Logo
Logo
×

Advertisement

সুরঞ্জনা

ড. হেবা এল-সেওয়েডি

পোড়া মানুষের শরীরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন জীবন ও মর্যাদা

যাই তবু এগিয়ে

Icon

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

আগুনের ক্ষত কেবল শরীরে দাগ বা চিহ্ন রেখে যায় না; অনেক সময় তা মানুষের আত্মবিশ্বাস, স্বাভাবিক জীবন ও সমাজে ফিরে যাওয়ার পথকেও কঠিন করে তোলে। ভয়াবহ অগ্নিদগ্ধতার পর একজন মানুষকে সুস্থ করে তোলা তাই কেবল অস্ত্রোপচার কিংবা ওষুধের বিষয় নয়-এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানসিক পুনর্বাসন, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং নতুন করে জীবন শুরু করার সাহস।

এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই হাজারো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন মিসরের মানবিক স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ড. হেবা এল-সেওয়েডি। দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে তার দীর্ঘদিনের কাজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০২৬ সালের ১৮ মে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ৭৯তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তাকে Director-General's Award for Global Health প্রদান করেন।

ড. হেবা এল-সেওয়েডির কাজের বিশেষত্ব হলো-তিনি দগ্ধ রোগীর চিকিৎসাকে শুধু হাসপাতালের বিছানা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখেননি। চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন রোগীর মানসিক পুনর্বাসন, সামাজিকভাবে পুনঃএকীভূত হওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার কাজের প্রশংসা করে বলেছে, তিনি এমন একটি সমন্বিত দগ্ধ-চিকিৎসা মডেল এগিয়ে নিয়েছেন, যেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনঃএকীভূতকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, তার উদ্যোগ দগ্ধ ব্যক্তিদের শুধু শারীরিকভাবে সুস্থ হতে নয়, মর্যাদার সঙ্গে নতুন করে জীবন গড়তেও সহায়তা করছে।

হেবা এল-সেওয়েডির মানবিক কাজের শুরু হয়েছিল মিসরের কঠিন এক সময়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তাহরির স্কয়ারে আহত মানুষের চিকিৎসায় কাজ করার মধ্য দিয়ে তার মানবিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। সেই অভিজ্ঞতা তাকে আরও বড় পরিসরে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেয়।

২০১৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Ahl Masr Foundation। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি দগ্ধ মানুষের চিকিৎসা, সচেতনতা, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে কাজ বিস্তৃত করে।

হেবা এল-সেওয়েডির দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-একজন দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা অস্ত্রোপচার শেষ হওয়ার সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। ২০২৬ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ত্বক প্রতিস্থাপনের সাফল্য শুধু অপারেশন দিয়ে বিচার করা যায় না; এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসনও যুক্ত।’

এ চিন্তাধারার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় Ahl Masr Burn Hospital-এ। হাসপাতালটি দগ্ধ রোগীদের জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন ও মানসিক-সামাজিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেয়।

২০২৬ সালের শুরুতে মিসরের সংবাদমাধ্যমে হাসপাতালটির গুরুতর দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা ও ত্বক প্রতিস্থাপনের কয়েকটি সাফল্যের কথা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশ শরীর দগ্ধ এক তরুণের সফল চিকিৎসার ঘটনাও ছিল। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তার সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসার মুহূর্তে চিকিৎসক ও পরিবারের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

এখানেই তার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দিক ফুটে ওঠে। তিনি শুধু দুর্ঘটনার পর মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাননি; একইসঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে মানুষ এমন দুর্ঘটনার শিকার কম হয়, সেই সচেতনতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছেন।

একজন মানুষ আগুনে পুড়ে গেলে শরীরের ক্ষত হয়তো চিকিৎসায় শুকিয়ে যায়। কিন্তু মুখের দাগ, শরীরের বিকৃতি, দীর্ঘ চিকিৎসার স্মৃতি কিংবা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি-এসব ক্ষত অনেক সময় আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়। ড. হেবা এল-সেওয়েডির কাজ সেই জায়গাতেই আলাদা হয়ে ওঠে।

তিনি দেখিয়েছেন, চিকিৎসা মানে শুধু রোগ সারানো নয়; চিকিৎসা মানে একজন মানুষকে আবার নিজের জীবনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। একটি পোড়া শরীরকে সুস্থ করার পাশাপাশি তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া, তাকে সমাজে সম্মানের সঙ্গে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া এবং নতুন করে ভবিষ্যৎ দেখার সাহস জোগানো-এই মানবিক দর্শনই ড. হেবা এল-সেওয়েডির কাজের মূল শক্তি।

গ্রন্থনা- রাফিয়া আক্তার

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

চুয়াডাঙ্গার মেয়ে এলিজা এখন সিডনির ডেপুটি মেয়র

চুয়াডাঙ্গার মেয়ে এলিজা এখন সিডনির ডেপুটি মেয়র

ড. হেবা এল-সেওয়েডি পোড়া মানুষের শরীরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন জীবন ও মর্যাদা

পোড়া মানুষের শরীরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন জীবন ও মর্যাদা

মানিকগঞ্জের কৈট্টায় তরুণ নারী সম্মেলন জনজীবনে তরুণ নারীদের নেতৃত্ব বিকাশের প্রত্যয়

জনজীবনে তরুণ নারীদের নেতৃত্ব বিকাশের প্রত্যয়

অচলায়তন নারীর সম্মান শুধু বক্তৃতা ও কাব্যগাথায় সীমাবদ্ধ না হোক

নারীর সম্মান শুধু বক্তৃতা ও কাব্যগাথায় সীমাবদ্ধ না হোক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম