ফ্যাটি লিভার : নীরব রোগ অবহেলায় বাড়ে বিপদ
ডা. নাজমা আক্তার
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
লিভারে চর্বি জমা এখন একটি পরিচিত স্বাস্থ্যসমস্যা। অনেকেই অন্য কোনো কারণে পেটের আলট্রাসনোগ্রাম করাতে গিয়ে জানতে পারেন, তাদের লিভারে চর্বি জমেছে। কিন্তু উপসর্গ না থাকায় অনেকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। কেউ আবার মনে করেন, ফ্যাটি লিভার মানেই লিভার সিরোসিস। বাস্তবে দুটি ধারণাই সঠিক নয়। লিভারে সামান্য চর্বি জমা থেকে শুরু করে প্রদাহ, লিভারের টিস্যুতে ক্ষত তৈরি, সিরোসিস এমনকি লিভার ক্যানসার পর্যন্ত রোগটির অগ্রগতি হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না। সময়মতো ঝুঁকি শনাক্ত ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনলে গুরুতর জটিলতার আশঙ্কা কমানো সম্ভব।
* ফ্যাটি লিভার কী
লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমাকে সাধারণভাবে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। বিপাকীয় সমস্যা, অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস ও রক্তে চর্বির অস্বাভাবিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভারকে বর্তমানে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD) বলা হয়। আগে এটি নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা NAFLD নামে পরিচিত ছিল। এ রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু চর্বি জমতে পারে। পরবর্তী সময়ে কারও কারও লিভারে প্রদাহ দেখা দেয়, যাকে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোহেপাটাইটিস (MASH) বলা হয়। প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী হলে লিভারে ফাইব্রোসিস বা ক্ষত তৈরি হতে পারে যা গুরুতর অবস্থায় সিরোসিসে রূপ নিতে পারে।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, কিছু ওষুধ এবং অন্য রোগের কারণেও লিভারে চর্বি জমতে পারে। তাই সব ধরনের ফ্যাটি লিভারের কারণ এক নয়; সঠিক কারণ নির্ণয় জরুরি।
* কারা বেশি ঝুঁকিতে
ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায় কয়েকটি পরিচিত বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরলের অস্বাভাবিকতা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।
অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার, চিনিযুক্ত কোমল পানীয়, নিয়মিত অতিরিক্ত খাওয়া এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাসও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে শুধু স্থূল ব্যক্তিদেরই ফ্যাটি লিভার হয়, এমন নয়। স্বাভাবিক ওজনের মানুষেরও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। পারিবারিক ইতিহাস ও কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্যও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শরীরের ওজন স্বাভাবিক হলেই লিভার সম্পূর্ণ সুস্থ-এমন নিশ্চয়তা নেই।
* লক্ষণ না থাকলেও বিপদ কেন
ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ মানুষের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। কারও কারও ক্লান্তি, দুর্বলতা বা পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে অস্বস্তি হতে পারে। এসব লক্ষণ অন্য রোগেও দেখা যায়।
রোগ অগ্রসর হয়ে সিরোসিস হলে পেট বা পা ফুলে যাওয়া, চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, সহজে রক্তপাত এবং মানসিক বিভ্রান্তির মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি শুধু লিভারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ রোগের সঙ্গে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও কিডনির সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও স্থূলতা থাকলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
* কখন পরীক্ষা করাবেন
সবার জন্য নিয়মিত আলট্রাসনোগ্রাম করে ফ্যাটি লিভার খোঁজার প্রয়োজন নেই। তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতার সঙ্গে অন্য বিপাকীয় ঝুঁকি, অস্বাভাবিক লিভার এনজাইম অথবা অন্য পরীক্ষায় লিভারে চর্বি ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শে মূল্যায়ন করা উচিত।
প্রাথমিক মূল্যায়নে চিকিৎসক রোগীর ওজন, কোমরের মাপ, রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজ, লিপিড প্রোফাইল এবং লিভার ফাংশন পরীক্ষা বিবেচনা করতে পারেন। আলট্রাসনোগ্রামে চর্বি জমার ধারণা পাওয়া গেলেও এটি দিয়ে লিভারের ক্ষতের মাত্রা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যায় না। লিভার এনজাইম স্বাভাবিক থাকলেও উল্লেখযোগ্য ফাইব্রোসিস থাকতে পারে।
প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষার ফল দিয়ে FIB-4 -এর মতো স্কোর নির্ণয় এবং পরবর্তী ধাপে ফাইব্রোস্ক্যান বা লিভারের শক্তভাব পরিমাপের পরীক্ষা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও পরীক্ষা বা লিভার বায়োপসির পরামর্শ দিতে পারেন।
* প্রতিরোধ ও চিকিৎসা : জীবনযাপনেই বড় পরিবর্তন
ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সংশ্লিষ্ট রোগগুলোর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ।
যাদের ওজন বেশি, তাদের ধীরে ধীরে ওজন কমানো উপকারী। শরীরের মোট ওজনের প্রায় ৫ শতাংশ কমলে লিভারের চর্বি কমতে পারে; ৭-১০ শতাংশ কমাতে পারলে প্রদাহ ও ফাইব্রোসিসের উন্নতিও সম্ভব হতে পারে। তবে দ্রুত ওজন কমানো বা না খেয়ে থাকা ক্ষতিকর।
খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ডাল, পরিমিত ফল, পূর্ণশস্য, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে। অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড এবং অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার কমানো প্রয়োজন। ভাত পুরোপুরি বাদ দেওয়ার পরিবর্তে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ ও সুষম খাবারে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম, যেমন দ্রুত হাঁটা উপকারী। একটানা বসে না থেকে নিয়মিত বিরতি নিয়ে চলাফেরা করাও ভালো অভ্যাস। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, রক্তচাপ ও রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নিজের ইচ্ছায় লিভার পরিষ্কারের ওষুধ, হারবাল সাপ্লিমেন্ট বা তথাকথিত ডিটক্স পানীয় গ্রহণ করা উচিত নয়। কিছু ভেষজ উপাদান উলটো লিভারের ক্ষতি করতে পারে। নির্দিষ্ট রোগী ও রোগের পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধ দিতে পারেন; তবে সব ফ্যাটি লিভারের জন্য একক কোনো ওষুধ নেই। অগ্রসর সিরোসিসের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের নিবিড় চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
* প্রচলিত ধারণা : সত্য না মিথ্যা
▶ ধারণা : ফ্যাটি লিভার হলেই সিরোসিস হবে। সত্য হলো, অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে এমন অগ্রগতি হয় না। তবে প্রদাহ ও ফাইব্রোসিস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
▶ ধারণা : রোগীর কোনো উপসর্গ নেই, তাই চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। সত্য হলো, উপসর্গ না থাকলেও ঝুঁকি মূল্যায়ন ও জীবনযাপনে পরিবর্তন জরুরি হতে পারে।
▶ ধারণা : শুধু মোটা মানুষের ফ্যাটি লিভার হয়। সত্য হলো, স্বাভাবিক ওজনের মানুষেরও এ রোগ হতে পারে।
▶ ধারণা : বিশেষ পানীয় বা ওষুধ খেলেই লিভারের চর্বি গলে যায়। সত্য হলো, এমন দাবির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা এবং বিপাকীয় রোগের নিয়ন্ত্রণই চিকিৎসার ভিত্তি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অ্যান্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগ, মার্কস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
ঢাকা।
