Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

কৃতজ্ঞতার সীমারেখা

Advertisement

Icon

জিয়া আহমদ

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কৃতজ্ঞতার সীমারেখা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। ফাইল ছবি

Advertisement

গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন ও পালিয়ে যাওয়ার পরের তিন দিন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সে সময়ে দেশে কোনো সরকার ছিল না এবং দেশের জনগণ প্রতিবেশী দেশের একটি প্রতিঘাতের আশঙ্কা করছিল; কারণ ৫ আগস্ট তাদের তিল তিল করে গড়ে তোলা সুখ স্বপ্নের অকস্মাৎ পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এ গণ-অভ্যুত্থানের অভিঘাতে। সে সময় সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ অপেক্ষা করছিল একজন মানুষের, যার নাম ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি তখন প্যারিস অলিম্পিকের একজন উদ্যোক্তা হিসাবে সেখানে অবস্থান করছিলেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ৮ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে ঢাকায় এসে পৌঁছান এবং সেদিন রাতেই শপথ নেন ও সরকার গঠন করেন। তিনি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের সরকারপ্রধান হওয়ার মতো মানুষ কি আর ছিল না? ছিল; বস্তুত সে সময়ে বেশ কয়েকজন মানুষের নামই আলোচনায় ছিল। এদের মধ্যে বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনরত ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের নাম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ঘোষিত হলো, তখন দেশের মানুষ উপলব্ধি করল, যে দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত সম্মানিত ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ পদের জন্য ‘বেস্ট চয়েস’। দেশের মানুষের কাছে আগে থেকেই জনপ্রিয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন তার ওপর স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের নির্যাতন ও নিপীড়নের কারণে। দেশের মজলুম জনগণ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তাদেরই একজন মনে করত এ কারণে। ফলে তার এ মনোনয়নকে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাগত জানাল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই।

আজন্ম রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েই রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে পড়ে গেলেন। তার সরকার পরিচালনার জন্য মন্ত্রী-পদমর্যাদার উপদেষ্টা নিয়োগ করতে গিয়ে বেশকিছু ভুল করে ফেললেন। তার প্রথম ভুলটি ছিল অধিকাংশ উপদেষ্টাকে এনজিও সেক্টর থেকে বেছে নেওয়া। আর দ্বিতীয় ও বড় ভুলটা হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব কৃতিত্বের দাবিদার ছাত্র-যুবকদের মধ্য থেকে দুজনকে উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ দেওয়া। প্রথম ভুলটির বিষয়ে তার ব্যাখ্যা ছিল এরকম যে তিনি ভিন্ন সেক্টরে কাজ করার কারণে রাজনীতি ও প্রশাসনিকভাবে দক্ষ সবাইকে চেনেন না। যাদের চেনেন এবং যারা তার ভাষায় ‘হাতের কাছে’ ছিল, তাদের মধ্য থেকেই তিনি তার টিম বেছে নিয়েছেন। গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে উপদেষ্টা চয়নের বিষয়ে তিনি সেভাবে কিছু না বললেও তিনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বলেন যে, ছাত্ররাই তার নিয়োগকর্তা। ফলে এটি পরিষ্কার হয় যে তিনি গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের কী দৃষ্টিতে দেখেন। ফলে তাদের মধ্য থেকে উপদেষ্টা নিয়োগের ‘আবদার’ তিনি ফেলতে পারেননি। সেকারণে প্রথমে দুজন এবং পরে আরও একজনকে তিনি তার উপদেষ্টা পরিষদে ‘উপদেষ্টা’ হিসাবে গ্রহণ করেন।

আমাদের এ ভূমিতে এর আগেও আরও দুটি গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। সে দুটির ক্ষেত্রেও এবারের মতো দেশের ছাত্রসমাজই নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিল। কিন্তু এবারের সঙ্গে সেগুলোর পার্থক্যটা হলো সেসময়ের ছাত্র নেতৃত্ব দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী হওয়ার কারণে বড় দলগুলো তাদের সাংগঠনিক ‘চেইন অব কমান্ডের’ মাধ্যমে অভ্যুত্থানের পর তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিল। এবারের ছাত্র নেতৃত্ব বড় কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কিত না থাকার কারণে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলের শেষভাগে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ নামে যে সংগ্রামী সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করেছিল, গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই তা চরিত্র হারিয়ে ফেলে। এ সংগঠনের নাম বিক্রি করে অসংখ্য চাঁদাবাজি, দখল ও নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যের ঘটনা ঘটে। এদের বেপরোয়া আচরণের মূল হিসাবে তাদের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তো বটেই, অন্য উপদেষ্টাদেরও স্নেহ ও দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ১০-১২ মাস এ ছাত্র-যুবকরা বাধাহীনভাবেই তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে। কিন্তু ইতোমধ্যে দেশের মানুষের মনে নির্বাচনের জন্য প্রত্যাশাটা ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকায় সরকার নির্বাচনের দিকে নজর দিতে বাধ্য হয়। এ বিষয়টি সামনে আসে যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে এক একান্ত বৈঠকের পর ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে আগামী জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করেন।

ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ নির্বাচনের ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন অজুহাতে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা শুরু হয়, যা এখনো চলমান রয়েছে। কিন্তু ইতোমধ্যে দেশের মাঠে রাজনৈতিক পরিবেশের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির হ্রাস টানার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, অর্থনীতির স্থবিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ার কারণে দেশের সাধারণ মানুষ তো বটেই, দেশের সিভিল সোসাইটির সদস্যরাও দ্রুত একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচিত নতুন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ‘সেফ এক্সিট’ নেওয়ার জন্য ড. ইউনূসকে পরামর্শ দেওয়া শুরু করেন। প্রধান উপদেষ্টা এর মাঝে তার আস্থাভাজন মানুষদের কাছে জানিয়ে দেন যে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে নির্বাচন না হলে তিনি মার্চ মাস থেকে ক্ষমতায় থাকবেন না। সেকারণে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, সে বার্তা পৌঁছে যায় দেশের মাঠ পর্যায়েও। এতে দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এলেও নির্বাচনের ভয়ে যারা ভীত, তারা অস্থির হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের উপদেষ্টাদের ৭১-টেলিভিশনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বেশকিছু বিষয়ে মন্তব্য করেন, যা ইতোমধ্যেই যথেষ্ট আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি তার সাক্ষাৎকারে বলেন, গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি/তারা কতিপয় রাজনৈতিক দল ও উপদেষ্টাদের যে বিশ্বাস করেছিলেন তা ভুল হয়েছিল। উপদেষ্টারা তার বা তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তিনি আরও বলেন যে, বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা তাদের আখের গুছিয়েছেন এবং তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে তাদের ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ফেলেছেন। অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। যদি এটি ব্যক্তিগত বিষয়ে বিশ্বাসভঙ্গ বা প্রতারণা হয়ে থাকে, তাহলে বলার কিছু নেই। কিন্তু যদি বিষয়টি এ দেশ ও এর রাজনীতি সম্পর্কিত হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি নাহিদ ইসলামের অনতিবিলম্বে প্রকাশ করা উচিত। কারণ দেশবিরোধী যে কোনো চক্রান্ত গোপন রাখাও ওই অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার মতোই গুরুতর অপরাধ। যদি এ অপরাধ তিনি তার নিজের বা দলীয় স্বার্থে গোপন রাখেন, তাহলে তিনি ওই অভিযুক্ত উপদেষ্টার মতোই একই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন। এনসিপির একজন নেত্রীও একই ধরনের কথা বলেছেন। সামান্তা শারমিন আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘প্রত্যেক উপদেষ্টা’ তাদের আখের গুছিয়ে রেখেছেন। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা যে বর্তমান সরকার এখন এ সাবেক সমন্বয়কদের আর পাত্তা দিচ্ছে না এবং তাদের নিত্য-নতুন আবদারও রাখছেন না। এনসিপির অযৌক্তিক দাবি অনুযায়ী তারা ‘শাপলা ফুলকে’ তাদের প্রতীক হিসাবে পায়নি, তাদের কথা অনুযায়ী নির্বাচনকে এখন আর ঝুলিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ফলে তারা এখন নানা অবান্তর অভিযোগ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।

যে যাই বলুক না কেন, এ অন্তর্বর্তী সরকারের মূলভিত্তি হলেন ড. ইউনূস। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো মনে করে যে এ ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সময়ে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনিই সঠিক মানুষ আর সেকারণেই দেশের জনগণ এখনো তার পেছনে রয়েছে। তাছাড়া এ সরকারের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির যে অভিযোগগুলো উঠেছে, যার সিংহভাগের পেছনে সরকারের যে দু’চারজন উপদেষ্টা ও তাদের ব্যক্তিগত কর্মচারীদের নাম আছে। ফলে এ সরকারের বিরুদ্ধে এনসিপির অভিযোগগুলো যে অক্ষমের আর্তনাদের বেশি কিছু না, তা এখন সবার কাছেই পরিষ্কার। তারা নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তরকালে তাদের অবস্থানের বিষয়ে আতঙ্কিত হতেই পারেন; কিন্তু সে শঙ্কা তো এ ধরনের অভিযোগের মাধ্যমে দূর হবে না, বরং এ ধরনের অভিযোগ তাদের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। নির্বাচনের পর তাদের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করার পথ তাদেরকেই বের করতে হবে। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার বা ড. ইউনূসের পক্ষে কিছু করা তার কৃতজ্ঞতাবোধের সীমার চেয়েও বেশি।

জিয়া আহমদ, এনডিসি : সাবেক সরকারি কর্মচারী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের

প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

হালফিল বয়ান পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম