Logo
Logo
×

Advertisement

সুরঞ্জনা

মানিকগঞ্জের কৈট্টায় তরুণ নারী সম্মেলন

জনজীবনে তরুণ নারীদের নেতৃত্ব বিকাশের প্রত্যয়

নারী সংবাদ

Icon

ইমন চৌধুরী, মানিকগঞ্জ থেকে ফিরে

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

জনজীবনে নারীর নেতৃত্ব প্রদান ও বিকাশের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ১৭-১৮ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জের কেট্টায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়নকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়েছে দুদিনব্যাপী তরুণ নারী সম্মেলন। নারীপক্ষের আয়োজনে নরওয়ে দূতাবাস ও ইউএন ওমেনের সহযোগিতায় এ সম্মেলনে অংশ নেন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত তরুণ নারীরা। সম্মেলনের উদ্দেশ্য-তরুণ নারী, মেন্টর ও রাজনৈতিক নেত্রীদের মধ্যে পারস্পরিক শিখন, নেটওয়ার্কিং, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সহযোগিতা বৃদ্ধি, অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব, নাগরিক সম্পৃক্ততা, স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ, জনজীবনে তরুণ নারীদের সম্ভাবনা, নেতৃত্ব ও অবদান সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা।

জাতীয় সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হয় সম্মেলন। ইউএন ওমেনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি গীতাঞ্জলী সিং এ সম্মেলন উদ্বোধন করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন নারীপক্ষের সভাপতি কে এ জাহান রুমী। পাশাপাশি সম্মেলনের উদ্দেশ্য, প্রকল্প পরিচিতি এবং নেতৃত্ব ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নারীপক্ষের অবস্থান তুলে ধরেন সংগঠনের সদস্য মাহীন খান।

গীতাঞ্জলী সিং বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ নারী আন্দোলন রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও রাজপথে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গেছে। তবে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি কমে গেছে। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে নারীদের এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে। এর জন্য একটি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে সমতার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা যায়।’

পাশাপাশি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন দলের নারী সংসদ-সদস্যদেরও নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় একমঞ্চে এসে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

মূল অধিবেশন ‘জনজীবনে নারী নেতৃত্ব : অংশগ্রহণ থেকে প্রভাব বিস্তার’ পর্বে আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য ড. নিলোফার চৌধুরী মনি, এনসিপি নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য জলি তালুকদার, সাংস্কৃতিক কর্মী বীথি ঘোষ ও নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের প্রভাষক তাপসী দে প্রাপ্তি। এ পর্বের সঞ্চালক ছিলেন নারীপক্ষের সদস্য সাদাফ সায সিদ্দিকী ও কামরুন নাহার।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘এ সময় এসেও নারীরা যেন দেশের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাদের এখনো সংগ্রাম করতে হচ্ছে প্রথম শ্রেণির নাগরিক হয়ে ওঠার। বছরের পর বছর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও নারীদের প্রথম সারির নাগরিক হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে লড়াই করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালেও নারীকে তার যোগ্যতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হচ্ছে। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু নারীদের প্রস্তুত করলেই হবে না, পুরুষদের মানসিকতারও পরিবর্তন করতে হবে।’

মনোনয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, ‘অভিজ্ঞতার অজুহাতে নারীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একজন পুরুষ অভিজ্ঞতা ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে নারীদেরও সে সুযোগ পাওয়া উচিত।’

এনসিপি নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি বলেন, ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীর বসা কোনো বিশেষ লক্ষ্য হতে পারে না, এটি স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হওয়া উচিত। তবে সমাজে নারীদের সবসময় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয় বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। একটি বড় ব্যানার ধরতে কয়েকজন নারীকে সামনে রাখা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাদের আর দেখা যায় না। মিছিলের সামনে থাকা বা ছবিতে দৃশ্যমান থাকাকে রাজনৈতিক সুযোগ হিসাবে দেখানো হলেও মনোনয়ন, নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকে।’

পুরুষ জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর তুলনায় বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছেন উল্লেখ করে শিক্ষা, পুষ্টি, বিশ্রাম ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সংসদ ও রাজনৈতিক দলগুলোয় এখনো পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো বিদ্যমান। এ কাঠামো ভাঙাটা জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা দেখেছি, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন করা হয়েছে বেশ ঘটা করে। অথচ দুঃখজনক বিষয় হলো, সংস্কার কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি।’

এরপর নারীপক্ষের সদস্য সামিয়া আফরীনের সঞ্চালনায় মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে আলোচক ও বিভিন্ন জেলা থেকে আগত তরুণ নারীরা পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির মঞ্চ-সর্বত্র পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে নারীর অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তরুণ নারী সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে তিনি বলেন, ‘২০৩১ সালের মধ্যে বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে সরাসরি নির্বাচনে ৩০ জন নারী প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, নারী নির্বাচনে জিতে আসতে পারবেন না-এ যুক্তি ভালো যুক্তি নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নারীর ওপর রাজনৈতিক সহিংসতা একটি অপসংস্কৃতি। এর বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই চরম দক্ষিণপন্থার দিকে যাচ্ছে। আমাদের দেখতে হবে, আমরা কোন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হব এবং কোন ধরনের রাজনীতির সঙ্গে থাকব।’

সম্মেলনের সমাপনী পর্বে অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ইউএন ওমেনের বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ নবনীতা সিনহা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, সামিনা লুৎফা, মেন্টর ও সাংবাদিক ডেইজি মউদুদ এবং এনসিপি নেত্রী মহুয়া জান্নাত।

নারীর অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠায় অতিথিরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি তাদের প্রত্যাশার স্বপ্নও ছড়িয়ে দেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত তরুণ নারীর মাঝে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

চুয়াডাঙ্গার মেয়ে এলিজা এখন সিডনির ডেপুটি মেয়র

চুয়াডাঙ্গার মেয়ে এলিজা এখন সিডনির ডেপুটি মেয়র

ড. হেবা এল-সেওয়েডি পোড়া মানুষের শরীরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন জীবন ও মর্যাদা

পোড়া মানুষের শরীরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন জীবন ও মর্যাদা

মানিকগঞ্জের কৈট্টায় তরুণ নারী সম্মেলন জনজীবনে তরুণ নারীদের নেতৃত্ব বিকাশের প্রত্যয়

জনজীবনে তরুণ নারীদের নেতৃত্ব বিকাশের প্রত্যয়

অচলায়তন নারীর সম্মান শুধু বক্তৃতা ও কাব্যগাথায় সীমাবদ্ধ না হোক

নারীর সম্মান শুধু বক্তৃতা ও কাব্যগাথায় সীমাবদ্ধ না হোক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম