দিল্লির জামিয়া যেন পুলিশ ক্যাম্প
১২ আক্টোবর থেকে অনশনে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার রয়েছে শতবর্ষেরও বেশি ইতিহাস। সেখানে ২৪ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এটি যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
শনিবার সাউথ ফার্স্ট অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে প্রবেশের প্রধান ফটকগুলোর কয়েকটি ঝালাই করে বন্ধ করে দিয়েছে; লোহার পাত ও দেওয়াল দিয়ে সেগুলোকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। মেট্রো স্টেশনের কাছে ও ক্যাম্পাসের বাইরে ১ হাজার থেকে ২ হাজার পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী ও আইটিবিপি সদস্য মোতায়েন রয়েছে। তারা শিক্ষার্থীদের নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছেন। আবার যারা ভেতরে আছেন, তাদেরও বাইরে আসতে দিচ্ছে না।
আশপাশের রাস্তাগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সম্পত্তি নষ্ট করা, শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা এবং একাডেমিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ এনে তাদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পুরো এলাকাটি এখন যেন একটি পুলিশ ক্যাম্পে পরিণত হয়েছে।
গত ১২ অক্টোবর থেকে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। শনিবার ছিল এ আন্দোলনের ১৯তম দিন। গত ১৭ অক্টোবর ভোরে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা কর্মী ও পুলিশ মিলে ওই এলাকার সব আলো নিভিয়ে ফেলে। তারা অনশনরত শিক্ষার্থীদের টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে আনে, মাটিতে ফেলে মারধর করে। নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করা হয়। কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়। ‘আলোচনার’ অজুহাতে চাপ সৃষ্টি করে ভোরবেলা দুই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে যে, শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
অন্য শিক্ষার্থীরা এ ঘটনাকে একটি কূটকৌশল হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে ও হয়রানি করে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। যদিও কয়েকজন অনশন থেকে সরে এসেছেন, তবে এবিন বাসিল, রেহান খানসহ আরও অনেকে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন করে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।
লাইব্রেরি, হোস্টেল, এমনকি শৌচাগারগুলোও এখন তালাবদ্ধ। শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ক্যান্টিন ও মেসগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের কাছে বাইরে থেকে খাবার বা পানি পৌঁছানোর চেষ্টা করলে, কিংবা অনশনরতদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার উদ্যোগ নিলে, তাতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নেমে আসা এ গভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে শিক্ষার্থীরা-বিশেষ করে ছাত্রীরা-গভীর রাতেও তাদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো কী?
বর্তমান অনশন ও আন্দোলনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৫ সালে। ২০০৬ সালের মার্চ মাসে নির্বাচিত সেই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নির্দেশ দেয় যে, তাদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা যেন কেবল বিভাগীয় বিষয়ভিত্তিক সমিতি (ডিপার্টমেন্টাল সাবজেক্ট অ্যাসোসিয়েশন) বা শ্রেণি প্রতিনিধিদের কাছে জানানো হয়। শিক্ষার্থীরা বারবার প্রশ্ন তুলেছেন, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় বা জেএনইউ-তে যেখানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন নির্বাচন নিষিদ্ধ থাকবে?
তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো-জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ছাত্র সংসদ পুনরায় চালু করা। অবিলম্বে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করা। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ছাত্র সংসদের জন্য নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা এবং তার ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে জারি করা সব সাময়িক বহিষ্কারাদেশ, চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ ও কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রত্যাহার করা। পাশাপাশি, তারা হোস্টেলে সুপেয় পানির সরবরাহ ও শৌচাগার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং লাইব্রেরি, ফি, ভর্তি প্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধানের দাবিও জানিয়েছেন।
