সাক্ষাৎকার
সহিংসতার দায় রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে: ড. বদিউল আলম মজুমদার
Advertisement
খালিদ বিন আনিস
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ড. বদিউল আলম মজুমদার। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার একজন অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, রাজনীতি বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। এছাড়া তিনি নাগরিক সংগঠন ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। সম্প্রতি তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : খালিদ বিন আনিস
যুগান্তর : ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ বর্ণিত সংস্কারগুলো (যেমন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ) বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলেও নির্বাচিত নতুন সরকার কি এ পরিবর্তনগুলো দীর্ঘমেয়াদে ধারণ করতে রাজনৈতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে?
ড. বদিউল আলম মজুমদার : রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে। এ স্বাক্ষরের মাধ্যমে তারা স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করেছে, তারা জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে, সেসব বিষয় তারা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে। তারা এ নির্বাচনের মাধ্যমে একদিকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন ৩০০ আসনে এবং প্রথম দিন থেকেই সংসদ-সদস্যের দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন ১৮০ কর্মদিবসের জন্য। এই ১৮০ কর্মদিবসে জুলাই জাতীয় সনদের যেসব বিষয় নিয়ে গণভোট হবে, সেগুলো যদি পাশ হয়, তাহলে তারা সেগুলো বাস্তবায়ন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। তো তারা যেহেতু লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছেন, আমি আশা করি, তারা এগুলো বাস্তবায়ন করবেন। পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবেন।
যুগান্তর : আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছে। তারপরও যদি কোনো কারণে কোনো জটিলতা তৈরি হয়, কোনো পক্ষ যদি নির্বাচন বর্জন করে, তাহলে এ নির্বাচন এবং গণভোটের ফলাফল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে কি গ্রহণযোগ্যতা পাবে?
বদিউল আলম মজুমদার : আমি আশা করি না, এই শেষ সময়ে এসে কেউ নির্বাচন বর্জন করবে। এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থে এটা ঘটবে না। কারণ, যদি কেউ বর্জন করে হঠাৎ করে এই সময়ে এসে, তাহলে একটা বিপর্যয় ঘটবে। তো এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যদি কেউ এটা করে, তাহলে আমাদের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দায় নিতে হবে। আমার মনে হয় এটার আশঙ্কা খুব ক্ষীণ। আমি আশা করি, তারা এটা করবে না। তবে আশঙ্কার যেটা ঘটতে পারে, সেটা হলো, যদি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন যে উত্তাপ-উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছে, এটা যদি চরম আকার ধারণ করে, সেজন্য আমাদের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দায় নিতে হবে। বর্তমান যে অসহিষ্ণুতা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সহিংসতা, এর একটা বড় কারণ আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অভাব। গণতন্ত্রের মূল কথা হলো, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং একে অপরের মতামত প্রকাশে এবং তাদের নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা চালাতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করা। এটাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এর ব্যত্যয় ঘটলে রাজনৈতিক দলগুলোকেই দায় নিতে হবে; কারণ, তারা অসহিষ্ণু হলে এবং তা যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে এর দায় তারা এড়াতে পারবে না। অবশ্য নির্বাচন কমিশন এবং সরকারকেও তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।
যুগান্তর : একটু অন্যদিকে আসি। সেটা হলো, গণভোটে যেটা বলা হচ্ছে, প্রস্তাবিত ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বাংলাদেশের মতো ছোট আয়তনের দেশে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে কি গতিশীল করবে? নাকি এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির নতুন কারণ হবে?
বদিউল আলম মজুমদার : আমি মনে করি না উচ্চকক্ষ কোনোরকম জটিলতা সৃষ্টি করবে আমাদের আমলাতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়। আমার মনে হয় না, এটা কোনো নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এখন যেভাবে উচ্চকক্ষ ধারণা করা হয়েছে, সংস্কার প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত উচ্চকক্ষটি অনেকটাই সীমিত। মূলত উচ্চকক্ষের ভূমিকাটা থাকবে সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে, যাতে কোনো দল ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠী স্বার্থে কিংবা দলীয় স্বার্থে তাদের মেজরিটি, সংসদে তাদের ওভারহুইলমিং মেজরিটি বা দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি ব্যবহার করে সংবিধান সংশোধন করতে না পারে। সে ব্যাপারেই এটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। এখন যে সংস্কার প্রস্তাব আছে, যাতে গণভোটে মানুষের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে, সেটা হলো, সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন লাগবে, আর উচ্চকক্ষের শুধু সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনেই এ সংবিধান সংস্কার বিল পাশ করা যাবে। আর আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে যদি উচ্চকক্ষ রাজি না হয়, তবে তারা সেটি নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠাতে পারবে। কিন্তু দ্বিতীয়বার যদি নিম্নকক্ষ বা সংসদ আবার সেটি উচ্চকক্ষে পাঠায় এবং উচ্চকক্ষ রাজি না হলেও সেই বিলটি আইনে পরিণত হবে। তাই যে সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে উচ্চকক্ষের ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত। আমি মনে করি না এর থেকে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কিংবা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে কিংবা আমলাতন্ত্র তাদের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করবে।
যুগান্তর : দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। তো প্রথাগত শিক্ষার বাইরে কারিগরি শিক্ষা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কি আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে না?
বদিউল আলম মজুমদার : অবশ্যই, এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। আমাদের যেসব ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজগুলো থেকে বের হচ্ছে, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। এ বাস্তবতায় আমাদের যেটা করা দরকার সেটা হলো, আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড; অর্থাৎ জনসংখ্যায় তরুণদের আধিক্যজনিত বিশেষ সুবিধাকে কাজে লাগানো। যে সমাজে তরুণদের সংখ্যা বেশি, সেই সমাজে দ্রুত উন্নয়নের সম্ভাবনাও বেশি। কারণ তরুণরাই ঝুঁকি নিতে পারে, তরুণরাই দুঃসাহসী হতে পারে, তরুণরাই তাদের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করতে পারে। কিন্তু আমাদের সমস্যা হলো, এজন্য আমাদের দরকার হবে তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা; যাতে তারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও সুশিক্ষিত হয়। সুশিক্ষিত মানে আমি বলছি আধুনিক প্রযুক্তিতে এবং যেগুলোতে নতুন কর্মসংস্থানের এবং অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা থাকবে, সেসব বিষয়ে জ্ঞান, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাদের সর্বজনীন বিকাশ সৃষ্টি করা। একইসঙ্গে তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা। এজন্য আমাদের বৃত্তের বাইরে এসে চিন্তা করতে হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা আগামী সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। আমি আশা করি, তারা এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও চিন্তাভাবনা নিয়েই সরকার গঠন করবে।
যুগান্তর : বিগত বছরগুলোতে আর্থিক খাতে যে বিশৃঙ্খলা ও অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে, নতুন সরকার কি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে ব্যাংক খাত পুনর্গঠন এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারবে?
বদিউল আলম মজুমদার : এটা নির্ভর করবে কাদের নিয়ে সরকার হয় এবং সরকারের সদিচ্ছার ওপর। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনিয়মের, ঋণখেলাপি হওয়ার, যাদের সততা ও জনকল্যাণের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে সন্দেহ আছে, তাদের নিয়ে যদি সরকার গঠিত হয়, তাহলে অবশ্যই সমস্যা হবে। কিছু গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে কোনোরকম ন্যায়-অন্যায় এবং নৈতিকতার বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে যদি সরকার পরিচালনা করা হয়, তবে এ সমস্যা আরও প্রকট হবে হবে। আমার মনে হয়, এখানে আমাদের সঠিক ব্যক্তিদের সঠিক দায়িত্ব দিতে হবে এবং সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার থাকতে হবে এ সমস্যা সমাধানের জন্য।
যুগান্তর : একটু অন্যদিকে যাই। দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে ভারত, চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থ রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ কীভাবে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখবে?
বদিউল আলম মজুমদার : এটা এক দুরূহ বিষয়। কারণ, আমরা একদিকে আমাদের প্রতিবেশী ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত। একইসঙ্গে চীন আমাদের ঘনিষ্ঠ উন্নয়ন সহযোগী এবং ভৌগোলিক দিক থেকেও তারা আমাদের কাছাকাছি প্রতিবেশী। আর পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, তাদেরও আগ্রহ আছে আমাদের ব্যাপারে। তাই এই ত্রিমুখী শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলা সহজ হবে না। তবে এর কোনো বিকল্পও নেই। আশা করি, আমরা কোনো নতজানু-অতীতের মতো নতজানু পররাষ্ট্রনীতির চর্চা করব না। আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থে এবং ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করব। আমরা এমন কোনো পদক্ষেপ নেব না, যেটা আমাদের সঙ্গে কারও বা এ শক্তির মধ্যে বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি করবে। এটা সহজ হবে না। কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই।
যুগান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
বদিউল আলম মজুমদার : ধন্যবাদ।
