কন্যা সন্তানের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের দায়
Advertisement
রুকাইয়া সাওম লীনা
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ‘বাবা এসেছে’ ভেবে দরজা খুলে ১০ বছরের শিশু, তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে প্রতিবেশী। ফরিদপুরে ইজি-বাইক চালক এক কন্যা শিশুকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে এবং ব্যর্থ হয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ প্রতিবেশীর সেপটিক ট্যাংকে লুকিয়ে রাখে। মাত্র দুটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো। পত্রিকার পাতা খুললে এমন আরও অনেক ঘটনা রোজ আমাদের চোখে পড়ে।
বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে কন্যা শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী নির্যাতন, নিপীড়ন এবং হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হওয়াদের তালিকায় কন্যা শিশুদের সংখ্যা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদ্যালয় থেকে শুরু করে নিজ গৃহ-কোথাও আমাদের কন্যা শিশুরা পুরোপুরি নিরাপদ নয়। সমাজ ও পরিবারের সচেতনতার পাশাপাশি এ সংকট থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রকে সবার আগে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারাক্রান্ত মনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘আমরা তো যেটা দেখছি, এখন আসলে নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কন্যা নিরাপত্তাটা বেশি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ যা নির্যাতন, হত্যা এগুলো হচ্ছে এসবের মধ্যে কন্যার সংখ্যা বেশি বা সমান সমান প্রায়। কাজেই সেই দিক থেকে কন্যা বা কন্যা শিশুর নিরাপত্তাটা এখন বড় ইস্যু হয়ে গেছে এবং সেখানে দেখা যাচ্ছে যে স্কুল, বাড়ির আশপাশের এক বাসা থেকে অন্য বাসায় যাচ্ছে-সেখানেও কোনো নিরাপত্তা নেই। দুই-একটা করে বিচার হচ্ছে কিন্তু বেশিরভাগই বিচার প্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তো এই যে বিচারহীনতার যে জায়গাটা, সেই জায়গাটাকে তো উন্নত করতেই হবে এবং তার পাশাপাশি এখন যেরকম আমরা দেখছি যে বাল্যবিয়ের পক্ষে অ্যাডভোকেসি করা হচ্ছে, সেটাকে প্রমোট করার চেষ্টা করা হচ্ছে-এগুলো করে করে কন্যাদের আরও নাজুক অবস্থায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। তার অধিকার, তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হিসাবে তো গড়ে তোলার দায়টার জায়গাতে আমরা খুবই অবহেলা করছি। সমাজের একটা দায়িত্ব নিশ্চয়ই থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া, রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করা ছাড়া, বিচার ব্যবস্থাটাকে যথেষ্ট শক্তিশালী করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা-এটা না করতে পারলে আমরা আসলে এই জায়গাটার খুব একটা উন্নতি করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের অনেক নীতি আছে কিন্তু সেই নীতির বাস্তবায়নের যেন একটা যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সেই জায়গাটাতে আমরা একেবারেই গুরুত্ব দিচ্ছি না। এটা তো সমাজ করবে না, এটা তো রাষ্ট্রকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের যে নীতি আছে শিশুর সুরক্ষার জন্য, সেই নীতিগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের দিকে সরকারকে দৃঢ় ভূমিকা নিতে হবে, দায়বদ্ধতা দেখাতে হবে। তাহলেই কেবল এ পরিস্থিতি থেকে আমরা আমাদের কন্যা সন্তানদের রক্ষা করতে পারব। আমার মনে হয় রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপটাই প্রথম হবে। রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ হলে তখন কিন্তু অভিভাবক ও সমাজ সবাই সচেতন হবে। অভিভাবকরা তো সচেতন হয়েও কিছু করতে পারছে না। একজন অভিভাবক তো একটা মেয়েকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে পারে না। তাকে তো স্কুলে পাঠাবে, তাকে তো নানা কারণে সে তার মতো জীবন যাপন করবে। স্বাভাবিকভাবে এটাই তো অভিভাবকরা চায় এবং সেটা করতে গিয়ে সে তো কিছু করতে পারছে না। ঘরেও তো সে নিরাপদ নয়। অপরাধগুলোকে সহজভাবে গ্রহণ মানে অপরাধগুলোকে অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত না করার ফলে ঘরেও সে নিরাপদ থাকছে না। কাজেই অপরাধগুলোকে অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করার দায়িত্বটা হচ্ছে রাষ্ট্রের। কাজেই রাষ্ট্রের দায়িত্বটাই প্রথম। রাষ্ট্র যদি কিছু বার্তা দেয় সেই বার্তার মধ্য দিয়ে সমাজ বদলাবে, সমাজ বদলালে পরিবারও সেখানে একটা ভূমিকা পালন করবে। অতএব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির মাধ্যমেই কেবল বিচারহীনতার এ সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব। বহু ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া কিংবা সুবিচার না পাওয়ার কারণে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এর পাশাপাশি বাল্যবিয়ের মতো কুপ্রথাগুলোকে প্রমোট করে কন্যা শিশুর মৌলিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এ সংকট উত্তরণে রাষ্ট্রকে আরও কঠোর হতে হবে। প্রথমত, নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনগুলোর দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বাস্তবায়ন জরুরি, যাতে অপরাধীরা পার পেতে না পারে। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে এবং প্রতিটি এলাকায় নজরদারি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি অধিকার সম্পর্কে নারীদের সচেতন করার জন্য রাষ্ট্রকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বোপরি, কন্যা শিশুরা যেন নির্ভয়ে, নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠতে পারে-এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমেই কেবল কন্যা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।’
