‘এলডিসি উত্তরণ’ পেছানো কি সম্ভব
Advertisement
আবুল কাসেম হায়দার
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, এ মুহূর্তে এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে রপ্তানি খাতসহ নানা খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যবসায়ীদের এ দাবির পর এলডিসি উত্তরণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত আট বছরের নানা প্রক্রিয়া ও একাধিক মূল্যায়ন শেষে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বের হবে বাংলাদেশ-এমন সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের। সেই হিসাবে এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের সামনে সময় আছে ১৫ মাসের কিছুটা বেশি। এ সময়ে এসে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে।
সময় পেছাতে কী করতে হবে
বাংলাদেশ ২০১৮ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। সাধারণত ৬ বছরে এ প্রক্রিয়া শেষ হয়। কিন্তু কোভিডের কারণে বাংলাদেশসহ অন্য দেশকে আরও দুই বছর সময় দেওয়া হয়। গত ১৩ মার্চ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে সিদ্ধান্ত হয়, ২০২৬ সালে নির্ধারিত সময়েই বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটবে। এ নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। এখন এলডিসি উত্তরণ পেছাতে হলে উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত বদলাতে হবে।
জানা গেছে, এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদনের দুটি প্রক্রিয়া আছে। প্রথম প্রক্রিয়াটি হলো, সরকারপ্রধানকে সরাসরি ইকোসকের সিডিপির প্রধানের কাছে চিঠি লিখতে হবে। চিঠিতে যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে যে, নির্দিষ্ট এক বা একাধিক নতুন ও অপ্রত্যাশিত কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এখন উত্তরণ পেছানো ছাড়া আর বিকল্প নেই। বাংলাদেশের আবেদন পেলে সিডিপি এটি মূল্যায়ন করবে এবং এ মূল্যায়নের ওপর পেছানোর বিষয়টি নির্ভর করবে। দ্বিতীয় উপায়টি হলো, বাংলাদেশ সরাসরি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আবেদন করতে পারে। তখন সাধারণ পরিষদই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভূমিকা রাখতে পারে এমন শক্তিশালী দেশের সহায়তা লাগবে এবং যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে।
গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। এরপর অর্থনীতিতে কিছু সংস্কার হয়েছে। গত এক বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বেড়েছে। ব্যাংক খাতেও কিছু সংস্কার হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে ওই খাতে। মূল্যস্ফীতি কমেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের তরফ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে। তাহলে এলডিসি উত্তরণের সময় পেছাতে গেলে বাংলাদেশ কী কারণ দেখাবে, সেটাও এখন প্রশ্ন। তবে দক্ষ শ্রমশক্তি, অর্থনীতি ও সামাজিক খাতে সংস্কার, রাজস্ব খাত, বিনিয়োগ পরিবেশসহ নানা খাতে দুর্বলতা আছে।
কোন দেশ কী কারণে পিছিয়েছে
এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানোর আবেদন করে সফল হয়েছে সলোমন দ্বীপপুঞ্জ। ২০২৩ সালে দেশটির সরকার গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ দেখিয়ে বাড়তি সময় চেয়ে আবেদন করে। সিডিপি তিন বছর সময় বাড়িয়ে দেয়। কয়েক বছর আগে অ্যাঙ্গোলা এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদন করে। সব প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়ায় দেশটি সরাসরি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আবেদন করে। দেশটি কারণ দেখায়, তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় তাদের অর্থনীতি ও সামাজিক খাতের সব সূচক পড়ে গেছে। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে পর্তুগালের সহায়তায় তারা বাড়তি সময় পায়। অন্যদিকে মিয়ানমার নিজে চেয়েছিল এলডিসি থেকে বের হতে। কিন্তু সিডিপি বা জাতিসংঘ সেই সুযোগ দেয়নি। কারণ, চার বছর আগে যখন দেশটি নিয়ে পর্যালোচনা হচ্ছিল, তার দুই সপ্তাহ আগে মিয়ানমারে সামরিক ক্যু হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতায় পড়ে দেশটি। তাই ২০২৭ সাল পর্যন্ত দেশটির এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেয় সিডিপি। এ ছাড়া সুনামির কারণে মালদ্বীপ এবং ভূমিকম্পের কারণে নেপালের এলডিসি উত্তরণ নির্ধারিত সময়ে হয়নি।
ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন কেন
পোশাক, ওষুধসহ রপ্তানির বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা এলডিসি উত্তরণ ৩ থেকে ৬ বছর পেছানোর দাবি করছেন। আইসিসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমান এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় বাড়ানোর জন্য পাঁচটি কারণ বা যুক্তি তুলে ধরেন। সেগুলো হচ্ছে-১. ভালো বাণিজ্য দরকষাকষি করা, ২. তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনা, ৩. শিল্প খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, ৪. বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ৫. প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো ও জলবায়ু সহনশীলতা টেকসই করা। তার মতে, এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক বাড়বে ১২ শতাংশ। আর জিএসপিসহ অন্যান্য বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে রপ্তানি কমবে ৬ থেকে ১৪ শতাংশ।
যেভাবে উত্তরণ হয়
এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে সিডিপি। এজন্য প্রতি তিন বছর পরপর এলডিসিগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা-এ তিন সূচক দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কিনা, সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। যে কোনো দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট সীমার দ্বিগুণ হতে হয়। এ মানদণ্ড সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মানদণ্ডের তিনটিতেই উত্তীর্ণ হয়। ২০২১ সালেই বাংলাদেশ চূড়ান্ত সুপারিশ পায় যে, ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ। কিন্তু করোনার কারণে প্রস্তুতির জন্য দুই বছর সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকায় যুক্ত হয় বাংলাদেশ। এলডিসিভুক্ত দেশ হওয়ার কারণে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য-সুবিধাসহ নানা সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ।
এখন করণীয়
১. এফবিসিসিআইয়ের কোনো নির্বাচিত বোর্ড না থাকায় সেই দায়িত্ব সম্মিলিতভাবে সব ব্যবসায়ী সংগঠন ও যোগ্য ব্যক্তিদের পালন করা উচিত। এফবিসিসিআই নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর নানা ব্যক্তি মামলা করে নির্বাচনকে পিছিয়ে দিয়েছে। তা দেশের ব্যবসায়ীদের বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীদের পক্ষে কথা বলার কোনো সুসংগঠিত, নির্বাচিত শক্তি না থাকার কারণে সরকারও খেই হারিয়ে ফেলেছে।
২. বর্তমানে বিজিএমইএ, বিকেএমইও, এনটিএমএ, ঢাকা চেম্বারসহ সব ব্যবসায়ী সংগঠনকে এলডিসি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে বোঝাতে হবে, দেশের স্বার্থে এলডিসি উত্তরণ দেরি করা দরকার। কমপক্ষে পাঁচ বছর পেছানোর চেষ্টা করা দরকার।
৩. বিগত স্বৈরাচারী সরকার ভুল পরিসংখ্যান দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের দরবারে ভুলভাবে তুলে ধরেছে। তাই এলডিসি উত্তরণের সময় দ্রুত এগিয়ে এসেছে। বাস্তবে দেশে প্রস্তুতি অনেক বাকি।
৪. বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে তার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে হবে। যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে এলডিসি পেছানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বিগত স্বৈরাচারের অনাচারে দেশের প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে; তা সরকারকে বিশ্বের দরবারে জোরেশোরে তুলে ধরতে হবে।
৫. বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে এলডিসি উত্তরণ সময় পিছিয়ে নেওয়ার একটা বড় সুযোগ রয়েছে।
৬. সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় যোগাযোগ করে এলডিসি বিষয়ে অবহিত করে এ দাবির প্রতি সমর্থন আদায় করতে হবে। রাজনৈতিক দলই বর্তমানে এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বেশ ভালো ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে রাজনৈতিক দলগুলো একমাত্র যোগ্য পরামর্শ প্রদানের শক্তি। আসুন আমরা এগিয়ে আসি।
আবুল কাসেম হায়দার : প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, সাবেক সহ-সভাপতি, এফবিসিসিআই
