Logo
Logo
×

Advertisement

সুস্থ থাকুন

যোনিপথের শিথিলতা ও টানটান ভাব : মিথ ও বাস্তবতা

Icon

ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

নারীর যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজে বহু প্রশ্ন থাকলেও অনেক বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয় না। এর মধ্যে অন্যতম হলো, যোনিপথ কি খুব ঢিলা বা খুব টাইট হতে পারে? সন্তান প্রসবের পর কি যোনিপথ স্থায়ীভাবে ঢিলা হয়ে যায়? যৌনসম্পর্কের সংখ্যার সঙ্গে কি যোনিপথের গঠনের সম্পর্ক রয়েছে? যোনিপথ টাইট করার জন্য লেজার, ওষুধ বা অস্ত্রোপচার কতটা কার্যকর?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, যোনিপথের গঠন ও কার্যক্ষমতা ব্যক্তিভেদে স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন। ‘লুজ ভ্যাজাইনা’ বা ‘টাইট ভ্যাজাইনা’ এগুলো প্রচলিত ভুল শব্দ। কখনো এ ধরনের অনুভূতির পেছনে পেলভিক ফ্লোরের পেশি, প্রসবজনিত পরিবর্তন, মেনোপজ, ব্যথা বা অন্য কোনো চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা থাকতে পারে। আবার কখনো শারীরিক অসুস্থতা ছাড়াই ব্যক্তিগত অনুভূতি বা সামাজিক প্রত্যাশা এ ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। যৌন উত্তেজনার সময় যোনিপথে স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। যৌনক্রিয়ার সময় আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পর্যাপ্ত উত্তেজনা, স্বাভাবিক আর্দ্রতা এবং পেশির উপযুক্ত শিথিলতা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, যোনিপথের পেশি অতিরিক্ত সংকুচিত থাকলে বা পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে অস্বস্তি কিংবা ব্যথা হতে পারে। তাই শুধু ‘টাইট’ বা ‘লুজ’ অনুভূতি দিয়ে যৌনস্বাস্থ্য ভালো না খারাপ, তা নির্ধারণ করা যায় না।

* লুজ ভ্যাজাইনা বলতে কী বোঝায়

Vaginal laxity বা যোনিপথ ঢিলা মনে হওয়া বলতে সাধারণত একজন নারীর নিজের অনুভূতিতে যোনিপথের আগের তুলনায় কম দৃঢ়তা বা কম ঘর্ষণ অনুভব করাকে বোঝানো হয়। এটি নিজে থেকে সব সময় কোনো রোগের নাম নয়। তবে এর সঙ্গে যদি প্রস্রাব ধরে রাখতে সমস্যা, যোনিপথে ভারী লাগা, নিচের দিকে কিছু নেমে আসার অনুভূতি, অথবা দৈনন্দিন জীবনে অস্বস্তি থাকে, তাহলে পেলভিক ফ্লোরের দুর্বলতা বা পেলভিক অর্গান প্রোল্যাপসের মতো সমস্যার মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কারও যোনিপথ ঢিলা মনে হলেই তার পেশি দুর্বল, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। শারীরিক পরীক্ষা ও উপসর্গের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

* টাইট ভ্যাজাইনা বলতে কী বোঝায়

যোনিপথে প্রবেশের সময় অতিরিক্ত টান, চাপ, অস্বস্তি বা ব্যথা অনুভূত হলে অনেকে একে ‘টাইট ভ্যাজাইনা’ বলেন। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন-

▶ পেলভিক ফ্লোরের পেশি অতিরিক্ত সংকুচিত থাকা

▶ ভ্যাজাইনিসমাস বা প্রবেশের চেষ্টা হলে পেলভিক ফ্লোরের পেশির অনিচ্ছাকৃত সংকোচন

▶ মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন কমে যোনিপথের শুষ্কতা ও টিস্যুর পরিবর্তন

▶ সংক্রমণ, ত্বকের রোগ বা যোনিমুখের অন্য কোনো সমস্যা

▶ পূর্ববর্তী আঘাত, অস্ত্রোপচার বা প্রসবজনিত ক্ষত

▶ উদ্বেগ, ভয়, পূর্ববর্তী কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা অথবা ব্যথার আশঙ্কা।

তাই যোনিপথ অতিরিক্ত টাইট মনে হলে শুধু পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করাই সমাধান নয়। কিছু ক্ষেত্রে পেশি শিথিল করার প্রশিক্ষণ ও পেলভিক ফ্লোর ফিজিওথেরাপি উপযোগী হতে পারে।

* কেন যোনিপথের অনুভূতি পরিবর্তিত হয়

যোনিপথের অনুভূতি ও কার্যক্ষমতা একাধিক শারীরিক, হরমোনজনিত ও মানসিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

▶ সন্তান প্রসব : যোনিপথ দিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় পেশি ও সহায়ক টিস্যু প্রসারিত হয়। প্রসবের পর ধীরে ধীরে অনেক পরিবর্তন স্বাভাবিক অবস্থার দিকে ফিরে আসে। তবে কারও ক্ষেত্রে পেশির দুর্বলতা, ক্ষত বা পেলভিক ফ্লোরের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

▶ বয়স ও মেনোপজ : বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে পেশি ও সংযোজক টিস্যুতে পরিবর্তন ঘটে। মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন কমে যোনিপথের আর্দ্রতা, স্থিতিস্থাপকতা ও টিস্যুর স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে।

▶ পেলভিক ফ্লোরের কার্যক্ষমতা : পেশি দুর্বল হলে কিছু নারীর প্রস্রাব ধরে রাখতে সমস্যা বা ভারী লাগার অনুভূতি হতে পারে। আবার পেশি অতিরিক্ত শক্ত হয়ে থাকলেও ব্যথা ও প্রবেশে অসুবিধা দেখা দিতে পারে।

▶ হরমোন ও শারীরিক অবস্থা : গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান, মেনোপজ এবং কিছু চিকিৎসার কারণে যোনিপথের আর্দ্রতা ও আরামে পরিবর্তন হতে পারে।

▶ মানসিক অবস্থা : ভয়, উদ্বেগ, সম্পর্কের সমস্যা এবং পূর্ববর্তী কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা শরীরের পেশির প্রতিক্রিয়া ও যৌনস্বাচ্ছন্দ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব পরিবর্তন মানেই রোগ নয়। কোন পরিবর্তন চিকিৎসার প্রয়োজন তৈরি করছে, তা নির্ভর করে উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা ও ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাবের ওপর।

* যৌনসম্পর্কের সংখ্যা বা সঙ্গীর সংখ্যার সঙ্গে কি যোনিপথ ঢিলা হওয়ার সম্পর্ক আছে

এটি নারীর যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা।

যোনিপথ নমনীয় টিস্যু দিয়ে গঠিত। স্বাভাবিক যৌনসম্পর্কের কারণে এটি স্থায়ীভাবে ঢিলা হয়ে যায়, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যৌনসম্পর্কের সংখ্যা বা সঙ্গীর সংখ্যা দিয়ে যোনিপথের আকার, সতীত্ব কিংবা যৌনস্বাস্থ্যের মান নির্ধারণ করা যায় না।

যোনিপথের গঠন ও কার্যক্ষমতায় প্রসবের ইতিহাস, বয়স, হরমোন, পেলভিক ফ্লোরের অবস্থা এবং অন্যান্য শারীরিক বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। কারও যৌনসম্পর্কের ইতিহাস দেখে তার যোনিপথের গঠন নির্ভরযোগ্যভাবে অনুমান করাও সম্ভব নয়।

নারীর শরীর নিয়ে এমন ধারণা সামাজিক লজ্জা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং সম্পর্কের মধ্যে অযথা চাপ তৈরি করতে পারে। যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বিজ্ঞান, পারস্পরিক সম্মান ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের ভিত্তিতে।

* প্রতিরোধে কী করা যায়

সব ধরনের যোনিপথের পরিবর্তন প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে পেলভিক ফ্লোরের স্বাস্থ্য এবং যৌনস্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে কিছু পদক্ষেপ সহায়ক হতে পারে।

▶ প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্টের কাছ থেকে পেলভিক ফ্লোরের ব্যায়াম শেখা।

▶ কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে তার উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া এবং দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগের অভ্যাস এড়িয়ে চলা।

▶ প্রসবের পর ব্যথা, প্রস্রাব ধরে রাখতে সমস্যা বা নিচের দিকে ভারী লাগার অনুভূতি থাকলে মূল্যায়ন করানো।

▶ মেনোপজের পর যোনিপথের শুষ্কতা বা ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

▶ যোনিপথের ভেতরে সাবান, সুগন্ধি, রাসায়নিক বা তথাকথিত টাইট করার উপাদান ব্যবহার না করা।

▶ যৌনসম্পর্কে ব্যথা হলে তা সহ্য না করে কারণ নির্ণয় করা।

▶ স্বাস্থ্যকর ওজন, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা এবং সামগ্রিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া।

মনে রাখতে হবে, সব নারীর একই ব্যায়াম বা চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। পেশি দুর্বল হলে শক্তিশালী করার ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। পেশি অতিরিক্ত সংকুচিত থাকলে শিথিলকরণ ও বিশেষায়িত ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন হতে পারে।

* চিকিৎসা পদ্ধতি, ওষুধ, ফিজিওথেরাপি ও সার্জারির ভূমিকা

চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো উপসর্গের কারণ বোঝা। গাইনোকোলজিস্ট বা প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরোগাইনোকোলজিস্ট শারীরিক পরীক্ষা, রোগের ইতিহাস এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন।

লেখক : সেক্সুয়াল হেলথ এডুকেটর, সেক্স এডু উইথ ডক্টর দৃষ্টি।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ফ্যাটি লিভার : নীরব রোগ অবহেলায় বাড়ে বিপদ

ফ্যাটি লিভার : নীরব রোগ অবহেলায় বাড়ে বিপদ

ডেঙ্গু টেস্ট নেগেটিভ আসার পরও কি ডেঙ্গু হতে পারে

ডেঙ্গু টেস্ট নেগেটিভ আসার পরও কি ডেঙ্গু হতে পারে

যোনিপথের শিথিলতা ও টানটান ভাব : মিথ ও বাস্তবতা

যোনিপথের শিথিলতা ও টানটান ভাব : মিথ ও বাস্তবতা

ডায়াবেটিস রোগীর যৌন দুর্বলতা

ডায়াবেটিস রোগীর যৌন দুর্বলতা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম