দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন
বিক্ষোভ নাড়িয়ে দিয়েছে মোদির মসনদ
এই প্রথম ভারতীয়রা বুঝতে পারেন-ভয়ের বেড়াজাল ভেঙে দেওয়া সম্ভব
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের রাজধানী দিল্লির রাজপথে একের পর এক প্রতিবাদে চাপে পড়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ আন্দোলন’ এবার নতুন মাত্রা পেয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে এ আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশি ধরপাকড়, গ্রেফতার ও ইন্টারনেট বন্ধের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কিন্তু তাতেও রাজপথের প্রতিবাদ থামানো যায়নি।
সোমবার দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিখ্যাত সাংবাদিক মীনা কেন্দাস্বামীর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুলাইয়ে দিল্লির নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে জড়ো হন ককরোচ আন্দোলনের সমর্থকরা। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম দেশটির মানুষ বুঝতে পারেন, দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা ও ভয়ের বেড়াজাল ভেঙে দেওয়া সম্ভব। নরেন্দ্র মোদিকে অপ্রতিরোধ্য মনে করার যে ধারণা ছিল, তাতেও বড় ধাক্কা লাগে। ভারতের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এমন এক প্রতিবাদী সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত ছিল, যেখানে পরিবর্তন আসতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু ‘ককরোচ আন্দোলন’ দেখিয়েছে, বিপ্লবের গতি চাইলে বাড়ানো যায়। এবার আন্দোলনকারীদের দাবি, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জ্ঞানেশ কুমার ভূমিকা রেখেছেন। ককরোচ আন্দোলনের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছিল বিজেপি শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ায়। আন্দোলনকারীদের অবস্থান স্পষ্ট-জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ করলে মোদিকেও পদত্যাগ করতে হবে। কারণ, এতে স্বীকার করে নেওয়া হবে যে দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এ পর্যন্ত বিজেপির প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। রাষ্ট্রের দমনমূলক ব্যবস্থাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সাংবাদিকদের আটক ও গ্রেফতার করা হয়।
গত ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভে ককরোচ পার্টি বা সিজেপির নেতাদের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে বামপন্থি ও কংগ্রেস-ঘনিষ্ঠ ছাত্রসংগঠনগুলো রাজপথে ছিল। তাদের সঙ্গে ছিলেন সাহসী তরুণ কর্মী নেহা বোরাকে, আইশে ঘোষ ও গুরমেহর কৌর। নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিনিধিরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। পুলিশের কঠোর দমন-পীড়নের মুখে পড়েন এসব আন্দোলনকারী। পুলিশের কঠোর অবস্থানের পরও মানুষ রাজপথে লড়াই চালিয়ে যেতে চাইছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রতিটি স্ক্রিনশট, ভিডিও ও রিল এই প্রতিবাদকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। গান, স্লোগান, হঠাৎ নাচে মেতে ওঠা মানুষ, ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ড আর জনতার উচ্ছ্বাস-সব মিলিয়ে প্রতিবাদ যেন এক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
এই ধারণায় প্রচলিত ক্ষমতা ও সামাজিক কর্তৃত্বকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে উলটে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, রাষ্ট্রকে এখন পিছু হটতে দেখা যাচ্ছে। মানুষ ক্ষমতাকে আর ভয় পাওয়ার বিষয় হিসাবে দেখছে না। বরং ক্ষমতাকে উপহাস করার সাহস পাচ্ছে। আন্দোলনের জনপ্রিয় স্লোগানগুলোর একটি হলো, ‘যখনই মোদি ভয় পান, পুলিশকে সামনে ঠেলে দেন।’
সম্প্র্রতি তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন মোদি। তিনি এমন একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন, যেখানে হিন্দু ধর্মীয় ভজনকে রিমিক্স করে রেভ পার্টির মতো পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও তার পায়ের নিচের মাটি সরে যেতে পারে। বিজেপি নির্বাচনের পর নির্বাচন জিতেছে ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। কিন্তু তাতে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়নি। ভারতকে রক্ষা করতে হলে উগ্র হিন্দুত্ববাদের কঠোর প্রভাব থেকে হিন্দুদের বের করে আনা জরুরি। এই প্রতিবাদ এবং বৃহত্তর আন্দোলনের একটি অপ্রত্যাশিত ফল হতে পারে সেটিই। এই আন্দোলন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে কি-না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট-বিভাজনের রাজনীতি করা বিজেপির বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার শক্তি এই আন্দোলনের রয়েছে।
