দৃষ্টিপাত
এবারের একুশের অঙ্গীকার : বৈষম্যহীন সমাজ গঠন
Advertisement
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ। এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি নানা কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে কল্যাণমূলক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল জাতি, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উন্মুক্ত পরিবেশে জনগণ নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সরকারকে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। আমাদের দেশের রাজনীতিকরা যদি ইতিহাস থেকে সামান্যতম শিক্ষা গ্রহণ করেন, তাহলে তাদের পক্ষে ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার কোনো আশঙ্কা থাকবে না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার একুশের চেতনাকে বুকে ধারণ করে দেশ পরিচালনা করবে, এটাই সবার প্রত্যাশা।
একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাংলার ছেলেরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে যে আন্দোলন করেছিল, তা সাধারণ কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না। এর তাৎপর্য অনেক গভীরে প্রোথিত। এর রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা গঠনে একুশের ভূমিকা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। ১৯৫২ সালের পর বাংলাদেশে যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, তার প্রতিটির পেছনে একুশের চেতনা অনুপ্রেরণার উৎস হিসাবে কাজ করেছে। ইংরেজ-অধিকৃত ভারতের স্বাধীনতার জন্য এদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ আন্দোলন-সংগ্রাম করছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে হিন্দু-মুসলমান উভয় জাতি সম্মিলিতভাবে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করতে থাকে; কিন্তু হিন্দু নেতাদের আচার-আচরণে প্রতীয়মান হয়, ভারত সম্মিলিতভাবে স্বাধীন হলে মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা হবে না। তাই মুসলিম নেতারা একপর্যায়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে তাদের জন্য পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র দাবি করে। এ অঞ্চলের মুসলমানরা অখণ্ড পাকিস্তানের আওতায় স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখলেও তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা একক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের কথা বিবেচনায় রাখে।
ধর্মীয় বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে মিল থাকলেই যে শোষক ও শোষিতের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে, তা না-ও হতে পারে। কারণ, শোষক ও শোষিতের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সবসময়ই ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমাপ্তির পর্যায় এলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ইংরেজরা ভারতবর্ষ ত্যাগ করতে যাচ্ছে। সেই সময় একটি প্রশ্ন খুব বড় হয়ে দেখা দেয়; তাহলো ধর্মের ভিত্তিতে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলে, তার রাষ্ট্রভাষা কী হবে? পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ বাংলা ভাষাভাষী। তাদের ভাষা কি উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাবে? সেই সময় জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং আরও কিছু বৃদ্ধিজীবী পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ‘বাংলা’কে মর্যাদা দেওয়ার জন্য দাবি উত্থাপন করেন। তারা এ ব্যাপারে জনমত গঠনের জন্য পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। বিভিন্ন সভায় তারা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতিদানের জন্য দাবি জানাতে থাকেন। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সভায় ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ সভায় উপস্থিত ছাত্রনেতারা তাৎক্ষণিকভাবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান। সদ্যস্বাধীন পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তব্যের বিরুদ্ধে এভাবে কেউ প্রতিবাদ জানাতে পারে, সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তা ছিল অকল্পনীয়। পরবর্তীকালে ছাত্ররা বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৪৮ সালে ছাত্রদের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি মোতাবেক বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতিদানের অঙ্গীকার করা হয়। এ চুক্তির খসড়া তৈরি করেছিলেন আবদুর রহমান চৌধুরী, যিনি পরবর্তীকালে বিচারপতির আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন। বাংলাভাষা আন্দোলন-সংগ্রাম পরিষদের প্রথম আহ্বায়ক প্রফেসর নূরুল ইসলাম ভূঁইয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ সালেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ১৯৫২ সালে যেটা ঘটেছিল, তা ছিল ‘বিস্ফোরণ পর্ব।’ পাকিস্তান সরকার যদি স্বাক্ষরিত চুক্তি থেকে সরে না আসত, তাহলে ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন হতো না।
যা হোক, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অধিবেশন চলাকালে ভাষার দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সরকার কর্তৃক জারিকৃত ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মিছিল নিয়ে অ্যাসেম্বলি ভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ বিনা উসকানিতে মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে রফিক, শফিক, সালাম, বরকতসহ বেশ কয়েকজন ছাত্র নিহত হন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনার দ্বিতীয় কোনো নজির নেই, যেখানে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারির মতো সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা দ্বিতীয়টি নেই। ১৯৫২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে যত ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, তার প্রতিটির পেছনে একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে প্রেরণা জুগিয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের পেছনেও একুশে ফেব্রুয়ারি প্রেরণার উৎস হিসাবে কাজ করেছে।
১৯৪৭ সালে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মীয় সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হয়েছিল। কিন্তু তাদের মোহভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। আশাহত বাংলাদেশের মানুষ ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে সফলতার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে থাকে। তারা ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। মাতৃভাষা যে জাতি গঠনের সবচেয়ে বড় উপকরণ হতে পারে, বাংলাদেশের মানুষ তা প্রমাণ করে দেখিয়েছে। একুশের চেতনা আমাদের শোষণমুক্ত স্বদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখায়। একুশ মানে মাথানত না করা, একুশ মানে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শেখা। কাজেই একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি দিন বা উপলক্ষ্য মাত্র নয়। একুশ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা। জাতি এবং ব্যক্তি জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। ভাষার ভিত্তিতে জাতিসত্তার উন্মেষ এবং রাষ্ট্র গঠন সম্ভব, তা বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের মানুষ চরিত্রগতভাবে অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। কিন্তু প্রয়োজন হলে তারা সিংহের চেয়েও হিংস্র হতে পারে, তা বারবার প্রমাণ করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সহজ জীবনযাত্রার কারণে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী অঞ্চল বাংলাদেশ বারবার বিদেশি শক্তির দ্বারা আক্রান্ত এবং পরাস্ত হয়েছে; কিন্তু তারা কখনো প্রতিবাদহীনভাবে বিদেশি প্রভুশক্তিকে মেনে নেয়নি। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবার সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে ইংরেজ দখলদার শক্তি এ দেশে তাদের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ লাভ করে। ১৭৬৫ সালে মোগল সম্রাটের কাছে বাংলার দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে ইংরেজরা বাংলা দখলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীকালে তারা প্রায় ২০০ বছর বাংলাদেশকে পদানত করে রাখে। কিন্তু এ দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের মানুষ ইংরেজদের আধিপত্য বিনা প্রশ্নে মেনে নেয়নি। ইংরেজরা উপমহাদেশ দখল করলেও তারা অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বাংলার মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভয় পেত। কারও বশ্যতা স্বীকার না করার একুশের চেতনা বাংলাদেশের মানুষ সব সময়ই হৃদয়ে ধারণ করেছিল।
১৯৫২ সালে যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর পাকিস্তানি পুলিশ বাহিনী নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করে, তখন আমার বয়স ছিল খুবই কম। আমি সেই সময় তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছিলাম। ভাষা আন্দোলন কী, তা বোঝার সময় তখনো আমার হয়নি। তবে এটি খুব ভালোভাবেই মনে আছে, ঢাকায় নির্মম হত্যাযজ্ঞের পর আমরা ক্লাস ছেড়ে মিছিল করে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিলাম। পুলিশ আমাদের তাড়া করেছিল। এতে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ছাত্ররা দৌড়ে পালাতে থাকে এবং নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করে। আমি নিজেও অন্যদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী একটি মিষ্টির দোকানে আশ্রয় গ্রহণ করি। পরিস্থিতি শান্ত হলে বাসায় ফিরে যাই।
পরবর্তীকালে বড় হয়ে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। আমার যেটা মনে হয়েছে, তা হলো ভাষা আন্দোলন বা একুশে ফেব্রুয়ারি কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একুশের ভাষা আন্দোলনের আবশ্যকতা কখনোই শেষ হওয়ার নয়। আমাদের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে একুশের চেতনা নানাভাবে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যারা আন্দোলন-সংগ্রাম চলাকালে একুশের চেতনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন, ক্ষমতায় আসীন হয়ে তারাই একুশের চেতনা ভুলে যান। একুশের চেতনার পরিপন্থি কাজ করতে শুরু করেন। একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন শুধু বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সমাজ থেকে সব ধরনের বৈষম্য-অনাচার দূরীকরণের আন্দোলন। কিন্তু আমরা স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরও সমাজে একুশের চেতনা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এখনো বৈষম্য দূরীকরণের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে শত শত মানুষকে প্রাণ দিতে হয়।
আমি একজন প্রবীণ শিক্ষক হিসাবে শিক্ষাক্ষেত্রে একুশের চেতনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দিকটি তুলে ধরতে চাই। একুশের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে গুণগত মানসম্পন্ন কল্যাণধর্মী শিক্ষা বিস্তারের কোনো বিকল্প নেই। কোনো দেশ যদি তার নাগরিকদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে সেই জাতি কখনোই ইপ্সিত মাত্রায় উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। মানবিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত হচ্ছে উপযুক্ত ও মানসম্পন্ন শিক্ষার বিস্তার। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পেছনে প্রেরণাদায়ক ভূমিকা পালন করেছে একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা ভাষার মানোন্নয়ন এবং সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুর সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়; কিন্তু সেই সুযোগ আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। সর্বস্তরে বাংলা চালুর উদ্দেশ্য এই নয়, আমরা আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজিকে অবজ্ঞা করব। বাংলা ভাষার পাশাপাশি আমাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টিকে থাকার জন্য ইংরেজি ভাষার ওপর দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুর নামে ইংরেজি ভাষার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়।
সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভাষার উন্নয়ন ও উপযোগিতা সৃষ্টির জন্য আবশ্যিক শর্তাবলি পূরণ করা হয়নি। ফলে একজন উচ্চশিক্ষিত ছাত্রের মাঝেও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রচণ্ড অভাব লক্ষ করা যায়। এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না, মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জনের জন্যই ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, বিশ্বের জ্ঞানভান্ডার ইংরেজি ভাষাতেই সংরক্ষিত হচ্ছে। আমরা বাংলাভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছি। কিন্তু শিক্ষা উপকরণের অভাব পূরণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ উন্নত মানের শিক্ষা উপকরণ জোগান দিতে পারিনি। গত শতাব্দীর ষাটের দশক পর্যন্ত আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার যে মান ছিল, পরবর্তীকালে তা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। বিগত সরকারের আমলে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের পরিবর্তে পাশের হার বেশি দেখানোর প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে। ফলে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য আসছে এবং শিক্ষা গ্রহণ শেষে বেরিয়ে যাচ্ছে, তারা আসলে কতটা শিক্ষিত, তা নিয়ে সংশয় জাগে। গুণগত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে, একটি জাতি কোনোভাবেই উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পারে না। ইউনেস্কোর মতে, একটি দেশের জাতীয় বাজেটের অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা প্রয়োজন। এর মধ্যে একটি বড় অংশই ব্যয় করতে হবে শিক্ষা-গবেষণা কাজে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হবে নতুন নতুন জ্ঞানভান্ডার উন্মোচন করা। নবউদ্ভাবিত জ্ঞানকে জাতির কল্যাণে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের ২ শতাংশেরও কম ব্যয় হচ্ছে শিক্ষা খাতে। ব্যয়িত অর্থের বেশির ভাগই চলে যায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজে। ফলে গবেষণা কর্ম অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণআকাঙ্ক্ষার একটি নতুন সরকার রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এ সরকার কোনো গতানুগতিক সরকার নয়, বর্তমান সরকার হচ্ছে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল। সরকার একুশের চেতনাকে ধারণ করে রাষ্ট্রপরিচালনা করবে-এ কামনা করি। একুশের চেতনার মধ্যে রয়েছে জনগণের কল্যাণ। গণতান্ত্রিক সরকার অবশ্যই সে পথে হাঁটবে। আমি তাদের সাফল্য কামনা করি।
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত
