চুয়াডাঙ্গার মেয়ে এলিজা এখন সিডনির ডেপুটি মেয়র
শেখ আব্দুর রহিম
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চুয়াডাঙ্গার দর্শনার শ্যামপুর। মাটির গন্ধ, চেনা পথ আর আপন মানুষের ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা একটি গ্রামের মেয়ে আজ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে নতুন এক পরিচয়ের অধিকারী। এলিজা আজাদ রহমান টুম্পা এখন সিডনির নিউ সাউথ ওয়েলসের ক্যামডেন কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার বুকে এটা তার অনন্য অর্জন। ভিনদেশে তার এ অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এর সঙ্গে মিশে আছে দেশের সুনাম, অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম, নারীর নেতৃত্ব, মানুষের জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষা এবং শিকড় থেকে উঠে আসা এক স্বপ্নের গল্প।
গত ৮ সেপ্টেম্বর ক্যামডেন কাউন্সিলের সাধারণ সভায় কাউন্সিলরদের ভোটে অস্ট্রেলিয়ার ভিন্স ফেরেরি মেয়র এবং এলিজা রহমান ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন। তাদের মেয়াদ ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নর্থ ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে এলিজার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে সেই পথ তাকে এনে দিয়েছে ডেপুটি মেয়রের দায়িত্বে।
অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী হিসাবে তার এ অর্জন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রবাসে বাংলাদেশিদের নানা ক্ষেত্রে সাফল্যের গল্প থাকলেও স্থানীয় রাজনীতির নেতৃত্বে নারীর এমন উত্থান নতুন অনুপ্রেরণা তৈরি করেছে। তার সাফল্য প্রমাণ করে-জন্মভূমি থেকে দূরে থেকেও একজন মানুষ নিজের যোগ্যতা, পরিশ্রম ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে নতুন সমাজে নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করতে পারেন। দেশকে নিজের যোগ্যতা আর মেধা দিয়ে তুলে ধরতে পারেন বিশ্ব মঞ্চে। এলিজার শিকড় চুয়াডাঙ্গার দর্শনার শ্যামপুর গ্রামে। তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদুল ইসলাম। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে শিক্ষার্থী হিসাবে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান এলিজা। নতুন দেশ, নতুন সমাজ এবং ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ধীরে ধীরে যুক্ত হন সামাজিক কর্মকাণ্ডে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করতে করতে তৈরি হয় তার রাজনৈতিক ভিত্তি। পরে তিনি লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হন। দিন দিন নিজ যোগ্যতা আর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে জায়গা করে নেন দলের শীর্ষস্থানে।
তবে এ পথ ছিল সহজ নয়। একজন অভিবাসী এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে তাকে অর্জন করতে হয়েছে মানুষের আস্থা। পরিবার ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কমিউনিটির মানুষের সহযোগিতাকে তিনি নিজের পথচলার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবে দেখেছেন। বহু সাংস্কৃতিক সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার নেতৃত্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তিনি ক্যামডেন কাউন্সিলের মাল্টিকালচারাল রেফারেন্স গ্রুপের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পাওয়ার পর এলিজার বক্তব্যেও ফুটে উঠেছে সেই দায়িত্ববোধ। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বলেন, ‘আমি আমার নতুন পদে এ চমৎকার কমিউনিটির সেবা চালিয়ে যেতে মুখিয়ে আছি। আমরা একসঙ্গে যে কাজগুলো করতে পারব, সেগুলোর জন্য আমি উন্মুখ।’ তার এ কথায় পদমর্যাদার চেয়ে মানুষের জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষাই যেন বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নেতৃত্ব তার কাছে ক্ষমতার আসন নয়, বরং মানুষের আরও কাছে যাওয়ার সুযোগ।
অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের নেতৃত্বের পথ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। মাসুদ খলিল ও মাসুদ চৌধুরীর মতো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিরা ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন এর আগে। সুমন সাহাও স্থানীয় সরকারের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসাবে এ দায়িত্ব পাওয়া এলিজার পরিচয়কে আলাদাভাবে ফুটিয়ে তোলে। যা প্রবাসী বাংলাদেশি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রবাসে বাংলাদেশিদের সাফল্যের গল্পে ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা প্রযুক্তির কথা প্রায়ই উঠে আসে। এলিজার এই যাত্রা তাই শুধু একজন নারীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি নারীদের জন্যও এক শক্তিশালী বার্তা। পরিবেশ ও পরিচয়ের ভিন্নতা যতই থাকুক, যোগ্যতা, পরিশ্রম, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নেতৃত্বের সাহস থাকলে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই তৈরি করা যায় নিজের নতুন ঠিকানা। এলিজার গল্প সেখানে যোগ করেছে জনসেবা ও স্থানীয় রাজনীতির একটি নতুন অধ্যায়। দর্শনার শ্যামপুর থেকে সিডনির ক্যামডেন-এই দীর্ঘ পথ যেন ছোটবেলার সেই ভাব-সম্প্রসারণের কথা মনে করিয়ে দেয়, ‘জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো’।
