স্তন ক্যানসার : এক নীরব ঘাতক
Advertisement
ফাবিহা সাহাব উদ্দিন
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্যানসার শব্দটা শুনলেই একসময় মনে যে আতঙ্ক জেগে উঠত, বর্তমানে তা খানিকটা যেন স্বাভাবিক হয়েছে। স্বাভাবিক হয়েছে এই অর্থে যে, আগে এটি কদাচিৎ শুনতে পেলেও, বিগত বছরগুলোয় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তি বিশেষ করে নারীর সংখ্যা যেন হু হু করে বাড়ছে। আমাদের দেহযন্ত্রে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন রোগ বাসা বাঁধছে।
আজ থেকে প্রায় ২৫ কিংবা ৩০ বছর আগে নিরুর (ছদ্মনাম) এক আত্মীয়ের মৃত্যু হয় স্তন ক্যানসারে। গ্রামীণ পরিবেশে সে আত্মীয়ের মৃত্যুটি একরকম ‘অস্বাভাবিক’ ছিল। বেশির ভাগ নারীই চাপা গলায় ‘এই রোগ’ নিয়ে ফিসফিস করে নানা মন্তব্য করছিলেন। কেউ খাওয়ার বাছবিচার নিয়ে আলোচনা করছিলেন, কেউ বা চালচলন নিয়ে মন্তব্য করছিলেন। নিরুর মনে আছে, আজকালকার ব্রা পরেই এসব রোগ হয়-এমন একটি মন্তব্যও তিনি শুনেছিলেন তখন।
নিরু সেসময় ছোট ছিলেন। অনেক বছর পরের ঘটনা। বয়সে ততদিনে বেশ খানিকটা পরিণত হয়েছেন তিনি। আবারও একদিন নিরু স্তন ক্যানসার সম্পর্কে শুনলেন। এবার সময়টা ২০১২ সাল। তার এক বান্ধবীর মায়ের শরীর খারাপ। প্রায় দিনই কোচিংয়ে মেয়েকে নিয়ে আসা মানুষটা হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়লেন জেনে খুব মন খারাপ হলো। এই তো সেদিনও তো এলেন। এত অসুস্থ তো একটু বুঝতে পারেননি কেউ। সেইসঙ্গে নিরুর ছোটবেলার সেই আত্মীয়ের কথা মনে পড়ল। বান্ধবীর জন্যও মনটা খারাপ হলো। ছলছল চোখে প্রার্থনা করলেন তার মায়ের জন্য। সৃষ্টিকর্তা ফিরে চাইলেন; সঠিক চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরে এলেন সেই মা।
একই মানুষের জীবনে দুটি ঘটনা, তবে ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
২০২৪ সালের তথ্যানুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রায় ২৪ লাখ নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত, যার মাঝে ৭ লাখ নারীকেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি! এ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নারীদের কী অবস্থা? কীভাবে দেখছেন এ রোগকে তারা? কিংবা কতটুকু সচেতন তারা? এ নিয়ে আলোচনায় জানা যায় ‘স্তন ক্যানসার’ সম্পর্কে দেশের রাজধানীর নারীরাও সঠিকভাবে জানেন না। মফস্বল কিংবা গ্রামে এটি আগের মতোই যেন মরণব্যাধি! স্তন ক্যানসারের অন্যতম কারণ হলো জেনেটিক্স। মূলত পরিবারে মা অথবা খালাদের যদি স্তন ক্যানসার থাকে তবে সে পরিবারে নারী সদস্যদের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। এটিই মূলত ‘হাই রিস্ক’ জোন। এ ছাড়া পরিবারে হিস্ট্রিতে কারও এ রোগ না থাকলেও এটি হতে পারে। সাধারণত মেনোপজের শুরুতে এ রোগের আশঙ্কা কমতে থাকে। তবু অনেকের ক্ষেত্রে ৫০ বছরের পরও এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ত্রিশোর্ধ্ব থেকে ৬৫ বছর বয়সি অনেক নারীই স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে ‘স্তন ক্যানসার’ সম্পর্কে নানা সচেতনতার কথা বলা হলেও এখনো অনেকেই এটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না। বিশেষ করে যেখানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এখনো নারীদের মাসিক বা ঋতুস্রাবের বিষয়টিই একটি ট্যাবু। সেখানে স্তন ক্যানসার একেবারেই নতুন ধারণা।
বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারের রোগীর সংখ্যা এবং বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের রেডিও থেরাপি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা, তানিন সুলতানা বলেন, ‘বর্তমানে স্তন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। এটি যেমন ভাবার বিষয়, একইসঙ্গে আশার বিষয় হচ্ছে নারীরা এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন। কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই তারা ডাক্তারের শরণাপন্ন হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সহজেই এটি নিরাময় করা সম্ভব। তবে আমাদের দেশে নারীদের চিকিৎসাপ্রাপ্তির বিষয়টি এখনো সহজ নয়। বিশেষ করে গ্রাম কিংবা মফস্বলের নারীরা প্রাথমিকভাবে, পরিচিতজনদের কাছে যান চিকিৎসার জন্য। কবিরাজ, নানারকম ঘরোয়া টোটকাই প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে নেওয়া হয় এবং এখানেই চিকিৎসকরা পিছিয়ে যান। কারণ, এ রোগটি যত সময় গড়ায় ততই ছড়িয়ে পড়ে এবং চাইলেও তখন চিকিৎসকদের আর কিছু করার থাকে না।’
তবে কি এর কোনো প্রতিকার নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. তানিন সুলতানা বলেন, ‘আছে অবশ্যই। সঠিক জীবনযাপনই এর মূল ওষুধ। বর্তমানে নারী-পুরুষ সবার জীবনেই এসেছে পরিবর্তন। পরিবর্তন এসেছে আশপাশের পরিবেশেও। প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটা, সঠিক নিয়মে খাওয়া, ঘুম খুবই জরুরি। সেইসঙ্গে স্তন ক্যানসারের লক্ষণগুলো প্রতি মাসের মাসিক শেষ হওয়ার ১০ দিন পর, নিজে নিজে পরীক্ষা করা হতে পারে নিজেকে এ রোগের হাত থেকে রক্ষা করার অন্যতম হাতিয়ার।’
নগরায়নের কারণে পরিবর্তিত জলবায়ুতে পরিবেশেও বেড়েছে নানা দূষণ। নারীরা কাজের জন্য এখন ঘর থেকে বেরোচ্ছেন ঠিকই, তবে তাদের ওপর থাকা পারিবারিক, সামাজিক-নানা চাপও শরীরকে সইতে হয়। নারী চাইলেই হাওয়া খেতে হাঁটতে বেরোতে পারেন না। এখনো পরিবারের সেরা খাবারটি তুলে রাখা হয় পরিবারের পুরুষ সদস্যটির জন্য। তবে দিন পালটাচ্ছে। অন্য অনেক রোগের মতো এটিও কমে আসবে এমন প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি। তার জন্য প্রয়োজন স্তন ক্যানসার সম্পর্কে পূর্ণ সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা। তবেই এ নীরব ঘাতক থেকে মুক্তি মিলবে নারীর।
