ভোটার তালিকায় সামান্য ভুল হলেই বিদেশি নয়
ভারতের সুপ্রিমকোর্টের ঐতিহাসিক রায়
Advertisement
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতে ভোটার তালিকায় বানানের ভুল, জন্ম তারিখের অসংগতি কিংবা সরকারি নথিতে সামান্য লেখার ত্রুটির মতো কারণে কাউকে বিদেশি ঘোষণা করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিমকোর্ট। আসামের ২৭ জনকে বিদেশি ঘোষণা করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছিলেন এবং পরে গৌহাটি হাইকোর্ট তা বহাল রেখেছিলেন-সোমবার সেই দুটি রায়ই সর্বোচ্চ আদালত বাতিল করে দেন। সেই সঙ্গে নতুন করে আইনসম্মত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মামলাগুলোর শুনানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ জানান, নাগরিকত্বের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেবল প্রক্রিয়াগত বা প্রযুক্তিগত ত্রুটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি করা যায় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছেন-নতুন শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। আদালতের এ রায়কে আইন বিশেষজ্ঞরা নাগরিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসাবে দেখছেন। তাদের মতে, ভোটার তালিকা, পরিচয়পত্র বা অন্য সরকারি নথিতে সামান্য অসঙ্গতি থাকলেই কাউকে বিদেশি হিসাবে চিহ্নিত করার প্রবণতার বিরুদ্ধে এ রায় একটি স্পষ্ট বার্তা। আসামে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি শনাক্তকরণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সীমান্ত পুলিশের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বহু মানুষকে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে নোটিশ দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পরে উচ্চ আদালত এবং সুপ্রিমকোর্টে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয় সাধারণ মানুষকে।
এ মামলায় সাবিত্রী দে, যতী দে, আজবাহার আলি, মোহাম্মদ আকবর আলি, আবেদা খাতুন, আনোয়ারা খাতুনসহ ২৭ জন আবেদনকারী প্রথমে গৌহাটি হাইকোর্ট এবং পরে সুপ্রিমকোর্টে আবেদন করেন। এর আগে গৌহাটি হাইকোর্ট বলেছিল, ট্রাইব্যুনালের সমন পাওয়ার পরও আবেদনকারীরা হাজির হননি এবং দীর্ঘ সময় পর মামলাটি চ্যালেঞ্জ করেছেন। পাশাপাশি আদালত উল্লেখ করেন, ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপরই বর্তায়।
তবে সুপ্রিমকোর্ট বলেছে, নাগরিকত্ব নির্ধারণ একটি গুরুতর সাংবিধানিক বিষয়। তাই ন্যায্য, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের যথাযথ সুযোগ না দিয়ে বিদেশি ঘোষণা করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রায় শুধু ২৭ জন আবেদনকারীর জন্য নয়, ভবিষ্যতে নাগরিকত্বসংক্রান্ত বহু মামলায় দিকনির্দেশনা হিসাবে কাজ করবে। বিশেষ করে সরকারি নথিতে সামান্য ভুল বা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে যেসব মানুষ আইনি জটিলতায় পড়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও এ রায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এনআরসি, সন্দেহভাজন ভোটার এবং ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে আসামে বহু বছর ধরে বিতর্ক রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় অনেক সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। যদিও সরকারের বক্তব্য, দেশের আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। সুপ্রিমকোর্টের সর্বশেষ এই রায়ে স্পষ্ট হয়েছে, নাগরিকত্বের মতো মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে যান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। প্রতিটি মামলার তথ্য ও প্রমাণ ন্যায্যভাবে যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
