পেশিশক্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
Advertisement
পেইমান সালেহি
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৬ সালের শুরুর দিকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে একটি পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন এখন আর আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির ভাষায় নয়, বরং সরাসরি ‘লেভারেজ’ বা প্রভাব-প্রতিপত্তির ভাষায় কথা বলতে বেশি আগ্রহী। গত এক বছরে ভেনিজুয়েলায় উত্তেজনা বৃদ্ধি, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে পুনরায় আঞ্চলিক আধিপত্যের বাগাড়ম্বর, ন্যাটো জোটের ভেতরে ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যে কঠোর নিরাপত্তা অবস্থান-এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সামগ্রিকভাবে এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, আমেরিকা তার বিশ্বজনীন অবস্থান ধরে রাখার জন্য এখন ভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছে।
ভেনিজুয়েলা সংকট ও নিয়মনীতির বিচ্যুতি : ভেনিজুয়েলা সংকট এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ২০২৫ সালের শেষভাগে নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতির পর মার্কিন নীতি এখন কেবল গতানুগতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ওয়াশিংটন এখন এমন এক সরাসরি চাপের কৌশল গ্রহণ করেছে, যা অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যকার সীমানাকে অস্পষ্ট করে দেয়। এ ঘটনা একটি বার্তাই দেয় : যখন কৌশলগত মর্যাদা ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন ওয়াশিংটন কূটনৈতিক বা আইনি রীতিনীতি লঙ্ঘন করতেও দ্বিধা করে না। মাদুরোর শাসন যেমনই হোক না কেন, এই উত্তেজনার দৃশ্যমান প্রভাব ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে একটি বার্তাই পৌঁছে দিচ্ছে-বিশ্বব্যবস্থায় পদ্ধতির চেয়ে শক্তিই এখন মুখ্য।
গ্রিনল্যান্ড ও ন্যাটোর টানাপোড়েন : গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আমেরিকার নতুন করে ভূখণ্ড দখলের মতো কথাবার্তা ইউরোপীয় মিত্রদের বিচলিত করেছে। একই সঙ্গে ন্যাটোর ভেতরেও ফাটল গভীর হচ্ছে। সামরিক খরচের ভাগাভাগি নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক এবং ন্যাটোর শক্তি মূলত আমেরিকার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল-এমন দাবি জোটের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। যখন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা শর্তসাপেক্ষ হয়ে ওঠে, তখন মিত্র দেশগুলো বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে।
জ্বালানি ও নিরাপত্তা : এই পরিবর্তনের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রভাব পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে। এ অঞ্চলটি জ্বালানি নিরাপত্তা, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং অমীমাংসিত সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। যদিও উপসাগরীয় জ্বালানি রপ্তানির ৮০ শতাংশ এশীয় দেশগুলোতে (চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া) যায়, তবুও ইউরোপের অর্থনীতি এর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে জ্বালানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপথের স্থিতিশীলতা ইউরোপের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতিকে ‘অপরিহার্য’ হিসাবে তুলে ধরছে। আরব দেশগুলোর প্রতি ওয়াশিংটনের প্রচ্ছন্ন বার্তা হলো : মার্কিন সমর্থন ছাড়া এ অঞ্চলে তারা টিকে থাকতে পারবে না। এই সুরের মধ্যে এখন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ মিশে আছে। ওয়াশিংটন বোঝাতে চায় যে, আমেরিকার সমর্থন ছাড়া তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে। এভাবেই নিরাপত্তাহীনতাকে পুঁজি করে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতার রাজনীতি টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।
ইরান ও ইসরাইল ফ্যাক্টর : গাজা যুদ্ধের পর থেকে ইসরাইলের নিরাপত্তা আমেরিকার আঞ্চলিক অবস্থানের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে। ইরানের নীতিনির্ধারকরা এ পরিস্থিতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মহসেন রেজায়ি যুক্তি দিয়েছেন, আমেরিকা এখন তার আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে মূলত তিনটি অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে : সামরিক সংকেত, নিষেধাজ্ঞার বিস্তার এবং কৌশলগত ভীতি প্রদর্শন। ইরানের নীতিনির্ধারণী মহলে এই চিন্তাটি এখন বেশ প্রবল।
ডলারের ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক বাস্তবতা : এই অস্থিরতার পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। আমেরিকার ঋণের বোঝা বাড়ছে, অন্যদিকে ‘ব্রিকস’ দেশগুলোর মধ্যে ডলারের বিকল্প খোঁজার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যদি বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও ধীরে ধীরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে থাকে, তাহলে আমেরিকার বৈশ্বিক আধিপত্যের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়বে। এমন অবস্থায় সামরিক শক্তি প্রদর্শন করার মাধ্যমে ওয়াশিংটন আসলে বাজারকে এই আশ্বাস দিতে চায় যে, আমেরিকার কেন্দ্রিকতা এখনো অক্ষুণ্ন আছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্ন এটি নয় যে যুক্তরাষ্ট্র কি এখনো শক্তিশালী? অবশ্যই তারা শক্তিশালী। আসল প্রশ্ন হলো, অতিরিক্ত চাপ, শর্তসাপেক্ষ মিত্রতা এবং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা যে পদ্ধতিতে ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছে, তা বিশ্বব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করবে নাকি টুকরো টুকরো করে ফেলবে? ইরানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে এই অনিশ্চয়তা একটি বার্তাই দেয় : সতর্ক থাকো, বিকল্প তৈরি করো এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে একমাত্র গন্তব্য না ভেবে পরিবর্তনশীল বিশ্বের একটি বিকল্প হিসাবে বিবেচনা করো।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে ভাষান্তরিত
পেইমান সালেহি : ইরানি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক
