় করা

বসে পা মেঝেতে রাখুন। আঙুল শক্ত করে কুঁচকে না দিয়ে পায়ের খিলান আলতোভাবে উঁচু করার চেষ্টা করুন। সঠিক কৌশল শেখার জন্য ফিজিওথেরাপিস্টের সহায়তা নেওয়া ভালো।

ব্যায়ামের পর ব্যথা দীর্ঘস্থায়ীভাবে বেড়ে গেলে বা পরদিন সকালে আগের চেয়ে বেশি হলে পরিমাণ কমাতে হবে। তীব্র ব্যথা সহ্য করে ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

গোড়ালির পেছনে অ্যাকিলিস টেন্ডনের সংযোগস্থলে ব্যথা থাকলে সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে গোড়ালি নিচে নামানোর ব্যায়াম নিজে থেকে শুরু করবেন না। এ ক্ষেত্রে ব্যায়ামের সীমা আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হয়।

* বরফ, ওষুধ ও রাতের স্প্লিন্টের ভূমিকা

কাপড়ে মোড়ানো ঠান্ডা প্যাক অল্প সময় ব্যবহার করলে সাময়িক আরাম পাওয়া যেতে পারে। সরাসরি ত্বকে বরফ দেওয়া উচিত নয়। পায়ে অনুভূতি কম থাকলে বা রক্তসঞ্চালনের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঠান্ডা প্রয়োগ করবেন না।

প্রয়োজনে চিকিৎসক স্বল্পমেয়াদি ব্যথানাশক দিতে পারেন। তবে ওষুধের সঙ্গে ব্যায়াম ও দৈনন্দিন চাপ নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে যেতে হয়। সকালে প্রথম পা ফেলার ব্যথা দীর্ঘদিন থাকলে নির্বাচিত রোগীর জন্য রাতে পরার স্প্লিন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি পা একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে রাখে; সঠিক মাপ ও সহনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ।

* শুধু যন্ত্রভিত্তিক থেরাপি কি যথেষ্ট

পুনর্বাসনকে শুধু মেশিন দিয়ে ব্যথা কমানোর চিকিৎসা হিসাবে দেখা উচিত নয়। সক্রিয় ব্যায়াম, রোগীকে সঠিক নির্দেশনা এবং পায়ের ওপর চাপের পরিকল্পনা চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

* ইনজেকশন, শকওয়েভ ও অস্ত্রোপচার কখন

নিয়মিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পরও ব্যথা থাকলে রোগ নির্ণয় পুনর্মূল্যায়ন করতে হয়। নির্বাচিত দীর্ঘস্থায়ী ক্ষেত্রে শকওয়েভ থেরাপি বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে এর ফল সবার সমান নয়।

স্টেরয়েড ইনজেকশন কিছু রোগীর সাময়িক আরাম দিতে পারে, কিন্তু প্লান্টার ফ্যাসিয়া ছিঁড়ে যাওয়াসহ ঝুঁকি রয়েছে। তাই বারবার ইনজেকশন নেওয়ার প্রবণতা এড়ানো দরকার। নিজের রক্ত থেকে তৈরি প্লেটলেটসমৃদ্ধ প্লাজমা ইনজেকশনও ব্যবহৃত হয়; তবে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে এখনো অনিশ্চয়তা আছে।

অধিকাংশ রোগীর অস্ত্রোপচার লাগে না। দীর্ঘসময় যথাযথ চিকিৎসায় উন্নতি না হলে এবং দৈনন্দিন জীবন উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হলে বিশেষজ্ঞ অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন বিচার করেন। শুধু এক্স-রেতে স্পার দেখা গেছে বলেই অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজন নেই।

* কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে

আঘাতের পর পায়ে ভর দিতে না পারা, হঠাৎ ছিঁড়ে যাওয়ার শব্দসহ ব্যথা, অথবা দ্রুত ফোলা দেখা দিলে দ্রুত মূল্যায়ন জরুরি। জ্বরের সঙ্গে পা লাল ও গরম হওয়া, ক্ষত তৈরি হওয়া, ক্রমবর্ধমান অবশভাব বা বিশ্রামেও অস্বাভাবিক ব্যথা থাকলে ‘স্পারের ব্যথা’ ধরে বসে থাকা ঠিক নয়। ডায়াবেটিসের রোগীর পায়ে নতুন ব্যথা বা ক্ষত হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

লেখক : ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

গোড়ালির ব্যথায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন

গোড়ালির ব্যথায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন

শীতের শুরুতে ফ্লু ও নিউমোনিয়ার টিকা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কেন জরুরি

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কেন জরুরি

পিএমওএস : নারীর হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নীরব সংকেত

পিএমওএস : নারীর হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নীরব সংকেত

শীত আসছে বাড়ছে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস

শীত আসছে বাড়ছে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম