ডায়াবেটিস রোগীর যৌন দুর্বলতা
ডা. মো. মাহমুদ হাসান
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পাশাপাশি যৌনস্বাস্থ্য ও হৃদযন্ত্রের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেক পুরুষের মধ্যে একটি সমস্যা দেখা যায়, যা নিয়ে তারা সহজে কারও সঙ্গে কথা বলতে চান না। সেটি হলো ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা লিঙ্গ উত্থানজনিত সমস্যা। অথচ এ সমস্যাটি শুধু যৌনজীবনের অসুবিধা নয়; কখনো কখনো এটি হৃদরোগের ঝুঁকিরও আগাম সংকেত হতে পারে।
লিঙ্গ উত্থানজনিত সমস্যার সঙ্গে হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, যৌনস্বাস্থ্যের সমস্যার পেছনে যে রক্তনালির ক্ষতি কাজ করতে পারে, একই ধরনের ক্ষতি হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালিতেও দেখা দিতে পারে।
* ইরেকটাইল ডিসফাংশন কী
যৌন মিলনের জন্য প্রয়োজনীয় লিঙ্গের উত্থান তৈরি করতে না পারা অথবা উত্থান তৈরি হলেও তা পর্যাপ্ত সময় ধরে রাখতে না পারাকে ইরেকটাইল ডিসফাংশন (Erectile Dysfunction বা ED) বলা হয়। মাঝে মধ্যে এমন সমস্যা হওয়া মানেই রোগ নয়। কিন্তু সমস্যা বারবার হলে বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পুরুষের মধ্যে এ সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পুরুষদের অর্ধেকেরও বেশি জীবনের কোনো পর্যায়ে এ সমস্যায় ভুগতে পারেন। তাদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস নেই এমন পুরুষদের তুলনায় সমস্যাটি কম বয়সেও দেখা দিতে পারে।
* ডায়াবেটিসে কেন যৌন দুর্বলতা দেখা দেয়
লিঙ্গের স্বাভাবিক উত্থানের জন্য সুস্থ রক্তনালি, পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ, সঠিক স্নায়ুর কার্যক্রম এবং উপযুক্ত হরমোনের প্রয়োজন। ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে এসব ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। প্রথমত, রক্তে অতিরিক্ত শর্করা রক্তনালির ভেতরের আবরণ ও স্নায়ুর ক্ষতি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, লিঙ্গে পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তৃতীয়ত, ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চরক্তচাপ, রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের আধিক্য, স্থূলতা ও ধূমপানের মতো ঝুঁকি যুক্ত হলে সমস্যার আশঙ্কা আরও বাড়ে। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং হরমোনের সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। অর্থাৎ যৌন দুর্বলতার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তাই একে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বা মানসিক সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
* যৌন দুর্বলতার সঙ্গে হৃদরোগের সম্পর্ক কোথায়
লিঙ্গের উত্থানের জন্য রক্তনালি প্রসারিত হয়ে পর্যাপ্ত রক্ত প্রবাহিত হওয়া প্রয়োজন। হৃদযন্ত্রের নিজস্ব রক্তনালিতেও স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ বজায় থাকা জরুরি। ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, ধূমপান ও উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো কারণ শরীরের বিভিন্ন রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ কারণে লিঙ্গে রক্তপ্রবাহের সমস্যা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতেও রোগের প্রক্রিয়া চলতে পারে। তবে দুটি সমস্যার সম্পর্ক থাকলেই যে প্রত্যেক রোগীর হৃদরোগ রয়েছে, তা নয়। কিছু পুরুষের ক্ষেত্রে ইরেকটাইল ডিসফাংশনের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার কয়েক বছর পর হৃদরোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে রক্তনালিজনিত ইরেকটাইল ডিসফাংশন কখনো কখনো এমন হৃদরোগের ঝুঁকি শনাক্ত করতে সাহায্য করে, যা আগে থেকে স্পষ্ট কোনো লক্ষণ সৃষ্টি করেনি। তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কোনো পুরুষের নতুন করে বা ক্রমাগত লিঙ্গ উত্থানজনিত সমস্যা দেখা দিলে শুধু যৌনক্ষমতা বাড়ানোর চিকিৎসা করাই যথেষ্ট নয়; তার সামগ্রিক হৃদরোগের ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
* কখন সতর্ক হবেন
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পুরুষদের নিচের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত-
▶ আগে স্বাভাবিক যৌনক্ষমতা থাকলেও নতুন করে বারবার লিঙ্গ উত্থানে সমস্যা হওয়া।
▶ লিঙ্গের উত্থান তৈরি হলেও তা ধরে রাখতে না পারা।
▶ একইসঙ্গে উচ্চরক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা বা ধূমপানের অভ্যাস থাকা।
▶ দীর্ঘদিন ধরে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকা।
▶ যৌন সমস্যার পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রমে বুকে চাপ, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া।
এসব লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে যৌন দুর্বলতা থাকলেই যে হার্ট অ্যাটাক আসন্ন, এমন ধারণা সঠিক নয়। এটি সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করার একটি সুযোগ।
* কী কী পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে
চিকিৎসক রোগীর বয়স, ডায়াবেটিসের ইতিহাস, উপসর্গ, ওষুধ এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করবেন। সাধারণত বিবেচনা করা হতে পারে-
▶ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও দীর্ঘমেয়াদি শর্করা নিয়ন্ত্রণের সূচক HbA1c পরীক্ষা।
▶ রক্তে কোলেস্টেরল ও অন্যান্য চর্বির মাত্রা নির্ণয়ের জন্য লিপিড প্রোফাইল।
▶ কিডনির কার্যকারিতা ও অন্যান্য ডায়াবেটিসজনিত জটিলতার মূল্যায়ন।
▶ প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোন পরীক্ষা, বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন।
▶ বয়স, উপসর্গ ও সামগ্রিক ঝুঁকি অনুসারে হৃদরোগের মূল্যায়ন।
প্রত্যেক রোগীর সব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। শুধু যৌন দুর্বলতা আছে বলে সবার ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম বা করোনারি এনজিওগ্রাম করাতে হবে, এমনও নয়। পরীক্ষার প্রয়োজন নির্ধারণ করবেন চিকিৎসক।
* নিজে থেকে যৌনক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধ খাবেন না
সিলডেনাফিলজাতীয় ওষুধ কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও নাইট্রেট জাতীয় হৃদরোগের ওষুধের সঙ্গে একত্রে গ্রহণ করলে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়। অনলাইনে বিক্রি হওয়া অজানা উপাদানের ওষুধও এড়িয়ে চলুন।
* কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন
যৌন দুর্বলতার সঙ্গে বুকে ব্যথা বা চাপ, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতি কিংবা ব্যথা হাত, পিঠ বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়লে জরুরি চিকিৎসা নিন। এসব উপসর্গ হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যৌন সমস্যার নিয়মিত চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়।
লেখক : কনসালটেন্ট, অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
