শতফুল ফুটতে দাও
সম্পর্ক হতে হবে সমঅধিকার ও মর্যাদাভিত্তিক
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিস আবার চালু হওয়া প্রসঙ্গে গুগল যা লিখেছে, তা নিম্নরূপ : ‘দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু হচ্ছে ঢাকা-আগরতলা-কলকাতা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাস পরিষেবা। ২৪ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা কমলাপুর বাস ডিপো থেকে পরীক্ষামূলক রয়েল মৈত্রীর একটি বাস আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট সীমান্তপথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় প্রবেশ করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ভিসা জটিলতার কারণে এ বাস সার্ভিস বন্ধ থাকে। দেড় বছরেরও বেশি সময় পর মৈত্রী ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে পরীক্ষামূলক বাস যাত্রা শুরু হয়। ঢাকা হয়ে আগরতলা, কলকাতা বাস সার্ভিসের জিএম ওয়ারিছ আলম ডিএস জানান, আপাতত সপ্তাহে দুদিন পরীক্ষামূলকভাবে চলবে এ বাস সার্ভিস। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়ে গেলে সপ্তাহে তিন দিন করে নিয়মিত এ পরিষেবা শুরু হবে। প্রসঙ্গত, ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা থেকে ট্রেনে গুয়াহাটি হয়ে কলকাতায় পৌঁছাতে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। তবে বাসে ঢাকা হয়ে সেই যাত্রাপথ অনেকটাই কমে যায়। আগরতলা থেকে ঢাকা হয়ে বাসে কলকাতায় মাত্র ৫০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়।
বাস পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা। রাজ্য সরকারের পরিবহণমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী রাজ্যের গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, মৈত্রী ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও মজবুত হয় এবং উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হয়। এ বাস পরিষেবা শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয় বরং দুদেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন, যা শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। তিনি আরও জানান, এ পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়ায় দুদেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, পর্যটন, ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে এবং শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ সুগম হবে বলেও আশাবাদী তিনি।
তার কথায়, বাংলাদেশকে ভারত সব সময়ই আত্মীয় ও প্রতিবেশী পরিবারের সদস্য হিসাবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো অস্থিরতা বা অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হলে তা ভারতের মানুষের কাছেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অতীতে দুদেশের সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা দেখা দিয়েছিল। তবে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। দুদেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে উভয়পক্ষই আগ্রহী বলে তিনি জানান।
২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ঢাকা হয়ে আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যায়। গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রচণ্ড অবনতি ঘটে। এই সময় ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলো আক্রান্ত হয়। ভারতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা চলতে থাকে। বাংলাদেশে যেসব ভারতীয় কূটনীতিক কাজ করেছেন এবং বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন, তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে আক্রমণাত্মক ভাষায় বক্তব্য ও লেখা প্রকাশ করতে থাকেন। পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করে নিয়মিত বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষায় বক্তব্য ও বিবৃতি প্রকাশ করতে থাকেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েকশ নেতাকর্মীর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ বিষোদগার। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারত সরকারকে চিঠি লিখলেও তার উপযুক্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, একটি নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের পর দুদেশের পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটবে।
বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংসদে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। এর কয়েক দিনের মাথায় জানা গেল, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিস চালু হতে যাচ্ছে। বর্তমান ব্যবস্থায় সপ্তাহে ২ দিন এ সার্ভিস চলবে। সামনের দিনগুলোতে প্রয়োজনে সপ্তাহে ৩ দিন এই সার্ভিসটি চালু করার কথা রয়েছে।
২০০১ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিস চালু করার ব্যাপারে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৩ সালে এসে এই সমঝোতা বাস্তব রূপ নেয়। সেই সময় বাংলাদেশে ছিল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৪ দলীয় জোট সরকার। সুতরাং আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিসের সঙ্গে বিএনপি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। আগরতলা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারত ঘুরে রেলপথে কলকাতা পৌঁছাতে পনেরো শত কিলোমিটার অতিক্রম করতে হতো। আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিসে অতিক্রম করতে হয় মাত্র ৫০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ঢাকা হয়ে করিডর পাওয়ার ফলে ভারতীয় যাত্রীরা সময় এবং অর্থ বাঁচাতে পারছেন। দিনে দিনে আগরতলা থেকে কলকাতায় পৌঁছানো সম্ভব অথচ রেলযোগে ঘুরপথে কলকাতা পৌঁছাতে লাগত ৩ দিন।
বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ২-৪ দিনের মধ্যে আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিস চালু হওয়ায় বাংলাদেশের অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। তবে কি আমরা মনে করতে পারি ভারতীয় কূটনীতিকরা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির যে আশা প্রকাশ করেছিলেন, তা অচিরেই বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে? ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু ট্রানজিট বাস সার্ভিসের মধ্যেই সীমিত নয়। এই দুই দেশের মধ্যে অনেক সমস্যা রয়েছে। এগুলোর সমাধানে ভারত সরকার কখনই আন্তরিকতা দেখায়নি। সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি করে হত্যা, বাংলাদেশ থেকে পণ্যসামগ্রী ভারতে রপ্তানি করতে নানা ধরনের অশুল্ক বাধা। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি অন্ধ সমর্থন দিয়েছে ভারত, যার ফলে শেখ হাসিনা তিন তিনটি ভুয়া নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছে। এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারত প্রতিনিয়ত নাক গলাচ্ছে ও বাংলাদেশের ওপর দাদাগিরি বহাল রেখেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এসব চিন্তার পরিবর্তনের কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের স্বার্থে সড়ক পথে ট্রানজিট চালুর বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশেকে অন্য কোনো বিষয়ে ছাড় দিচ্ছে কিনা, তা এখনো জানা যাচ্ছে না। ২০১০ ও ২০১৫ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় ট্রানজিট চালু হয়েছে। এর ফলে ভারত কলকাতাকে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নদী, রেলপথ ও চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দর দিয়ে সরাসরি যুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে। উল্লেখ্য, ভারত গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের যাত্রী ও পণ্যসামগ্রী নেপাল ও ভুটানে পৌঁছানোর যে ট্রানজিট সুবিধা ছিল, তা বন্ধ করে দিয়েছে।
আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিস চালু হওয়ার পর ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ট্রানজিট সুবিধা বহাল হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দুদেশের সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত যে, তা যেন দেওয়া-নেওয়ার চক্রের মধ্যে চালু থাকে। বাংলাদেশ ভারতকে যদি কোনো সুবিধা দেয়, তার বিনিময়ে ভারতকেও সমমূল্যের সুবিধা দিতে হবে। ট্রানজিটের মতো বিষয় ভারতের আইনসম্মত ন্যায্য কোনো পাওনা নয়। কিন্তু অভিন্ন নদীর পানিতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আইনসম্মত অধিকার রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহ বন্ধ করে ভারত বাংলাদেশেকে মরুভূমিতে পরিণত করার জঘন্য প্রয়াসে লিপ্ত। এটা বন্ধুসুলভ, সৎ প্রতিবেশীমূলক আচরণ নয়। ভারত মনে করে, বাংলাদেশ তাকে সমীহ করে চলবে, বাংলাদেশকে যেভাবে হুকুম করে, সেভাবেই উঠবস করতে হবে। এরকম আধিপত্যবাদী মনোভাব সু-সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য অনুকূল নয়।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের নেতৃবৃন্দ আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিস চালু হওয়ায় বাংলাদেশেকে নিয়ে বেশ গালভরা বুলি আউড়িয়েছেন। বাংলাদেশের জনগণ গালভরা বুলি শুনে মুগ্ধ হবে না, তারা চায় সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিকতা ও উপকারী ফলাফল। আশা করা যায়, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক সত্যিকারার্থে আন্তরিকতাপূর্ণ হয়ে উঠবে। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, ১৯৪৭ থেকেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ভারতের সম্পর্ক আধিপত্যমূলক। এই মনোভাবে আমূল পরিবর্তন আসতে হবে।
আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিস থেকে বাংলাদেশ হয়তো ট্রানজিট ভিসা হিসাবে ২০০০ রুপি ভিসা ফি পায়। এতটুকুই বাংলাদেশের নগদ পাওনা। বিনিময়ে আরও কিছু দাবি করা যায় কিনা, তা ভেবে দেখতে হবে।
ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

