দুর্গম পাহাড়ে দুর্বার নারী
কাশ্মীরে হাসপাতাল, চিকিৎসক ছাড়া একাই সন্তান জন্ম দিচ্ছেন মায়েরা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সবেমাত্র ভোরের আলো পড়েছে পীর পাঞ্জালের দুর্গম পাহাড়ের লেজে। পায়ের নিচের বেয়াড়া পথটি তখনও পিচ্ছিল। একপেয়ে সেই আঁকাবাঁকা পথ ধরেই চলছিল ফাতিমা দেদারদের কাফেলা। পেছনে এক পাল পশু। জম্মুর রাজৌরি থেকে ১৩৪ মাইল (২১৫ কিমি.) দূরের কাশ্মীরের উঁচু চরে যাওয়ার এই একটাই পথ। হঠাৎই প্রসববেদনা শুরু হয় ২৩ বছরের অন্তঃসত্ত্বা বধূ ফাতিমার। দীর্ঘ যাত্রাপথেই সন্তান জন্ম দেন ফাতিমা। এ দুর্ভোগ ফাতিমার একার নয়- দুর্গম এ পাহাড়ি বসতির হাজার হাজার নারীর আজন্ম ‘অভিশাপ’! প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সন্তান প্রসবের এ দুঃসাহসিক মুহূর্তটি একাই মোকাবিলা করছেন তারা। সুউচ্চ এই পাহাড়ি অঞ্চলের একমাত্র যানবাহন ঘোড়া। আশপাশের ৮/১০ মাইলের ভেতর হাসপাতাল নেই; নেই কোনো হাতুড়ে ডাক্তারও। ফলে কারও সহায়তা ছাড়াই সন্তান জন্ম দিতে হয় পাহাড়ে বাস করা ফাতিমার মতোন এমন দুর্বার নারীদের। দ্য গার্ডিয়ান।
‘মোগল সড়ক’ খ্যাত পীর পাঞ্জালের এই শতবর্ষী পথ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৫০০ মিটার উঁচু। রাস্তাটি ‘পীর কি গলি’ নামেও পরিচিত। বরফ গলার মৌসুমে জম্মুর গুজ্জর ও বাকারওয়াল যাযাবর সম্প্রদায়ের প্রায় ১০ লাখ পরিবার নিজেদের পশু (গুরু/মহিষ) নিয়ে ছুটে আসে কাশ্মীরের এ অঞ্চলে। মাকড়সার জালের মতো গভীর জঙ্গলে ঘেরা শতবর্ষী এ গিরিপথে রাত নামলেই ঘিরে ধরে ঘন কুয়াশার দল। পিচ্ছিল হয়ে যায় পায়ের তলার মাটি। থেমে যায় কাফেলার যাত্রাপথ। তখন দল বেঁধে সেখানেই তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটান তারা। প্রায় ৭০ মেষপালকের এমন এক দলেই ছিলেন ফাতিমা। ভোর হতেই ছোটেন গন্তব্যে!
গ্রীষ্ম মৌসুমে বরফ গললেই গুজ্জর ও বাকারওয়ালের ১০ লাখ যাযাবর পরিবার নিজেদের পশু নিয়ে চলে আসেন এই গভীর জঙ্গলে। প্রায় কয়েক মাস চরে বেড়ান এই অঞ্চলে। নির্দিষ্ট একটি এলাকা সাফ করে সেখানে অস্থায়ী বসতিও গড়ে তোলেন তারা। নতুন ঠিকানায় আসার সময় গর্ভবতী নারীরাও ভারী মাল বহন করেন। চলতি পথে অনেক শিশুর জন্ম হয় গাছতলায়, নদীর ধারে কিংবা বন আশ্রয়ে। ফাতিমা বলেন, ‘এখানে কোনো ক্লিনিক, নার্স বা ডাক্তার নেই’। সন্তানের জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরও ফাতিমাকে দুর্বল শরীর নিয়ে আবার ঘোড়ায় চড়তে হয়। নবজাতককে কাপড়ে বেঁধে তাকে নিয়ে চলতে হয়। অনেকে না খেয়ে থেকেও সন্তান জন্ম দেন। যারা হাসপাতালে পৌঁছান, তারা পৌঁছান চরম দুর্বলতা, রক্তস্বল্পতা বা সংক্রমণ নিয়ে। একই দশায় পড়েন পীর পাঞ্জালের থেকে একটু নিচু উপত্যকা দুধপাথরির যাযাবর বাসিন্দারাও। কাশ্মীরের বুডগাম জেলার সীমান্তবর্তী এ পাহাড়ি অঞ্চলেও চিকিৎসা সংকট। মাত্র একটি ছোট হাসপাতাল। দুধপাথরি থেকে প্রায় ৬ মাইল দূরে।
২০১৬ সালে দুধপাথরিতেই ফোজিয়া চৌধুরী নামে এক নারী মাত্র ১৬ বছর বয়সে সন্তান জন্ম দেন। বলেন, ‘আমি তখন নিজেই শিশু’। ১৪ বছরেই বিয়ে হয় ফোজিয়ার। তার খাবার ছিল শুধু এক কাপ দুধ আর একটি রুটি। তাই প্রসবের সময় তিনি ভয়াবহভাবে দুর্বল ছিলেন। ধাত্রী সাইরা বেগম বলেন, ‘আমাদের কাছে শুধু পুরোনো শেখা জ্ঞান। না আছে ওষুধ, না আছে
ডাক্তার। আমি অসুস্থ হলে এই নারীদের সাহায্য করবে কে?’ সাইরা বেগম এখনও এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় রক্তক্ষরণ এত বেশি হয় যে মাকে বাঁচানো যায় না।’ ২০২১ সালে দুধপাথরিতে আট মাসের গর্ভবতী গুলনাজকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি মারা যান। তিনি লিভারের সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০২২ সালের সরকারি তথ্য বলছে, জম্মু–কাশ্মীরের মাতৃমৃত্যুর হার (এমএমআর) প্রতি লাখে ৪৬ যা
ভারতের গড় মাতৃমৃত্যুহারের চেয়ে কম। কিন্তু এই তথ্যের বাইরে রয়ে যায় যাযাবর নারীদের বাস্তবতা যারা কখনোই হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে তাদের মৃত্যু নথিভুক্তও হয় না।
শ্রীনগরের জনস্বাস্থ্য গবেষক ড. মুশতাক ওয়ানি বলেন, ‘হাসপাতালের তথ্য দিয়ে এমএমআর হিসাব হয়। যাযাবর নারীরা তো সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছান না তাই তাদের মৃত্যু হিসাবেই আসে না।’ জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) জানায়, শুধু কাশ্মীর নয়, বিশ্বের অন্যান্য যাযাবর নারীরাও একই সমস্যার মধ্যে থাকেন। মঙ্গোলিয়া, ইথিওপিয়া ও
সোমালিয়ায় পরীক্ষামূলক স্বাস্থ্যসেবা চালু আছে। মঙ্গোলিয়ায় ডব্লিউএইচও সমর্থিত মোবাইল ক্লিনিক দূর পাহাড়ে গিয়ে গর্ভকালীন পরীক্ষা ও আলট্রাসাউন্ড করে। ইথিওপিয়ার আফার ও সোমালি অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো স্বাস্থ্যদল টিকাদান, পুষ্টি আর গর্ভকালীন সেবা দেয়। আগুনের আলোয় নিজের নবজাতককে দোলাচ্ছেন ফাতিমা। তিনি শান্ত গলায় বলেন,‘আমরা বেঁচে থাকি ভাগ্যের ওপর। সবার এমন সৌভাগ্য হয় না।’
