সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন লালমনিরহাটের ফুটবল কন্যাদের
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার টেপুরগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জিতেছে ইউনিসেফ অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের ফুটবলে শিরোপা। পাঁচটি খেলায় অংশ নিয়ে প্রতিপক্ষকে তারা ২৯টি গোল করেছে। লিখেছেন-
Advertisement
মো. মিজানুর রহমান দুলাল
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গ্রামের লোকেরা বাবা-মাকে নানা কথা বলেন : মরিয়ম
লেফ্ট আউটের তুখোড় খেলোয়াড়। চলতি বছর ঢাকায় ইউনিসেফ অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের ফুটবলে শিরোপা জয়ে দলের হয়ে তিনটি গোল করেছে মরিয়ম খাতুন। লালমনিরহাটের পাটগ্রামের টেপুরগাড়ি এলাকার দিনমজুর বাবা রফিকুল ইসলামের মেয়ে। মা নুরন্নাহার গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট্ট সে। পড়ছে পাটগ্রাম টেপুরগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুর রশিদের অনুপ্রেরণায় ফুটবল খেলায় হাতেখড়ি তার। পারিবারিক অভাব-অনটন আর গ্রামের নানা কুসংস্কারমূলক কথাবার্তা তার ফুটবল খেলায় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতেই পারেনি।
এ প্রসঙ্গে মরিয়ম জানায়, ২০১৬ সালে স্কুলের হয়ে প্রথম বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে দেশসেরা হন। এতেই ঘুরে যায় মরিয়মের ভাগ্যের চাকা। পারিবারিকভাবে আর কেউ তাকে খেলতে নিষেধ করেনি। মরিয়ম খাতুন বলেন, আমি জাতীয় দলের হয়ে বিদেশে খেলার স্বপ্ন দেখি। এ নিয়েও বাবা-মা ভাবেন, আমাকে প্রায় সময় মা-বাবা বলেন, ‘মা রে আমরা যে গরিব! তোকে তো সাহায্য করার মতো টাকা-পয়সা আমাদের নেই।’ আমি বাবা-মাকে বলি- ‘আমার জন্য তোমরা শুধু দোয়া করিও। দেখবে, সত্যিই একদিন আমি দেশের জন্য ফুটবল খেলে বিদেশ থেকে জয় ছিনিয়ে এনেছি।’
স্বপ্ন দেখি শিরোপা জয় করব : লিভা আক্তার
দলের অন্যতম স্ট্রাইকার। চলতি বছর ঢাকায় ইউনিসেফ অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের ফুটবলে সর্বোচ্চ ১৬টি গোল করে সেরা গোলদাতার পুরস্কার পেয়েছে লিভা আক্তার। পাটগ্রামের টেপুরগাড়ি এলাকার কৃষক মতিয়ার রহমানের দ্বিতীয় মেয়ে লিভা। মা মনিফা বেগম গৃহিণী। পাঁচ বোন এক ভাই, বাবা-মা নিয়েই তাদের সংসার। বাবার একার আয়ে এতজন মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। সংসারে অভাব-অনাটন থাকলেও লিভার লেখাপড়া, ফুটবল খেলা দুটোই সমানতালে চলছে। তবে ফুটবল খেলতে গিয়ে নানা কুসংস্কারের মুখোমুখিও হতে হয়েছে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া লিভা আক্তারকে। এ প্রসঙ্গে লিভা আক্তার বলে, গ্রামবাসীর কাছে আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়, মেয়েরা কেন হাফ প্যান্ট পরবে! কেন ফুটবল খেলবে? এত কথা শোনার পরও চোখের পানি মুছে ফুটবল খেলতে ঠিকই মাঠে নেমেছি। মাঠে লিভা জ্বলে উঠেছে আপন নৈপুণ্যে। লিভা আক্তারের মতে, পাটগ্রাম টেপুরগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী আমি। প্রধান শিক্ষক আবদুর রশিদ স্যারের অনুপ্রেরণায় খেলা শুরু করেছিলাম। কিন্তু খেলতে গিয়ে বারবার নানারকম বাধার মুখে পড়তে হয় আমাকে। গ্রামবাসীর মধ্যে কেউ কেউ আমার বিরুদ্ধে বাবা-মায়ের কাছে নালিশ করত। তারা বলত- ‘মেয়ে হয়ে কেন ছেলেদের খেলা খেলবে লিভা?’ এসব কথা শুনে আমার অভিভাবকরাও ভরকে যেতেন। মাঠে ফুটবল অনুশীলন করতে বাধা দিতেন। কিন্তু ফুটবল আমাকে টানে। তাই বাড়িতে সবার অগোচরে অনুশীলন চালিয়ে যাই। ২০১৬ সালে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবলে ইউনিয়ন, উপজেলা জেলা আর বিভাগ জয়ের পর যখন দেশ জয় করে পাটগ্রাম টেপুরগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তখনই আমরা ঘুরে দাঁড়ালাম। পরিবারের লোকজনও গ্রামীণ কুসংস্কার ঝেরে ফেলে আমাদের উৎসাহ দিতে লাগলেন। সম্প্রতি আমি, আমাদের দলের মুনকি ও মরিয়মসহ তিনজন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে (বাফুফে) এক মাস অনুশীলন করার সুযোগ পাই। পিইসি পরীক্ষা শেষে আবারও অনুশীলন করব। আমার স্বপ্ন জাতীয় দলের হয়ে বিদেশে খেলে বাংলাদেশের জন্য শিরোপা নিয়ে আসা।
কারও কারও গালমন্দও শুনতে হয় : গোলাপি
পাটগ্রামের প্রাণকৃষ্ণ গ্রামের মেয়ে গোলাপি আক্তার দলের গোলরক্ষক হয়ে খেলছেন। গোলাপি আক্তার গোলপোস্টের সামনে দাঁড়ালে প্রতিপক্ষ দলের স্ট্রাইকারদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে ওঠে। এর পেছনে কারণ রয়েছে। ২০১৬ সালে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম টেপুরগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে ঢাকার মাঠে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণরত প্রতিপক্ষের কোনো দলের খেলোয়াড়ই তার জালে বল ঢোকাতে পারেনি। এবার ঢাকায় ইউনিসেফ অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের ফুটবলে শিরোপা জয়েও এই গোলাপি আক্তারের জালকে কোনো বল ছুঁতে পারেনি। এই গোলাপিরও স্বপ্ন জাতীয় দলের হয়ে খেলার। বাবা মোহাফেল একজন মুদি দোকানদার। মা সাহেদা বেগম গৃহিণী। ছয় বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে গোলাপি পঞ্চম। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে গোলাপির পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি ফুটবল খেলার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। সেই ফুটবল খেলা নিয়ে গ্রামের কেউ কেউ তার বাবা-মার কান ভারি করে। এ প্রসঙ্গে গোলাপি আক্তার বলেন, গ্রামের কেউ কেউ চাননি আমি ফুটবল খেলি। তাদের কথা মেয়েরা ফুটবল খেলবে কেন? শুধু তাই নয়, এই ফুটবল খেলার কারণে রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে কারও কারও টিপ্পনি শুনতে হয়। কেউ কেউ আবার ‘ছেলে’ বলেও ডাক দেয়। যে যত কথাই বলুক। আমি পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল খেলা চালিয়ে যাব। কারণ আমি বড় হয়ে জাতীয় দলে খেলতে চাই।
অনাহারে থেকেও অনুশীলন করি : মুনকি আক্তার
দলের অধিনায়ক ও স্ট্রাইকার। চলতি বছর ঢাকায় ইউনিসেফ অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের ফুটবলে আটটি গোল করে দলকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। লিভা আক্তারেরই মামাতো বোন মুনকি আক্তার। দুই বোনেরই স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিপক্ষের মধ্যে আতংক সৃষ্টিতে জুড়ি নেই। মুনকির বাবা আবদুল মজিদ একজন দিনমজুর। মা মহিমা বেগম গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে মুনকি বড়। পাটগ্রাম টেপুরগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। পড়ালেখার পাশাপাশি ফুটবলে অন্যরকম আসক্তি তার। আর এই আসক্তি এসেছে মূলত ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুর রশিদের অনুপ্রেরণায়।
মুনকির মতে, প্রধান শিক্ষক আবদুর রশিদ স্যার বাড়িতে অনুশীলন করার জন্য আমাকে একটি ফুটবল কিনে দিয়েছিলেন। ফলে স্কুলের পাশাপাশি বাড়িতেও অনুশীলন করি। কিন্তু গ্রামবাসীর কেউ কেউ এ নিয়ে ঠাট্টা করতেন। এও বলতেন, দিনমজুর বাবার মেয়ে যেখানে ঠিকমতো খেতে পরতে পারে না, সেখানে ফুটবল খেলবে কেন? হতাশা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন নিয়ে ফের মাঠে নামি।
আমার স্বপ্ন পূরণ করবে এই মেয়েরাই : আবদুর রশিদ
প্রধান শিক্ষক, পাটগ্রাম টেপুরগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
২০১৬ সালে পাটগ্রাম টেপুরগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা অর্জন করেছিল আমাদের মেয়েরা। এবার জিতেছে ইউনিসেফ অনূর্ধ্ব-১৬। প্রতিপক্ষের বল আমাদের মেয়েদের জাল ছুঁতেই পারেনি। আমাদের দলের প্রতিটি মেয়ে শুধু খেলোয়াড় নন, যেন এক একটি নক্ষত্র। এটা বুঝতে পেরেছিলাম বলেই ওদের ফুটবল খেলায় উৎসাহিত করি। ওদের নিরলস পরিশ্রমের সফলতার প্রমাণও মিলছে একাধিকবার। তারা এখন স্বপ্ন দেখছে বিদেশের মাটিতে খেলে বাংলাদেশের জন্য সম্মান ছিনিয়ে আনার। কিন্তু ওদের এই স্বপ্ন পূরণে একটাই বাধা দারিদ্র্য। সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে এই মেয়েরাই ফুটবল খেলায় আলো ছড়াবে। দলের গোলরক্ষক গোলাপি আক্তার ছাড়া বাকি তিনজনই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে অনুশীলনের জন্য ডাক পেয়েছে। বাকিরাও নিজ নিজ যোগ্যতায় জায়গা করে নেবে। এমন প্রত্যাশাই করি। আমার স্বপ্ন পূরণ করবে এই মেয়েরাই।
