যাই তবু এগিয়ে
মানবাধিকার রক্ষায় অটল একজন নাভি পিল্লাই
Advertisement
সুমন্ত গুপ্ত
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পুরো নাম নাভানেথেম পিল্লাই। তিনি নাভি পিল্লাই নামেই সুপরিচিত। চলতি বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে আলোচনায় এসেছেন ফের। ১৯৪০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশের বর্ণবৈষম্যে বিভক্ত শহর ডারবানে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। তার বাবা-মা ছিলেন ভারতের তামিল বংশোদ্ভূত। নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ওই প্রদেশের প্রথম নারী হিসাবে নিজস্ব আইন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের বহু কর্মীর পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক হন। এরপর রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) সভাপতিত্ব করেন। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করেছিল এই ট্রাইব্যুনাল। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন। গত বছর এ কমিশন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, গাজায় গণহত্যার জন্য ইসরাইল দায়ী।
বর্তমানে পিল্লাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একজন বিচারক। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে চলমান মামলার সঙ্গেও তিনি যুক্ত। গাজায় গণহত্যার বিরোধিতা করা ছাড়াও একের পর এক মানবাধিকার রক্ষায় বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তিধরের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। তার স্বীকৃতি হিসাবে তিনি ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। গাজায় ইসরাইল গণহত্যার জন্য দায়ী বলে ঘোষণা করা জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়াসহ দীর্ঘ কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে কাজ করেছেন ৮৫ বছর বয়সি পিল্লাই। তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেরও (আইসিজে) বিচারক।
গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে কয়েক দশক ধরে কাজ করার জন্য পিল্লাইয়ের প্রশংসা করেছে নোবেল কমিটি। তাদের ভাষায়, তার এ দীর্ঘ পথচলায় ছিল বিচারিক কঠোরতা, ব্যক্তিগত সততা ও অসাধারণ সাহস। নিজ দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার রক্ষায় জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছেন পিল্লাই। শিক্ষাজীবনে বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে বয়কট ও মিছিলে অংশ নিয়েছেন। পরে তিনি দেশটির সুপরিচিত কয়েকজন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীর আইনি লড়াইয়ে যুক্ত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন ফিলিস নাইডু ও স্ট্রিনি মুডলি।
১৯৭৩ সালে পিল্লাই এমন একটি মামলা পরিচালনা করেন, যা রবিন দ্বীপে বন্দি রাজনৈতিক বন্দিদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। এর মধ্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকারও ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনামলে এ দ্বীপের কারাগারেই বন্দি ছিলেন কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। ২০১৬ সালে ‘ডিপ্লোম্যাটিক কুরিয়ার’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিল্লাই বলেন, ‘বর্ণবাদী শাসনের অধীনে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই আমার মানবাধিকারবিষয়ক প্রাথমিক কাজের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি অনেক চ্যালেঞ্জকেই নিজের সুবিধায় কাজে লাগিয়েছি। জাতিগত বৈষম্যের মামলাগুলোতে সুরক্ষা দিতে আমাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন শিখতে হয়েছে।’
গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালিয়েছে বলে ২০২৫ সালে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন, সেটির নেতৃত্বও দিয়েছেন পিল্লাই। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেওয়া এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় সম্ভাব্য সবকিছু করার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে ‘সব ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার’ আহ্বান জানান পিল্লাই। মানবাধিকার রক্ষার পাশাপাশি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি। পিল্লাই আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইকুয়ালিটি নাউ’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন। সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করতে কাজ করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ-পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সমতার অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও অবদান রয়েছে তার। বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে যেন কেউ বৈষম্যের শিকার না হন, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করেছেন পিল্লাই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম প্রধান দিক।
