বিশ্ব মোড়লের অন্যায় আচরণ
Advertisement
মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.)
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রথমেই স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ শুরু করেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে এবং ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে স্ত্রীসহ অপহরণ করেছে-সবকিছুই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প ২০১৭ সালে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে আনেন। তিনি দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি যুদ্ধ নিয়ে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে, কঠোর সমালোচনা করেন এবং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তার প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার থেকে কমে আড়াই হাজারে নেমে আসে। ইরাক ও সিরিয়ায়ও সেনা কমানো হয়। ২০২০ সালে তালেবানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে তার নীতি অনেকের কাছে যুদ্ধ-পরিহারের প্রচেষ্টা হিসাবে প্রতীয়মান হয়। তবে বাস্তব চিত্র ছিল আরও জটিল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ২০১৫ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির মাধ্যমে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয়, যা দুই দেশের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করে। তবুও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়নি। অর্থাৎ প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ছিল চাপ সৃষ্টি, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ও নিষেধাজ্ঞা-কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সরাসরি যুদ্ধ নয়।
কিন্তু দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ করছেন, বিভিন্ন দেশ দখল ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাধুরোকে অপহরণ করার পর গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিউবা ও কলোম্বিয়াকে নেতৃত্ব পরিবর্তনের ভয় দেখান। বিগত ৮ মাস আগে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর ওপর আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্র। আবার ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে ৩-৪ দিন আগে ইরানের ওপর যৌথভাবে বড় ধরনের আক্রমণ শুরু করে এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ নেতাকে হত্যা করে। ইরানও তার জবাব দিয়েছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে। দুপক্ষের মাঝে হামলা-পালটাহামলা চলছেই। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জানমাল। আরব দেশগুলো আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়েছে, ইরান একা লড়ছে বিশ্বের দুই সন্ত্রাসী যুদ্ধবাজ শক্তির বিরুদ্ধে। চীন, রাশিয়া ও জাতিসংঘের অনুরোধ উপেক্ষা করে ট্রাম্প আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার শপথ ব্যক্ত করেছে। ইতোমধ্যে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য আমেরিকাকে সহায়তা দানের আগ্রহ ব্যক্ত করছে। অনেকে ৩য় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনার কথা বললেও আমি যুদ্ধটি অতদূর গড়াবে বলে মনে করি না। হয়তো এভাবে হামলা-পালটাহামলা চলতেই থাকবে। অনেক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হবে। একপর্যায়ে যুদ্ধবিরতি হবে কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবে মুসলিম দেশগুলো বেশি। কিন্তু এ ভয়াবহ যুদ্ধের পরবর্তী পরিণতি ও প্রভাব অনুভূত হবে ব্যাপকভাবে বিশ্বব্যাপী।
দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া বা শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য গ্রহণ করার বিষয়টি হলো এক মৌলিক কৌশলগত পরিবর্তন। ইতিহাস বলে, সামরিক শক্তির মাধ্যমে শাসন পরিবর্তন সব সময় স্থিতিশীলতা আনে না। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনকে অপসারণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং আইএসআইএসের উত্থান ঘটে। আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২ হাজার ৪০০-এর বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তালেবানই ক্ষমতায় ফিরে আসে। এ উদাহরণগুলো দেখায়, শাসন পরিবর্তন মানেই স্থায়ী স্থিতিশীলতা নয়।
ইরানের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বড়। ইরান সাড়ে ৮ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশ, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে, এবং লেবাননের হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। ভৌগোলিকভাবে ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের অবস্থানে-যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। যদি এ রুট ব্যাহত হয়, তবে বৈশ্বিক তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে-প্রতি ব্যারেল ১২০ থেকে ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতিকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরান ধীরে ধীরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণ করেছে, যা অস্ত্র-গ্রেড ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঘোষণা দেয়নি। সামরিক হামলার মাধ্যমে পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা গেলে তা হয়তো কর্মসূচিকে বিলম্বিত করতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা কঠিন; কারণ স্থাপনাগুলো বিস্তৃত ও সুরক্ষিত। যদি ইরানের নেতৃত্ব কাঠামোর ওপর হামলা হয়, তবে তার প্রতিক্রিয়া অনিশ্চিত হবে। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সমন্বয়ে গঠিত। বাহ্যিক হামলা অভ্যন্তরীণ বিভাজন কমিয়ে জাতীয় ঐক্যকে জোরদারও করতে পারে। ইতিহাস দেখায়, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বহিরাগত চাপ প্রায়ই জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়।
আঞ্চলিক উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহর, কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটিগুলো সম্ভাব্য পালটা হামলার লক্ষ্য হতে পারে। লেবানন থেকে ইসরাইলের দিকে রকেট হামলা বাড়তে পারে। সাইবার যুদ্ধের ঝুঁকিও বাড়বে, বিশেষত জ্বালানি অবকাঠামো ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর। বিশ্ব শক্তিগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। চীন উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও প্রভাব পড়বে। ইতিহাসে দেখা গেছে, যুদ্ধের শুরুতে জনমত সাময়িকভাবে সরকারের পক্ষে থাকে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে সমর্থন কমে যায়, যেমন ইরাক যুদ্ধে দেখা গেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সামরিক শক্তি কি স্থায়ী সমাধান দেয়, নাকি অস্থিরতার নতুন চক্র সৃষ্টি করে? গত দুই দশকের মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা দেখায়, ক্ষমতার শূন্যতা প্রায়ই অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিকে শক্তিশালী করে। শাসন কাঠামো ভেঙে গেলে পুনর্গঠন অত্যন্ত কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো তাদের দেশের অভ্যন্তরে আমেরিকার সামরিক স্থাপনা তৈরি করে তাদের জায়গা করে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি সঞ্চয়ের এবং ওই অঞ্চলে খবরদারি করার জন্য। আমেরিকা বারবার বিভিন্ন অজুহাতে বিভিন্ন মুসলিম দেশকে আক্রমণ করে জানমালের ক্ষতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং দেশকে ধ্বংস করার প্রয়াস পাচ্ছে। আরব দেশগুলোর বোঝা উচিত গতকাল সেটা ছিল হয়তো ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান বা সিরিয়া, কিন্তু আগামীকাল সেটা হতে পারে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান বা আরব আমিরাত। যত শিগগির তারা বিষয়টি অনুধাবন করবে এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে একটি শক্তিশালী তৈরি করবে ততই মঙ্গলজনক হবে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বড় আকারের যুদ্ধ ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে। তেহরানের মতো জনবহুল শহরে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শরণার্থী সংকট সৃষ্টি হতে পারে। শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হলে আঞ্চলিক অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে। অতএব, কৌশলগত শক্তি প্রদর্শন যে অপ্রয়োজনীয়, তা নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির উপস্থিতি প্রায়ই প্রতিরোধ (deterrence) সৃষ্টি করে, যা সম্ভাব্য আক্রমণ বা আগ্রাসনকে নিরুৎসাহিত করে। একটি রাষ্ট্র যদি সম্পূর্ণভাবে দুর্বল অবস্থান নেয়, তাহলে প্রতিপক্ষ তা সুযোগ হিসাবে নিতে পারে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যুদ্ধ শুরু করার সময় রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো সাধারণত পরিষ্কার থাকে। কিন্তু যুদ্ধের প্রকৃতি গতিশীল; ময়দানের বাস্তবতা, অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধ, তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততা, জনমত, অর্থনৈতিক চাপ-এসব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল সীমিত কূটনৈতিক সংকট থেকে; কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ নেয়। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল দ্রুত শাসন পরিবর্তন ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হুমকি দূর করা; কিন্তু বাস্তবে তা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে গড়ায়।
অবশেষে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় শুধু যুদ্ধ জয়ের মধ্যে নয়; বরং সংঘাত এড়িয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত। সামরিক শক্তির দরকার হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া তা অসম্পূর্ণ। শান্তি দুর্বলতার প্রতীক নয়; বরং অনেক সময় সেটিই সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.) : ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
