Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অস্তিত্ব সংকটে দেশীয় স্পিনিং খাত

Advertisement

Icon

সাইফুল ইসলাম সবুজ

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অস্তিত্ব সংকটে দেশীয় স্পিনিং খাত

Advertisement

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা তৈরি পোশাকশিল্প আজ বিশ্ববাজারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এ বিশাল প্রাসাদের ভিত্তি যে টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাতের ওপর দাঁড়িয়ে, সেটিই এখন ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, একে কেবল ব্যবসায়িক মন্দা বললে ভুল হবে; বরং একে একটি দীর্ঘস্থায়ী শিল্প বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসাবে অভিহিত করা যেতে পারে। গত দুই মাসে ৫০টিরও বেশি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আরও অন্তত ৫০টি মিল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত।

প্রতিবেশী দেশের স্পিনিং মিলগুলোর চেয়ে আমাদের দেশের স্পিনিং মিলগুলো প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত উন্নত। আমরা ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ডের মেশিনারিজ ব্যবহার করি এবং আমাদের উৎপাদন দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে ভালো। কিন্তু দক্ষতা যেখানে ডাম্পিং প্রাইসের মুখোমুখি হয়, সেখানে টিকে থাকা কঠিন। পার্শ্ববর্তী দেশ তাদের স্পিনিং খাতে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক উভয় স্তরে ব্যাপক প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিচ্ছে। তুলাচাষ থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে তারা রাষ্ট্রীয় সুবিধা পায়। ফলে ভারত প্রতি কেজি সুতা প্রায় ৩০-৩৫ সেন্ট কম দামে বাংলাদেশে রপ্তানি করতে পারছে। তাদের মোট সুতা রপ্তানির ৪৬ শতাংশই আসছে বাংলাদেশে। তথাকথিত এই ‘প্রাইস অ্যাডভান্টেজ’ আসলে কোনো মুক্তবাজার প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ডাম্পিং। এর ফলে গত এক বছরে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে সুতা আমদানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

গার্মেন্টস মালিকদের সাময়িক সুবিধা বনাম দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বায়াররা ওপেন কস্টিং শিটে অনেক সময় সুনির্দিষ্ট করে দিচ্ছেন যে, ভারতের অমুক মিল থেকে সুতা কিনে বাংলাদেশে শুধু সেলাই করতে হবে। সামান্য কয়েক সেন্টের সাশ্রয়ের লোভে গার্মেন্টস মালিকরা বিদেশি সুতার দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সামান্য দামের বেনিফিট ছাড়া গার্মেন্টস মালিকরা আমদানি করা সুতায় আর কোনো বাড়তি সুবিধা পান না। বরং আমদানিনির্ভরতার কারণে লিড-টাইম বেড়ে যাওয়া, লজিস্টিক জটিলতা এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ রিস্কের মতো বড় সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। আমাদের স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো এখন কটন সুতার চাহিদার প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। শুধু তাই নয়, গ্রে মিলাঞ্জ, পিসি, সিভিসি, কোর স্পান লাইকরাসহ প্রায় সব ধরনের ফেন্সি সুতাও এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। দেশীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধায় পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার সুতা আমদানির গ্রাফ ২৬ হাজার কোটিতে গিয়ে ঠেকেছে। এটি দেশীয় বিনিয়োগের ওপর সরাসরি কুঠারাঘাত।

বিপরীতমুখী নীতি ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন যেখানে ভারত তাদের শিল্পকে বাঁচাতে নীতিসহায়তা বাড়াচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশে উলটো চিত্র দেখা যাচ্ছে। আগে গার্মেন্ট মালিকরা দেশীয় সুতা ব্যবহার করলে ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা পেতেন, যা ভারতীয় সুতার সঙ্গে দামের পার্থক্য কমিয়ে আনত। কিন্তু এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের অজুহাতে সেই সহায়তা কমিয়ে ১.৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ বিপরীতমুখী নীতি দেশীয় মিলগুলোকে প্রতিযোগিতার দৌড় থেকে ছিটকে দিচ্ছে। কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি স্পিনিং মিল বন্ধ হওয়া মানে শুধু কারখানার গেটে তালা ঝোলা নয়, ইতোমধ্যে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হওয়ার পথে। এর সঙ্গে পরিবহণ, কেমিক্যাল এবং প্যাকেজিং খাতের বিশাল সাপ্লাই চেইন জড়িত। যদি আজ স্পিনিং খাতকে রক্ষা করা না যায়, তবে আমরা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ব। তখন যদি কোনো কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সুতার সংকট হয় বা রপ্তানিকারক দেশ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে বাংলাদেশের পুরো গার্মেন্ট রপ্তানি মুখ থুবড়ে পড়বে।

নীতিগত সমাধানের দাবি আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা বা করুণা চাই না; আমরা চাই একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ। পরিস্থিতি উত্তরণে তিনটি পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া জরুরি-

১. বন্ড সুবিধার যৌক্তিকরণ : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী, ১০-৩০ কাউন্টের সুতা অবিলম্বে বন্ড সুবিধার বাইরে রাখতে হবে। কারণ, এ রেঞ্জের সুতা উৎপাদনে আমাদের দেশীয় সক্ষমতা পর্যাপ্ত।

২. ইনসেনটিভ কাঠামো পুনর্বিবেচনা : দেশীয় সুতা ব্যবহারে গার্মেন্ট মালিকদের উৎসাহিত করতে নগদ সহায়তার হার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

৩. ট্রেড রেমেডি ব্যবস্থা : ডাম্পিং প্রাইসের বিরুদ্ধে কার্যকর শুল্ক বা অ্যান্টি ডাম্পিং মেজার গ্রহণ করতে হবে।

টেক্সটাইল খাত হচ্ছে গার্মেন্ট শিল্পের মূল ভিত্তি। ভিত্তি দুর্বল হলে পুরো ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়বে। স্পিনিং মিল মালিকদের দাবি কোনো অযৌক্তিক আবদার নয়, বরং এটি দেশীয় শিল্প এবং লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন বাঁচানোর আকুতি। আজ যদি আমরা স্পিনিং খাতকে বাঁচাতে ব্যর্থ হই, তবে কাল আমাদের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গার্মেন্ট খাতও নিরাপদ থাকবে না। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সরকারকে বাস্তবসম্মত ও কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সাইফুল ইসলাম সবুজ : মহাব্যবস্থাপক (বিপণন), স্পিনিং ডিভিশন, যমুনা গ্রুপ

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম