প্রাসঙ্গিক
সমাজ ও পারিবারিক ব্যবস্থায় নারী
Advertisement
মোর্শেদা মৌ
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নারী, তার থাকে বহুরূপ। কখনো মাতা, কখনো কন্যা, কখনো স্ত্রী, কখনো ভগ্নি। তবে পরিচয় একই, সে শুধু নারী। যখন পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়, তখন চারদিকে খুশির ফোয়ারা বয়ে যায়; কন্যাসন্তান জন্ম দিলে ঠিক তার উলটো হয় এ একবিংশ শতাব্দীতেও। একটি মেয়ে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে প্রবেশ করে, চোখে অজস্র লাল-নীল স্বপ্ন সাজায়। পারিবারিক বন্ধন ছেড়ে একসময় চলে যেতে হয় সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশে। বিদায়বেলা বাবা-মায়ের দিব্যি থাকে, সমাজে আমাদের মাথা নিচু করও না। গুরুজনকে সম্মান করও, কারও মনে কষ্ট দিও না।
ধরাবাঁধা নিয়মে ধীর পদক্ষেপে প্রবেশ করে স্বামীর ঘরে। পুরুষশাসিত সমাজে শুরু হয় গাম্ভীর্যপূর্ণ আচরণ। মানে, নারী জন্মায় সবার সুখের জন্য, সবার মন জুগিয়ে চলার জন্য। সবকিছু মানিয়ে নিয়ে পথচলা শুরু হয় তার। সবার সুখের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উজাড় করে দেয় নারী। তারপরও গতানুগতিক কিছু মানুষের বৈরী আচরণ থেকেই যায়। সারাক্ষণ আতঙ্কে কাটে। হয়তো কোথাও ভুল হয়ে গেছে, এটা ভেবে আরও বেশি উদ্যমী হয়। পরিবারের সবচেয়ে ভরসাস্থল প্রিয়জনের মুখখানি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। মনের অব্যক্ত কথাগুলো বলবে, নিজেকে হালকা করবে। তারপর ব্যক্তিটি ঘরে আসে। প্রতিদিনের মতো সেবা যত্নের পর মুখ খুলতেই একটা বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট হয় চেহারায়। কর্কশ গলায় বলে, ‘এসব শুনতে ভালো লাগে না।’
থমকে যায় নারী, হোঁচট খায় জীবন চলার পথে। অনেক কথা উদয় হয় মনের আকাশে। কিছু বলতে পারে না। তিনি কষ্ট পেলে অপয়া, অলক্ষ্মী তকমা লেগে যাবে জীবনের সঙ্গে। কর্তাকে হারানো যাবে না কিছুতেই। চিরচেনা মুখটি ক্রমেই অচেনা হতে শুরু করে। চোখের সামনে কালো পর্দা নেমে আসে। পৃথিবীটাকে অন্ধকার মনে হয়। বেঁচে থাকার সব অর্থই যেন মূল্যহীন হয়ে পড়ে। তারপরও বেঁচে থাকে সংসারে। বেঁচে থাকতে হয় সমাজে।
আদর্শ নারী বলতে আমরা বুঝি, নারী জোরে হাসতে পারবে না, জোরে কদম ফেলে মাটিতে হাঁটতে পারবে না। নিজের সব কষ্ট বুকে ছাইচাপা দিয়ে হাসতে হবে। অথচ অন্তরে বয়ে যাবে কালবৈশাখীর তাণ্ডবলীলা। বাস্তবে তাকে থাকতে হবে নীরব, নিথর। কিন্তু কেন? কীসের জন্য? কার জন্য এ ছলনা? এ সমাজটার জন্য তো! কী হবে এ সমাজ দিয়ে? কী হবে আদর্শ নারী সেজে? অসহ্য যন্ত্রণায় ব্যথায় ছটফট করে নারী। জীবনের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। তখন সমাজ তাকে শোনায় না সান্ত্বনার বাণী। মিলিয়ে দেয় না তার বাস্তব জীবনের কঠিন হিসাব। নারীও মানুষ, রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। তার জীবনে দুঃখ থাকবে, কষ্ট থাকবে। কিন্তু পরিত্রাণের পথ থাকবে না? তাহলে কেমন সমাজ? স্বামী শুনবে না তার যন্ত্রণার কথা, শেয়ার করবে না তার দুঃখ-কষ্ট। তাহলে কেমন বন্ধন? অথচ এ নারী কত রাত জেগে ঘুমহীন চোখে কত সমস্যার কথা শোনে, কষ্টের কথা শোনে। সান্ত্বনা দেয় আন্তরিকভাবে, সহানুভূতিশীলা হয়ে পাশে দাঁড়ায়। কেন আজও তাকে কালো পর্দা চোখে লাগিয়ে অন্ধ লোকের মতো পথ চলতে হয়?
জগৎ সংসারে নারী কি আদৌ সুখী? অবশ্য অনেকে কষ্ট আড়াল করে অভিনয় করে সুখী থাকার। কেন এ লুকোচুরি? একটাই তো জীবন। সে জীবনে যদি সুখ-ই না থাকে, তাহলে কী হবে এ সমাজব্যবস্থা দিয়ে? আবার কিছু ক্ষেত্রে বধূ বিছানায় যখন স্বামীর প্রতীক্ষায় প্রহর গোনে, পরম পূজনীয় মানুষটি তখন অন্য নারীর সান্নিধ্যে মধু যামিনী কাটিয়ে ঘরে ফেরে। সমাজ তখন না দেখার ভান করে নিশ্চুপ হয়ে যায়। এটাই আমাদের সমাজ। আমাদের দেশের নারীর যন্ত্রের মতো বেঁচে থাকা। সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। গড়ে উঠুক একটি সুস্থ সুন্দর সমাজ। শান্তিময় হোক পুরো মানবজাতির বসবাস।
প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, সুবিদখালী সরকারি কলেজ পটুয়াখালী
