Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাইফোকাল লেন্স

এত জঘন্য হত্যাকাণ্ড, দ্রুত বিচার হলো না!

Advertisement

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এত জঘন্য হত্যাকাণ্ড, দ্রুত বিচার হলো না!

Advertisement

নানা নাটকীয়তা ও গোপনীয়তার গ্যাঁড়াকলে পড়ে পিলখানার নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করে এ দেশের মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। এ হত্যাকাণ্ডের আদৌ কোনো বিচার পাওয়া যাবে কিনা, জনমনে এখন সে প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। বহুল প্রচলিত ইংরেজি একটি প্রবাদ আছে, ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’। এ প্রবাদটি মূলত একটি আইনি নীতি, যার অর্থ ন্যায়বিচারে দেরি হওয়া মানেই ন্যায়বিচার অস্বীকার করা। এ কথাটির মূল উৎস ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা, যা ঐতিহাসিক দলিল বলে ধরা হয়, যেখানে বলা হয়েছিল, To no one will deny or delay right। ম্যাগনা কার্টার ৪০ নম্বর ধারায় ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে এ কথাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলেই এ বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার একটি সূক্ষ্ম কৌশল অনুসরণ করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পর হাসিনা সরকারের তরফ থেকে দুটো মামলা করা হয়েছিল। একটি হত্যাকাণ্ড মামলা এবং আরেকটি ছিল বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা। সে সময় পাবলিক সেন্টিমেন্টকে ঠান্ডা রাখার জন্য হত্যা মামলাটি দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হলেও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। হত্যা মামলার আসামি সবাইকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলার আসামি করা হয়েছিল। হত্যা মামলাটি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে বিচারিক আদালতে রায় ঘোষণা করা হলেও ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলার এক হাজার ৩৩৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র দুই শতাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা শেষ হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের আসামিরাই যেহেতু বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা মামলার আসামি, কাজেই এ মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রায়ও কার্যকর করা সম্ভব হবে না। এভাবেই হাসিনা সরকার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পুরো প্রক্রিয়াটিকে ঝুলিয়ে রেখেছিল। সুতরাং, সবকিছু মিলিয়ে এ দুটি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কবে হবে, তা বলা মুশকিল ছিল। উল্লেখ্য, হত্যাকাণ্ড মামলার রায় দেওয়ার সময়েই উচ্চ আদালত নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যচারীদের শনাক্তের জন্য একটি তদন্ত কমিশন গঠন করার জন্য হাসিনা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। অথচ নেপথ্যচারীদের খুঁজে বের করার কোনো ইচ্ছাই শেখ হাসিনার ছিল না। অতঃপর তিনি আদালতের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাধীন তদন্ত কমিশনও গঠন করেননি।

উচ্চ আদালতের ইতঃপূর্বের দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে। এ কমিশন ১১ মাসব্যাপী তদন্ত শেষে গত বছরের ২৯ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। অবশ্য তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে কোনো কোনো আইনজীবী নতুন করে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। জমাকৃত প্রতিবেদনে, বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে দলগতভাবে আওয়ামী লীগ জড়িত এবং পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার পেছনে শেখ হাসিনার সায় (গ্রিন সিগন্যাল) ছিল বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা হয়েছে। এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের কিছু মন্তব্য এ ধোঁয়াশা সৃষ্টির কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। আওয়ামী ঘরানার সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজীবী মনে করেন, মূলত ভবিষ্যতে ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এবং যে গাফিলতি বা ভুলের জন্য ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে সরকার যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে, সে কারণেই এ ধরনের তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। বিডিআর হত্যাকাণ্ড একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং ফৌজদারি অপরাধের ব্যাপারে তদন্ত করার ক্ষমতা একমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তারা তদন্ত করে নতুন কিছু পেলে সাক্ষ্য-প্রমাণ হলে কোর্ট আমলে নেবে। মামলাটি যেহেতু এখন আপিল বিভাগে আছে, কাজেই ওই মামলার বিচারের ব্যাপারে তদন্ত কমিশনের জমা দেওয়া প্রতিবেদনের কোনো মূল্য নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। উল্লেখ্য, বিচারিক আদালতের রায়ের পর ২০১৭ সালে উচ্চ আদালত চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় নেপথ্যচারীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার জন্য যে তদন্ত কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন, এ আইনজীবী তা আমলেই নেননি। অপরদিকে সুপ্রিমকোর্টের আরেক আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, পিলখানায় ‘ডাল-ভাত কর্মসূচি’ নামক বিডিআর বিদ্রোহ ঘটেছে এমন বিবেচনায় ও সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যা মামলাটির বিচার হয়েছে। স্বাধীন তদন্ত কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে বিডিআর বিদ্রোহ নয়, বরং ভারতের সহযোগিতায় ঘটনা ঘটার কথা বলা হয়েছে; যা সাংঘর্ষিক বলে তার মনে হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশও করা হয়। ফলে আসামিরা বেনিফিট অফ ডাউটের কারণে সবাই খালাস হয়ে যেতে পারে। তবে তিনি এ কথাও বলেন, ‘সরকারপক্ষ যদি এ প্রতিবেদন নিয়ে আদালতে কোনো আবেদন করে, সে ক্ষেত্রে তা বিবেচনা করতে পারে সর্বোচ্চ আদালত।’ অত্যন্ত আশ্চর্যের সঙ্গে এ দুজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর বক্তব্য লক্ষ করেছি। তারা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বক্তব্য দিলেও এ মর্মান্তিক ঘটনা, দেশের নিরাপত্তার জন্য যে বিরাট হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সে বিষয়টি তারা কেউই বিবেচনা করেনি। প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পেছনে যদি কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের জড়িত থাকার আলামত পাওয়া যায়, তারপরও কি আমরা আইনের দোহাই দিয়ে বসে থাকব? উচ্চ আদালতের পরামর্শ অনুযায়ী তদন্ত কমিশন যদি জাতীয় নিরাপত্তার হুমকির সূত্রগুলো খুঁজে বের করে এবং তা আদালতে যদি প্রমাণ করা যায়, তাহলে ক্ষতি কী? তদন্তে উদ্ঘাটিত তথ্য অনুসারে দেশের জনগণ ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন ওঠে, সে প্রশ্নের উত্তর আমাদের অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। এ ব্যাপারে উপেক্ষা করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

এ জঘন্য ঘটনার আমিও একজন ভুক্তভোগী। সে সময় ঢাকার বাইরের একটি রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলাম। ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বাইরের প্রতিটি রাইফেল ব্যাটালিয়নে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তা ধামাচাপা পড়ে গেছে। ফেব্রুয়ারির আজকের দিনে অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে আমাকে যেভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হয়েছিল, ভুক্তভোগী হিসাবে তা কেবল আমিই উপলব্ধি করতে পারি।

আমাকে লক্ষ্য করে সেদিন গুলিবর্ষণও করা হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় আজও আমি বেঁচে আছি। অতএব, বিডিআরের ঘটনা নিয়ে আমাদের যে তীব্র মানসিক কষ্ট, তা অন্য কেউ উপলব্ধি করতে পারবেন না। এ নিয়ে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির মিলও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে কোনো রাজনীতি নেই। ব্যক্তিস্বার্থেরও কোনো অগ্রাধিকার নেই। আমরা প্রকৃত সত্য জানতে চাই। পেছন থেকে যারা বিডিআর সদস্যদের ব্যবহার করেছেন, আমরা তাদের বিচার চাই।

শুনেছি বর্তমান সরকার এ হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্ত করবে। সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত আনাই। তদন্ত কমিশন দীর্ঘ সময় নিয়ে হত্যাকাণ্ডের অনেক অজানা তথ্য উদ্ঘাটন করেছে। এমন কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যা এতদিন মানুষ কেবল শুধু ধারণাই করেছেন। এ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনটি নতুনভাবে তদন্তের ক্ষেত্রে সাহায্য করবে বলে মনে হয়। কিছু কিছু বিষয়ে, তদন্ত কমিশন আরও বেশি তদন্তের সুপারিশও করেছে। অতএব পুনঃতদন্তে নতুন কিছু উদ্ঘাটিত হলে মন্দ কী! তবে এ বিষয়ে ছোট একটা সতর্কবার্তা আছে, এ তদন্ত যেন কোনো পক্ষকে রক্ষা করার উদ্যোগ না হয়; দেশের মানুষের কাছে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। অতএব এটি ধরেই নেওয়া যায়, নতুন তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের সার্বক্ষণিক সতর্ক দৃষ্টি থাকবেই। আরও একটি বিষয় লক্ষ রাখতে হবে, এ তদন্ত যেন সময়ক্ষেপণের হাতিয়ার না হয়। সময়ক্ষেপণ হলে বিচারহীনতার সম্ভাবনাই বাড়বে কেবল। এ প্রসঙ্গে, ১৭শ শতাব্দীর যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম পেন-এর একটি উক্তির উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করতে চাই। উইলিয়াম পেন একজন ব্রিটিশ ইংরেজ; যিনি একাধারে ধর্মীয় চিন্তাবিদ ও ঔপনিবেশিক প্রশাসকও ছিলেন। তার নামের শেষাংশ ‘পেন’ থেকেই পেনসিলভেনিয়া নামকরণ করা হয়। তিনি আদিবাসী আমেরিকানদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণের জন্যও সমধিক পরিচিত ছিলেন। পেনসিলভেনিয়ায় তার প্রবর্তিত গণতান্ত্রিক নীতিমালা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার পর সংবিধান রচনায় অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল। ধর্মীয় সহনশীলতা ও গণতন্ত্রের অন্যতম প্রবক্তা উইলিয়াম পেন ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘To delay Justice is Injustice’। যার অর্থ দাঁড়ায়, ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য যদি অনেক বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়, তবে সেই বিচার পাওয়ার আর কোনো মূল্য থাকে না, এটি কার্যত বিচার না পাওয়ারই সমান।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার, কলাম লেখক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

নিউইয়র্কের চিঠি বদলে যাচ্ছে ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ

বদলে যাচ্ছে ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহু

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহু

সাক্ষাৎকার প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তাৎপর্যপূর্ণ: এম হুমায়ুন কবীর

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তাৎপর্যপূর্ণ: এম হুমায়ুন কবীর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম