Logo
Logo
×

Advertisement

সুরঞ্জনা

অচলায়তন

নারীর সম্মান শুধু বক্তৃতা ও কাব্যগাথায় সীমাবদ্ধ না হোক

Icon

হাজেরা বেগম

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

সব প্রশংসা মহান আল্লাহর, যিনি নারীর পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত নির্ধারণ করে নারীকে সম্মানিত করেছেন। মানুষের জীবনে তার প্রথম শিক্ষক একজন মা তথা নারী। যুগে যুগে এ নারী জাতি রাজনীতি, যুদ্ধ, প্রশাসনসহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন এবং রাখছেন। ইতিহাসে এমন অনেক নারী আছেন যারা সরাসরি যুদ্ধে নেতৃত্ব ও নির্দেশনা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে জোয়ান অব আর্ক, রানী সৌতিক ও আমাদের দেশের তারামন বিবি অন্যতম। কেউ সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন, আবার কেউ সেনাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। শতবর্ষের যুদ্ধে ফরাসি সেনাবহরের নেতৃত্ব দিয়ে অমর হয়ে আছেন জোয়ান অব আর্ক। এ ছাড়াও ইসলামি ইতিহাসে হজরত আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) জঙ্গে জামালে (উটের যুদ্ধে) স্ববিদ্যমান থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইতিহাস সাক্ষী, স্বয়ং মহানবি (সা.) হুদায়বিয়ার সন্ধিতে তাঁর সহধর্মিণীর মতামত নিয়ে সামনে এগিয়ে ছিলেন। গ্রানাডা যুদ্ধে সামরিক প্রশাসনের মূল দায়িত্বে ছিলেন স্পেনের রানি ইজাবেলা। শুধু সমরেই নয়, নারী নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজনীতিতেও। আধুনিক বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক যিনি তিন দফায় শ্রীলঙ্কার সরকার প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন।

তারপরও নারীকেই এক শ্রেণির মানুষ সর্বকালে অবলা হিসাবে অপমান আর অবজ্ঞা করে আসছে। তারা ভুলেই যায় যে, নারীর উদরেই তাদের জন্ম। এই শ্রেণির মানুষগুলো নারীকে কথায়, আচরণে, কৌশলে, মাঠে-ঘাটে, ঘরে-বাইরে হেয় আর নিচু করে দেখতে এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করে না।

আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা অনেক কিছুই একজন নারীর মধ্যে দিয়েছেন। নারীকে তিনি এমন সব দিয়েছেন যা পুরুষের মাঝে নেই। আবার এমন সব কিছু পুরুষকে দিয়ে পাঠিয়েছেন যা নারীতে নেই। স্বভাবতই দুটি বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মানুষের একে অন্যকে প্রয়োজন। যে প্রয়োজন থেকেই নারী-পুরুষের জীবনসঙ্গীর বিধান রয়েছে। বিধান অনুসরণ করেই একজনের সঙ্গে অপরজনের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে ওঠে। সেখানে একজন নারীকে যদি অবমূল্যায়ন করা হয়, তবে বন্ধুত্ব বা শ্রদ্ধাবোধ কোনোটাই বাঁচে না।

একজন নারীকে পদে পদে লড়তে হয়। বাঁচার লড়াই, মর্যাদার লড়াই, অস্তিত্বের লড়াই। একজন নারীর জীবনে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিকূলতা থাকে। এসব প্রতিকূলতাকে যোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা আর কর্মগুণে মোকাবিলা করতে হয়। যুগে যুগেই নারীর ওপর একশ্রেণির পুরুষের অবমূল্যায়ন ছিল। তবে একেক যুগে নারীর লড়াইয়ের ধরন একেক রকম। কালের সঙ্গে লড়াইয়ের ধরনেই কেবল পরিবর্তন এসেছে। একজন ছেলেকে সংসার কিংবা কর্মক্ষেত্রে সামান্য ভুলের জন্য শুনতে হয় না ‘ছেলে মানুষ-এমনটা তো হতেই পারে’। অপরদিকে একই ভুল একজন নারীর বেলায় হলে শুনতে হয় ‘মেয়ে মানুষ’।

এই ‘মেয়ে মানুষ’ শব্দ দুটি তাচ্ছিল্যের স্বরে সমাজে উচ্চারিত হয়। আজকালকার যুগে নারীদের ছেলেদের সঙ্গে একই পরীক্ষায় প্রতিযোগিতা করে উত্তীর্ণ হয়ে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করলেও ‘মেয়ে মানুষ’ শব্দ দুটি যেন শ্রবণ করতে না হয়, সেই দিক ভেবে নারীদের তুলনামূলকভাবে আরও বেশি যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে হয়। আবার যোগ্যতার মাপকাঠিতে শীর্ষে উঠলেই শুনতে হয়, মেয়ে মানুষ হয়েও পুরুষের চেয়ে এগিয়ে আছে-সেও আরেক বিড়ম্বনা। সংসার জীবনে স্ত্রী কোনো বিষয়ে মতামত প্রকাশ করলে কিছু গৃহকর্তা উচ্চস্বরে বলে উঠেন, ‘মেয়ে মানুষ, কথা কম বল।’ খেয়াল রাখতে হবে, সেই ঘরের মেয়েরাও অন্যের ঘরে এমন আচরণেই অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।

অনেকে নানা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কন্যা সন্তানদের ডাক্তার কিংবা প্রকৌশলী বানাতে স্কুল-কলেজে পাঠান না (ব্যতিক্রম থাকতে পারে)। অথচ সেই মানুষটির নিজ স্ত্রী কিংবা মেয়ের প্রসব বেদনায় যখন হাসপাতালে যেতে হয়, তখন ঠিকই একজন মহিলা সার্জন ও নার্সদের সেবা প্রত্যাশা করেন। একইভাবে একজন বক্তা মঞ্চে উঠে সমানতালে নারীর উচ্চ শিক্ষার কথা বলেন, অধিকার ও ক্ষমতায়নের বুলি আওড়ান, অথচ দিন শেষে সেই বক্তাই নারীর যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দিতে চান না।

সুতরাং নারী শুধু বক্তব্য ও লেখনীর একটা শোভাবর্ধনকারী শব্দ এমন দৃষ্টিভঙ্গি সমকালীন কোনো সমস্যা নয় বরং তা যুগ যুগ ধরে কিছু সংকীর্ণমনা লোকেরা বয়ে বেড়াচ্ছে। শত শত বছরেও সেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেনি। নারীরাও পারে, তারা পুরুষেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের আলাদা ভাবা, অবলা ভাবা বা তাচ্ছিল্য করা কেবল হীন মানুষের পরিচয় হতে পারে। সব ক্ষেত্রেই নারীর মতামতের মূল্যায়ন করতে হবে। মানুষের সুস্থ-সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি ঘর থেকে শুরু করতে না পারলে বাহিরে আদৌ সম্ভব নয়। গল্প, কবিতা, উপন্যাসে একজন নারীর রূপ, গুণ আর মর্যাদার কথা যেমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় তাকে যদি বাস্তবেও তেমনি আসনে রাখা হতো তাহলেই পৃথিবী সুন্দর হয়ে উঠত। সুন্দর পৃথিবী গড়তে সুঠাম দেহের সুদর্শন পুরুষ কিংবা সুন্দরী নারীর প্রয়োজন নেই। সৎ, দায়িত্ববান, কর্মঠ আর সুন্দর মনের মানুষের প্রয়োজন হয়।

সবশেষে আমরা একেবারেই নিরাশ হতে চাই না। যুগে যুগে অনেক মহাপুরুষেরও জন্ম হয়েছে। যারা একজন নারীর হাতে হাত রেখে নারীকে ঊর্ধ্বে টেনে মর্যাদার আসনে আসীন করেছেন। সেসব মহাপুরুষের সংখ্যা যদিও নগণ্য, তবু আমরা আশা হারাতে চাই না। তাই শুধু কাব্যগাথায় কিংবা সভা-সেমিনারের বক্তব্যে নারীর মর্যাদাকে সীমাবদ্ধ না রেখে মনে, প্রাণে ও কর্মে নারীর মূল্যায়ন হোক।

লেখক : ঊর্ধ্বতন প্রশিক্ষক, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

চুয়াডাঙ্গার মেয়ে এলিজা এখন সিডনির ডেপুটি মেয়র

চুয়াডাঙ্গার মেয়ে এলিজা এখন সিডনির ডেপুটি মেয়র

ড. হেবা এল-সেওয়েডি পোড়া মানুষের শরীরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন জীবন ও মর্যাদা

পোড়া মানুষের শরীরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন জীবন ও মর্যাদা

মানিকগঞ্জের কৈট্টায় তরুণ নারী সম্মেলন জনজীবনে তরুণ নারীদের নেতৃত্ব বিকাশের প্রত্যয়

জনজীবনে তরুণ নারীদের নেতৃত্ব বিকাশের প্রত্যয়

অচলায়তন নারীর সম্মান শুধু বক্তৃতা ও কাব্যগাথায় সীমাবদ্ধ না হোক

নারীর সম্মান শুধু বক্তৃতা ও কাব্যগাথায় সীমাবদ্ধ না হোক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম