শিশুদের টাইফয়েডের টিকা নিয়ে উদ্বেগের কারণ
ড. রেজাউল করিম, ড. জুবায়ের রহমান, ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে বর্তমানে রোল আউট করা টাইফয়েড টিকার গুণগত মান, কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার ওপর একটি নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন অত্যাবশ্যক। এ বিশেষজ্ঞ মতামত উপস্থাপনের আগে আমাদের টিমের ব্যাকগ্রাউন্ড বা অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, টিকা বায়োমেডিকেল সায়েন্সের অন্যতম বড় সফলতা, যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাই সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে টিকা নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে মানুষ টিকা গ্রহণ করতে ভয় পাবে এবং নিরুৎসাহিত হবে।
আমরা ব্যক্তিগতভাবে টিকা গ্রহণ করি, আমাদের সন্তানদের টিকা দিই এবং অন্যদেরও টিকা নিতে উৎসাহিত করি। আমাদের এ উদ্যোগ টিকাবিরোধী কোনো অবস্থান থেকে নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং বৈজ্ঞানিক স্বচ্ছতার নীতি থেকে উৎসারিত। আমরা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করি এবং টিকা কীভাবে কাজ করে এবং টিকার কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মত দিতে সক্ষম। এ ছাড়া আমরা নতুন টিকা উদ্ভাবন, নতুন টিকার মান, কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা মূল্যায়ন, নতুন টিকার অনুমোদন-এসব বিষয়েও কাজে নিয়োজিত।
বর্তমানে দেশে টাইফয়েডজনিত কোনো মহামারি বা কোভিড ১৯-এর মতো জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৫ কোটি শিশু-কিশোরকে টার্গেট করে টাইফয়েডের টিকা প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাধারণ সময়ের এ বিশাল পরিসরের টিকাদান কর্মসূচির আগে টিকার গুণগত মান, দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে পর্যাপ্ত জনগুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের অনুপস্থিতি আমাদের কাছে গভীরভাবে উদ্বেগজনক মনে হয়েছে। এ উদ্বেগ থেকেই আমরা একটি দায়িত্বশীল বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য সচেতনতা তৈরি করছি।
যদিও বাংলাদেশে রোল আউট করা টাইফয়েডের (TYPHIBEV ভারতের Biological E Limited কোম্পানি উৎপাদিত) টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক প্রিকোয়ালিফায়েড, কিন্তু WHO এই তালিকায় আরও কয়েকটি টাইফয়েডের টিকা প্রিকোয়ালিফায়েড নিবন্ধন করেছে। টিকাগুলোর গুণগত মান, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করলে খুব সহজেই প্রতীয়মান হয়, WHO প্রিকোয়ালিফায়েড টাইফয়েড ভ্যাকসিনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে যে ভ্যাকসিনটি দেওয়া হচ্ছে তার কার্যকরিতা ও লং-টার্ম সেইফটি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। যেমন: ভারত বায়োটেকের (Typbar TCV) কার্যকারিতা ৭৯-৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে WHO নিজেই বলেছে, Biological E ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার ক্লিনিক্যাল ডেটা নেই। প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি (যেমন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত তথ্য এবং Biological E Limited-এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ডেটা) বিশ্লেষণ বাংলাদেশে ব্যবহৃত TYPHIBEV টিকার ব্যবহার নিয়ে নিম্নলিখিত গুরুতর উদ্বেগের বিষয়গুলো সামনে আসছে-
১. ক্লিনিক্যাল কার্যকারিতা (Efficacy) ডেটার ঘাটতি : বর্তমানে স্কুলগামী শিশু-কিশোরদের যে TYPHIBEV টিকাটি দেওয়া হচ্ছে, সেটির শর্ট-টার্ম ও লং-টার্ম ক্লিনিক্যাল কার্যকারিতার কোনো সরাসরি ও প্রকাশিত ডেটা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ডেটার অনুপস্থিতি বৃহৎ পরিসরে টিকার রোলআউটকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ক্লিনিক্যাল কার্যকারিতা বলতে বোঝায়-টিকা গ্রহণকারী একজন ব্যক্তি টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে এ টিকা তাকে বাস্তবে কতটুকু সুরক্ষা দিতে সক্ষম হবে এবং সে সুরক্ষা কতদিন বজায় থাকবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য (১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, TYPHIBEV-এর জন্য ক্লিনিক্যাল কার্যকারিতা সংক্রান্ত কোনো সরাসরি ডেটা খুঁজে পাওয়া যায়নি। টিকার ব্যাপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ তথ্যটিও গুরুত্বপূর্ণ।
২. অপর্যাপ্ত ফলোআপ সময়কাল : Biological E Limited-এর ফেজ II/III ট্রায়াল ডেটা অনুযায়ী, এ টিকার reaction (Immunogenicity) এবং নিরাপত্তা (Safety) মাত্র ৪২ দিন ধরে ফলোআপ করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদনপ্রাপ্ত অন্যান্য টাইফয়েড টিকার (যেমন Vivotif বা TYPHIM Vi) কার্যকারিতা যথাক্রমে ৪৮ মাস (১,৪৪০ দিন) অথবা ৩৪ মাস (১,২২০ দিন) পর্যন্ত ফলোআপ করা হয়েছে। একটি ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাকসিনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতা নির্ণয়ের জন্য মাত্র ৪২ দিনের ফলোআপ পর্যাপ্ত হিসাবে গণ্য করা হয়। তাই প্রশ্ন, বাংলাদেশে কেন এরকম টিকা শিশুদের জন্য অনুমোদন করা হলো, যার শর্ট-টার্ম ও লং-টার্ম কার্যকারিতার তথ্য নেই এবং লং-টার্ম সেইফটিরও তথ্য নেই। টাইফয়েডের টিকা যদি দিতেই হয়, তবে যেসব টিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছে (যেমন আমেরিকা বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অনুমোদনপ্রাপ্ত) বা যেসব টিকার প্রয়োজনীয় কোয়ালিটি, এফিকেসি এবং সেইফটি ডেটা আছে, সেসব টিকা সংগ্রহ না করে ভারতীয় কোম্পানির এ টিকা (TYPHIBEV) কী কারণে বেছে নেওয়া হলো?
বাংলাদেশে উন্নত দেশের মতো শক্তিশালী ফার্মাকোভিজিলেন্স বা টিকা প্রত্যাহারের (Recall) ব্যবস্থা এখনো সুসংগঠিত নয়। এ প্রেক্ষাপটে স্বল্পমেয়াদি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ভিত্তিতে দ্রুত অনুমোদনপ্রাপ্ত যে কোনো ভ্যাকসিনের ব্যাপক ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য। পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে এ ধরনের ভ্যাকসিন জনসাধারণের মধ্যে, বিশেষত গণটিকা কর্মসূচিতে, অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি উদ্বেগজনক।
জনপরিসরে এমন আলোচনা রয়েছে যে, টাইফয়েডের এ টিকাটি (TYPHIBEV) সম্ভবত নিকট ভবিষ্যতে শিশুদের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (Expanded Programme, on Immunisation-EPI) অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। যদি এটি সত্য হয়, তবে এটি শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে চরম অনৈতিকতা ও দায়িত্বহীনতার নজির স্থাপন করবে, বিশেষত যদি টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে।
কিছু মহল থেকে যুক্তি উত্থাপন করা হয়, বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় উচ্চমানের (যেমন ইউরোপ-আমেরিকায় অনুমোদিত) টিকা কেনার আর্থিক সক্ষমতা নেই। তাই টিকার গুণগত মান, কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ছাড় দিয়ে হলেও সে টিকা গ্রহণ করা উচিত। এ ধরনের টিকার প্রতিটি ডোজ উন্নয়নশীল দেশের জন্য সাধারণত ১ থেকে ১.৫ ডলার খরচ হয়। সেই হিসাবে টাইফয়েডের মতো ৫ কোটি টিকার ডোজ সংগ্রহে আনুমানিক খরচ হতে পারে ৫০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ডলার।
দরিদ্রতা বা অর্থনৈতিক দুর্বলতার অজুহাত দিয়ে টিকার গুণগত মানের সঙ্গে আপস করার এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণ করে, আমরা ভালো মানের টিকা সরবরাহের সামর্থ্য রাখি। সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত এক শ্বেতপত্র অনুযায়ী, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে (২০০৯-২০২৪) ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে, যা বাংলাদেশের কয়েক বছরের জাতীয় বাজেটের সমান। শিশুদের সুরক্ষার জন্য ভালো মানের টিকা সরবরাহ করার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে এবং এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
পাবলিকলি ডকুমেন্টেড সায়েন্টিফিক তথ্য বিশ্লেষণ করে আমাদের টিমের মতে, শর্ট-টার্ম ও লং-টার্ম ক্লিনিক্যাল কার্যকারিতা এবং লং-টার্ম ক্লিনিক্যাল সেইফটির পর্যাপ্ত ডেটা ছাড়া ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বাইরে Biological E limited কোম্পানির টাইফয়েড টিকা (TYPHIBEV) গণহারে প্রয়োগ করা অগ্রহণযোগ্য এবং জনস্বাস্থ্যের নৈতিকতার পরিপন্থি।
লেখকরা গবেষক ও টিকা বিশেষজ্ঞ
