ইরানে ব্যর্থ হবে ট্রাম্পের ‘ভেনিজুয়েলা কৌশল’
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভেনিজুয়েলায় হামলার পর থেকেই একাধিক দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের হুমকি বেড়েছে। একই চাপে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানও। দেশটিতে চলমান বিক্ষোভে সেই ভয় আরও তীব্র হচ্ছে। আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে-এবার কি ‘ভেনিজুয়েলা কৌশলে’ ইরানেও আগ্রাসন চালাবে যুক্তরাষ্ট্র? তবে বিশ্লেষকরা বলছেন-এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। কেন না, তেহরান কারাকাস নয়। সামরিক শক্তি, বহির্বিশ্বে মিত্রতা, পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আরও একাধিক কারণে ইরানের শক্তি ভেনিজুয়েলার চেয়ে অনেকটা বেশি। আল-জাজিরা।
শক্তিশালী সামরিক অবকাঠামো : ভেনিজুয়েলায় যেভাবে সামরিক অভিযান সম্ভব হয়েছিল, সেই বাস্তবতা দেখলেই বোঝা যায় ইরানে অনুরূপ হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কার্যত প্রশ্নের বাইরে। কারাকাসে অভিযান চালানোর আগে সিআইএ প্রায় ছয় মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থাটির কাছে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ একজন সোর্স ছিল, যিনি তাকে শনাক্ত করতে সহায়তা করেন। এই অভিযানের সাফল্যের বড় কারণ ছিল ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনীর বিশৃঙ্খলা এবং রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্রদের কাছ থেকে মাদুরোর কোনো সহায়তা না পাওয়া। অন্যদিকে ইরানের রয়েছে অঞ্চলের বৃহত্তম সামরিক বাহিনী। সক্রিয় ও রিজার্ভ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ সেনা। শুধু আইআরজিসিতেই অন্তত দেড় লাখ সদস্য রয়েছে। তাদের অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন যুদ্ধে অভিজ্ঞ। এর বাইরে রয়েছে বসিজ মিলিশিয়া, যাদের নিয়মিত ও রিজার্ভ সদস্য মিলিয়ে সংখ্যা কয়েক লাখ। এছাড়াও দেশটির রয়েছে আধুনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল, দীর্ঘপাল্লার ড্রোন, শক্তিশালী নৌবাহিনী এবং অভিজ্ঞ স্থলবাহিনী। বিপরীতে ভেনিজুয়েলার সামরিক সক্ষমতা ছিল সীমিত এবং আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক নিরাপত্তায় তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।
হরমুজ প্রণালীতে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ : বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল পরিবহণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে হয়। ইরান চাইলে এই প্রণালী আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অচল করে দিতে পারে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে। ভেনিজুয়েলার এমন কোনো ভূ-কৌশলগত সুবিধা ছিল না।
শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্ক : ইরানের সরাসরি ও পরোক্ষ মিত্র রয়েছে লেবানন, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে। হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন
সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরান-সমর্থিত বলে পরিচিত। ইরানে হামলা মানে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উদ্বেগ : ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রধারী না হলেও তার পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর গভীর উদ্বেগ রয়েছে। ফলে এদিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের সতর্ক অবস্থানে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক : ইরানের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলা এই দুই শক্তিধর দেশের সঙ্গে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে এমন শক্তিশালী বৈশ্বিক সমর্থন ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা : ইরানে যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ মার্কিন সেনাদের বড় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করবে।
মার্কিন জনমত ও রাজনৈতিক চাপ : মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী জনমত আরও শক্তিশালী হতে পারে, যা রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এক সময়ের খামেনি অনুগতরাই কেন এখন বিক্ষোভে : চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়ে উঠেছে ইরানে। প্রতিদিনই ছড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন শহরে। এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে মূলত ব্যবসায়ী ও দোকানিদের প্রতিবাদের মাধ্যমে। যারা একসময় খামেনিরই সমর্থক ছিলেন। গত দুই দশকে বাজারের অর্থনৈতিক অবস্থান ক্রমাগত দুর্বল হওয়ায় মূলত বিক্ষোভে নেমেছেন তারা। আল-জাজিরা।
ইরানের ঐতিহ্যবাহী বাজার ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি হিসাবে পরিচিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানের বাজারসহ বিভিন্ন শহরে তাদের প্রতিবাদ ও ধর্মঘট দেশটির রাজনৈতিক অর্থনীতিতে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে বাজারের ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তারা রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। এর বিনিময়ে তারা আমদানি লাইসেন্স, বৈদেশিক মুদ্রায় বিশেষ সুবিধা এবং বাণিজ্যিক নীতিনির্ধারণের সুবিধা পেত। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে এই শ্রেণি ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল। তবে গত দুই দশকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বিশেষ করে ২০০৫-২০১৩ মেয়াদে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সরকার ‘বেসরকারিকরণ’ নীতির আওতায় বহু রাষ্ট্রীয় সম্পদ ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং বড় ধর্মীয় ফাউন্ডেশনগুলোর হাতে তুলে দেয়। এতে এসব প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো, জ্বালানি, ব্যাংকিং ও আমদানি-বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করে। আর বাজারের ঐতিহ্যগত ভূমিকা সংকুচিত হতে থাকে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা ও মুদ্রাস্ফীতি ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা কঠিন করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে বাজারের ব্যবসায়ীদের বর্তমান প্রতিবাদকে বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিনের জমে থাকা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষের ফল হিসাবে দেখছেন। বিক্ষোভগুলো দেখাচ্ছে যে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে ঐতিহ্যবাহী সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও রাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।
