Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ওদের কান্নায় কাঁদল দেশজনতা

Advertisement

Icon

এম এ হামিদ

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ওদের কান্নায় কাঁদল দেশজনতা

Advertisement

এ দেশে প্রতিদিন সূর্য ওঠে। কিন্তু বহু ঘরে সকাল আসে না। এ দেশে রাত নামে, কিন্তু কিছু মায়ের চোখে ঘুম নামে না। কারণ-তাদের বাবারা ফেরে না। একটি রাষ্ট্র শুধু তার সীমানা দিয়ে পরিচিত হয় না; পরিচিত হয় তার মানুষের কান্না দিয়ে। বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে হাজারও পরিবার ‘অপেক্ষা’ নামক একটি অনন্ত কারাগারে বন্দি। তাদের অপরাধ নেই, তবু শাস্তি চরম। তাদের স্বজনরা গুম হয়েছে-রাষ্ট্রের ছায়ায়, রাষ্ট্রের নীরবতায়।

সেই পরিবারগুলোর আকুতির কথা শুনে আজ যখন তারেক রহমান কাঁদেন, সালাহউদ্দিন আহমদ কাঁদেন, রিজভী আহমেদ কাঁদেন এবং তাহসিনা রুশদী কাঁদেন-সেই কান্না শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়; এটি সেই দীর্ঘ ইতিহাসের কান্না, যেখানে একটি রাষ্ট্র বছরের পর বছর নাগরিকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। টেলিভিশনের পর্দায় সেই কান্না দেখে দেশবাসী কেঁদেছে। কারণ, মানুষ বুঝেছে-এ গল্প শুধু রাজনীতিকদের নয়, এটি আমাদের সবার।

২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক এক গভীর সংকটে প্রবেশ করে। ক্ষমতার কেন্দ্র ক্রমশ এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে ভিন্নমত মানেই রাষ্ট্রের শত্রু। বিরোধী রাজনীতির পরিচয় হয়ে ওঠে ‘ঝুঁকি’, ‘হুমকি’ কিংবা ‘নিরাপত্তা সমস্যা’। এ সময় থেকেই গুম একটি নিয়মিত রাষ্ট্রীয় অভিযোগে পরিণত হয়। দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্যে উঠে আসে-এ সময়ে শত শত মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয়ের। কেউ আর ফেরেনি, কেউ লাশ হয়ে ফিরেছে, কেউ আবার বছরের পর বছর অজানা বন্দিত্ব শেষে হঠাৎ আবির্ভূত হয়েছে অন্য দেশে, অন্য পরিচয়ে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশ্লেষণে বলা হয়-যখন রাষ্ট্র রাজনৈতিক পরিবার বা বিরোধী নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করতে আইনি ও অনানুষ্ঠানিক সব শক্তি ব্যবহার করে, তখন সেটি গণতন্ত্র নয়, এটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের লক্ষণ। জিয়া পরিবার সেই বাস্তবতার জীবন্ত উদাহরণ।

২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো একক ঘটনার ফল নয়। এটি ছিল একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া-ভয়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে বলেছে systematic repression। জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-সবাই একই ভাষায় বলেছে, বাংলাদেশে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ছিল বিচ্ছিন্ন নয়, বরং ধারাবাহিক ও কাঠামোগত।

এ enforced disappearances বা গুমের ঘটনাগুলোর একটি বিশাল অংশ রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত-তদন্ত কমিশন রিপোর্টে দেখা গেছে, বিচারবহির্ভূত নিখোঁজদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ রাজনৈতিক দলের কর্মী, আর ৬৮ শতাংশ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাদের বেশিরভাগই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সদস্য।

গুম শুধু সংখ্যা নয়, এগুলো ছিল জীবন্ত মানুষ। একজন বাবা, একজন ছেলে, একজন ছাত্র, একজন রাজনৈতিক কর্মী। গুম মানে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যাওয়া নয়; গুম মানে একটি পরিবারকে আজীবনের অনিশ্চয়তায় বন্দি করা। মৃত্যু হলেও শোকের শেষ থাকে, কিন্তু গুমের কোনো সমাপ্তি নেই। মা জানেন না তার সন্তান বেঁচে আছে নাকি নেই, স্ত্রী জানেন না তার স্বামী ফিরবে নাকি কোনোদিন ফিরবেই না, সন্তান জানে না সে এতিম কিনা। এটি চলমান মানসিক নির্যাতন; যা প্রতিদিন নতুন করে হত্যা করে।

এ দীর্ঘ সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও একটি ভয়াবহ স্বাভাবিকতায় পৌঁছায়। ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’-এ শব্দগুলো ধীরে ধীরে জনজীবনে ঢুকে পড়ে। রাষ্ট্র নিজেই যেন বিচারক হয়ে ওঠে, অভিযোগ তোলে, রায় দেয়, শাস্তি কার্যকর করে-সবকিছু আদালত ও সংবিধানের বাইরে। এ সংস্কৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন সময়ের ফল নয়; এটি একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক পছন্দ। ফ্যাসিবাদ ঠিক এখানেই জন্ম নেয়, যখন রাষ্ট্র আইনকে পাশ কাটিয়ে নিজেকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে।

এ দমননীতির বড় শিকার এবং প্রথম সারিতেই ছিলেন জিয়া পরিবার ও জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনীতির মানুষগুলো। বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মীর জীবনে রাষ্ট্র মানে হয়ে উঠেছিল মামলা, গ্রেফতার, নিখোঁজ অথবা লাশ। কাউকে রাতের আঁধারে তুলে নেওয়া হয়েছে, কাউকে দিনের আলোয়। পরিবার থানায় গিয়ে শুনেছে, ‘আমরা জানি না।’ আদালতে গিয়ে শুনেছে, ‘গ্রেফতার দেখানো হয়নি।’ এই ‘না জানি’ই ছিল রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

গুমের সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলো কান্নার হিসাব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের পর থেকে শত শত মানুষ গুমের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেককে পরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে, অনেককে বছরের পর বছর পর হঠাৎ পাওয়া গেছে ভিন্ন দেশে, ভিন্ন মানসিক অবস্থায়। আর অনেকেই আজও নিখোঁজ। এ নিখোঁজরা কোথায়? এ প্রশ্নের কোনো রাষ্ট্রীয় উত্তর নেই।

কিন্তু এ নিপীড়ন শুধু একটি রাজনৈতিক ধারায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ধর্মপ্রাণ আলেম-ওলামা, মাদ্রাসা শিক্ষক ও ছাত্ররাও এ রাষ্ট্রীয় রোষের বাইরে ছিলেন না। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, ধর্মীয় আন্দোলন, সমাবেশ বা দাবিকে ‘চরমপন্থা’ কিংবা ‘রাষ্ট্রবিরোধিতা’ আখ্যা দিয়ে দমন করা হয়েছে। নিরীহ মাদ্রাসার এতিম ছাত্রদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ, গ্রেফতার ও হয়রানির দৃশ্য দেশবাসী দেখেছে। রাষ্ট্র যখন এতিম শিশুর দিকেও সন্দেহের চোখে তাকায়, তখন সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, এটি ভয়ভিত্তিক শাসনের নগ্ন রূপ।

এ দমননীতির বিরুদ্ধে যখন কেউ কথা বলেছে, তখন রাষ্ট্রীয় অস্বীকার এসেছে। বলা হয়েছে-এগুলো রাজনৈতিক অপপ্রচার, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা। কিন্তু প্রশ্ন হলো-একই ধরনের অভিযোগ কেন বছরের পর বছর, শত শত পরিবার থেকে উঠে আসে? কেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একই ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করে? কেন কোনো স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত কমিশন গঠিত হয়নি? এ নীরবতা ও অস্বীকারই ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। তরুণদের সাহস, রাস্তায় নামা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো-এসব ইতিহাসে জায়গা পাবে। কিন্তু সেই আন্দোলনকে একমাত্র ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই হিসাবে উপস্থাপন করা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। কারণ, ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যারা গুম হয়েছেন, খুন হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন-তারা কি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেননি? তারা কি আন্দোলনের অংশ ছিলেন না? তাদের রক্ত কি কম মূল্যবান?

ফ্যাসিবাদ মানে শুধু ট্যাংক, বুট আর প্রকাশ্য সামরিক শাসন নয়। ফ্যাসিবাদ মানে ভয়কে শাসনের হাতিয়ার বানানো, আইনকে নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করা, বিরোধী কণ্ঠকে নিশ্চিহ্ন করা, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়কে সন্দেহের তালিকায় ফেলা। এ মানদণ্ডে বিচার করলে ২০০৯-২০২৪ সালের বাংলাদেশ কি ফ্যাসিবাদের বাইরে ছিল?

যদি আমরা সত্যিই একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ চাই, তবে আমাদের এ পুরো ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। ২০২৪-এর আন্দোলনকে সম্মান করতে হলে, তার আগে হওয়া প্রতিটি গুম, হত্যা ও নির্যাতনের বিচার চাইতে হবে। নইলে ফ্যাসিবাদ শুধু রূপ বদলাবে, বিদায় নেবে না।

এ সম্পাদকীয় কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। এটি একটি জাতির আত্মসমালোচনা। কারণ যে জাতি নিজের অন্ধকার অধ্যায় স্বীকার করতে পারে না, সে জাতি কখনো সত্যিকারের মুক্ত হতে পারে না। ফ্যাসিবাদ যদি সত্যিই বিদায় নিতে হয়, তবে তা একদিনে নয়-দীর্ঘ সত্য, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই সম্ভব।

এম এ হামিদ : সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকারকর্মী; সাধারণ সম্পাদক: সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটার (সিবিটি)

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

এমন সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ আগামীতেও অটুট থাকুক

বিশ্বে সংঘাত বাড়ছে, শান্তির সন্ধান ব্যাহত

বিশ্বে সংঘাত বাড়ছে, শান্তির সন্ধান ব্যাহত

মুক্ত বিনিয়োগ নীতিই হতে পারে সেরা কৌশল

মুক্ত বিনিয়োগ নীতিই হতে পারে সেরা কৌশল

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম