শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা : জরুরি সমাধান কাম্য
Advertisement
আবদুল লতিফ মাসুম
প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’, তাই যদি সত্যি হয়, তাহলে বাংলাদেশ নামের জাতিরাষ্ট্রের শিক্ষা নামক মেরুদণ্ড বলা যায় বাঁকা হয়ে গেছে। একটি স্বাধীন জাতি হিসাবে যখন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটল তখন সময় ছিল, সুযোগ ছিল, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তোলার। কিন্তু এ জাতির দুর্ভাগ্য যে, আওয়ামী শাসক এলিটরা শিক্ষাব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। বরং ১৯৭২ সাল-পরবর্তী সময়গুলোতে নকলের ক্ষেত্রে ‘বিশ্ব রেকর্ড’ করার মতো অবস্থা বাংলাদেশের হয়েছিল। শিক্ষাবিদ মুজাফফর আহমদ চৌধুরী শীর্ষ ব্যক্তিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগের মতো ছাত্ররাও এক বছরের ত্যাগ স্বীকার করুক। কিন্তু তা না করে সর্বত্র অটো প্রমোশনের ব্যবস্থা করা হয়। সেই যে শিক্ষাব্যবস্থায় ধস শুরু হয়েছে, সেটি যথার্থভাবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উপনীত হয়নি। সেই একই গোষ্ঠী যখন ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশকে গ্রাস করে, তখন সেই আগেকার দৃশ্যগুলোই ফিরে আসে। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয় শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্টকারী রাজনীতি। প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শুধু বন্দনার কাজে শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়।
২০২৪ সালে অভাবনীয় গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে একটি গণ-অভ্যুত্থান হয়। যেহেতু শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে পরিবর্তনটি হয়, আশা করা গিয়েছিল, শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বিশেষ মনোযোগ দেবে অন্তর্বর্তী সরকার। এখন ষোলো মাস পেরিয়ে শিক্ষক হিসাবে আমার বক্তব্য এরকম যে, এ সরকার যাদের ওপর ভর করে ক্ষমতাসীন হয়েছে, তাদের প্রতি অবিচার করেছে সবচেয়ে বেশি। স্পষ্ট উদাহরণ হচ্ছে এই যে ১১টি কমিশন গঠিত হয়েছে, কিন্তু শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়নি। না হওয়ার কারণ হিসাবে যা শোনা যায় বা বোঝা যায় সেটি আরও বিব্রতকর। শিক্ষা কমিশন হলে নাকি আদর্শিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্রতর হবে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের মতো বিদ্বজ্জন বিদ্যার ব্যাপারটি উপেক্ষিত রাখলেন, এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর হয় না। অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ ও মধ্যমেয়াদি চরিত্রের কারণে শিক্ষাব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবাধ সুযোগ তাদের ছিল। কাদেরকে খুশি করার জন্য সরকার এ ব্যবস্থাটি সম্পর্কে নিষ্ক্রিয় থেকেছে তার উত্তর নেই।
শিক্ষার পরিচালকদের অবস্থান জানা যাক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়টি পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন। আওয়ামী আমলে যেমন তারা নির্বিঘ্নে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারেননি, এসময়কালে তারা কি উপদ্রববিহীন ছিলেন? অভিযোগ রয়েছে, সরকারের ফুট ফরমাস আর রাজনৈতিক নেতাদের তাঁবেদারি এসময়ও তাদেরকে করতে হয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে এ কারণে যে, সেখানে অন্তর্বর্তী সরকার যে অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি করার আদেশ জারি করেছিলেন, তার ফাঁকে রাজনৈতিক দলগুলোর নব্বই ভাগ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল যে, আওয়ামী দুঃশাসনের জাঁতাকলে যেসব শিক্ষক নিষ্পিষ্ট হয়েছেন, তাদের জন্য পরিত্রাণের উপায় বের করা। কিন্তু তা করতে গিয়ে ‘অবিকল নকল’ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভু বদল হয়েছে মাত্র, কিন্তু দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বে বেহাল হয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষার পরিবেশ। অন্তর্বর্তী সরকার যখন প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব লক্ষ্য করল, তখন আরেকটি আদেশ দিয়ে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে চাইল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবে নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনার আদেশটি বাতিল করতে বাধ্য হয় সরকার। তাছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব পাকাপোক্ত করার জন্য উচ্চ আদালতের শরণাপন্নও হয় সংশ্লিষ্টরা।
কলেজ পর্যায়ে ছাত্ররা সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। যেভাবে আওয়ামী সোনার ছেলেরা অধ্যক্ষকে অপমান অপদস্ত করেছে, কান ধরে উঠবস করিয়েছে এবং গায়ে হাত তোলার মতো জঘন্য কাজ করেছে, এবারও অবিকল নকল আচরণ লক্ষ্য করা গেছে এসব প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে মাঝে মধ্যেই এসব ঘটনা থেকে বিরত থাকার জন্য ছাত্রদের অনুরোধ করা হয়েছে। কে শোনে কার কথা!
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দাবির মুখে তাদের বাকি পরীক্ষাগুলো গ্রহণ না করেই অটোপাশ দিয়ে দিল। এ নিয়ে তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ হাসফাস করেছিলেন। কার্যত কঠোর হতে পারেননি। দরদভরা শিক্ষক তথা প্রশাসনের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এ সুযোগে ছাত্ররা প্রাতিষ্ঠানিক মারামারি করেছে। আমরা আমাদের সময়কালে প্রীতি ফুটবল প্রতিযোগিতা অথবা বিতর্কের মতো বিষয় নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থাৎ কলেজে কলেজে প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করেছি। এবারে ‘ক’ কলেজ বনাম ‘খ’ কলেজ মারামারির প্রতিযোগিতায় অসংখ্যবার অবতীর্ণ হতে দেখেছি কলেজ ছাত্রদের। এক্ষেত্রে সদরঘাট এবং নিউমার্কেটের এলাকাকে উর্বর মনে হয়েছে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে পুলিশ এগিয়ে গেছে, কিন্তু বিদ্যায়তনিক ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের মাথায় আসেনি এর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সূত্র বের করে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যেমন গৌরবের শীর্ষদেশে পৌঁছেছে, অবশেষে কার্য-কারণসূত্রে সেই গৌরব ও চেতনা বহমান থাকেনি। ছাত্ররা রাজনৈতিক দলগুলোর অংশীদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও মানুষকে নিয়ে চিন্তা করেছে, সেবা ও কল্যাণের মনোভাব নিয়ে অথবা হাদির মতো বিপ্লবী-বিদ্রোহীর আদর্শ নিয়ে কাজ করেছে। ক্ষতি যা হয়েছে তা পড়াশোনার। এ অভ্যুত্থানের আগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই সুনাম ছিল যে এরা মুরগির ছানা, হাঁকডাক করে না। এ গৌরবময় বিপ্লবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও আত্মত্যাগ গোটা জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষিতভাবে রাজনীতিমুক্ত ছিল। কর্তৃপক্ষ বিপ্লব-পরবর্তী দাবি ও চেতনার কারণে এ বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে। সে কারণে সব রাজনৈতিক দল সেসব প্রতিষ্ঠানে স্ব-স্ব রাজনৈতিক অবস্থানের জানান দিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে এসব ঘটনাবলি আমার নজরে এসেছে।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতিকরণ আরও স্পষ্ট ও শক্তভাবে ঘটেছে। ছাত্র রাজনীতির বিপদ-আপদ সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে অনেক লিখেছি। একজন শিক্ষক হিসাবে আমিও মনে করি, ছাত্রদের রাজনীতির অনুশীলন, চর্চা ও জ্ঞান অর্জন অব্যাহত থাকবে। কিন্তু তা কোনোক্রমেই রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে হবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ ছিল এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের। রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রদের তাদের বশংবদ করতে চাইবে-এটাই স্বাভাবিক। এ ধরনের দাবির মুখে রাজনীতিবিদদের বলতে শুনিনি যে তারা লেজুড়বৃত্তির অবসান চায়। বরং একজন বড় নেতা তো লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির পক্ষেই সাফাই গেয়েছিলেন। রাজনীতিবিদরা ইনিয়ে বিনিয়ে ছাত্রদের রাজনৈতিক সচেতনতার দোহাই দিয়ে তাদেরকে কাজে লাগানোর জুতসই যুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু এটি অপ্রিয় সত্য যে, আগামীর বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির সেই নিকৃষ্ট প্রবণতাগুলো ফিরে আসার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় নেই। ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের প্রাথমিক দায়িত্বের মধ্যে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রধান ও প্রাথমিক দায়িত্ব বলে বিবেচিত হবে। ছাত্রদের মাঝে রাজনীতি প্রবণতা নয়, বরং দেশপ্রেম সঞ্জাত কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। তাদেরকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক কার্যক্রম তথা খেলাধুলার মতো শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে জ্ঞান ও দেশপ্রেমের অভিন্ন শিক্ষায় দীক্ষিত করে তুলতে হবে। অবশেষে কবি নজরুলের ভাষায় বলি, এদের ‘চক্ষে জ্বলুক জ্ঞানের মশাল, বক্ষে দেশপ্রেম’।
আবদুল লতিফ মাসুম : অধ্যাপক ও বিশ্লেষক
