Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সবুজ অর্থায়নের ভূমিকা

Advertisement

Icon

অরুন কুমার চৌধুরী

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সবুজ অর্থায়নের ভূমিকা

Advertisement

ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির নতুন বাংলাদেশ দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করলেও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশে সবুজ অর্থায়ন (গ্রিন ফিন্যান্স) একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং উদীয়মান ধারণা, যা পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং নবায়নযোগ্য প্রকল্পে বিনিয়োগ করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। তরুণ উদ্যোক্তারা সবুজ প্রযুক্তি বা পরিবেশবান্ধব ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে পারেন, যেমন ইকো-ফ্রেন্ডলি পণ্য উৎপাদন বা কার্বন নিরপেক্ষ প্রকল্প। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন বিশেষায়িত ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সবুজ প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করছে।

সবুজ অর্থায়ন বলতে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ বোঝায়। এটি এমন একটি অর্থায়ন ব্যবস্থা, যা পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে এনে নবায়নযোগ্য শক্তি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, টেকসই কৃষি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নকে উৎসাহিত করে। এর মূল লক্ষ্য হলো কার্বন নিঃসরণ কমানো, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা। ১৯৯১ সালে, নেদারল্যান্ডসের ট্রায়োডস ব্যাংক প্রথমবারের মতো পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ শুরু করে। এরপর ২০০৭ সালে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) প্রথম ‘সবুজ বন্ড’ ইস্যু করে, যা নবায়নযোগ্য শক্তি ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য তৈরি হয়। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংক প্রথমবারের মতো সবুজ বন্ড ইস্যু করে, যা গ্রিন ফাইন্যান্সের বিশ্বব্যাপী প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সবুজ বিনিয়োগের গুরুত্ব বাড়ে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব। এ ছাড়া সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের চালিকাশক্তি তরুণদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ক্লিন এনার্জি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে এবং এ খাতে তরুণদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করবে। সবুজ কৃষি ও নবায়নযোগ্য শক্তি সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো গ্রামে বিনিয়োগ বাড়িয়ে সেখানেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

তরুণ উদ্যোক্তারা হলো একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তবে বাংলাদেশে অনেক তরুণের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ থাকলেও প্রয়োজনীয় পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতার অভাবে তারা সঠিকভাবে এগোতে পারেন না। পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ তৈরিতে সবুজ অর্থায়ন এ বাধাগুলো দূর করতে সাহায্য করতে পারে। বর্তমানে দেশে কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সবুজ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ ও প্রণোদনা দিচ্ছে। যেমন, বাংলাদেশ ব্যাংক ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ চালু করেছে, যার আওতায় পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হয়। এ ধরনের উদ্যোগ তরুণদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জৈব কৃষি, পুনর্ব্যবহার, ইকো-ট্যুরিজম ইত্যাদি ক্ষেত্রে নতুন স্টার্টআপ গঠনে সহায়তা করে।

বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা বাড়ার কারণে এখন পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ফলে তরুণরা যদি সবুজ পণ্য উৎপাদন বা পরিবেশবান্ধব সেবা প্রদান করতে পারে, তবে তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটবে এবং দেশে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। এ প্রসারে সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে প্রাথমিক পুঁজি সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সবুজ অর্থায়নের অংশ হিসাবে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন, জৈব চাষ, সোলার প্যানেল স্থাপন, সবুজ ভবন ডিজাইন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে দক্ষতা গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি তরুণদের উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত করে।

সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি বিশাল সুযোগ রয়েছে। নিচে কয়েকটি ক্ষেত্র তুলে ধরা হলো, যেখানে সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব-

১. নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত : সোলার প্যানেল, বায়ু টারবাইন, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ইত্যাদি খাতে সবুজ অর্থায়ন বাড়ালে নতুন নতুন প্রকল্প স্থাপিত হবে, যার ফলে প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, ইনস্টলার ও মেইনটেন্যান্স কর্মীর জন্য ব্যাপক চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

২. পরিবেশবান্ধব কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ : জৈব সার, কীটনাশকমুক্ত চাষ, পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সবুজ অর্থায়ন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা ও কৃষি শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

৩. সবুজ নির্মাণ ও অবকাঠামো : সবুজ ভবন নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিক, প্রকৌশলী, ডিজাইনার ও নির্মাণ কর্মীদের প্রয়োজন হয়। সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে এ খাতগুলোর উন্নয়ন হলে লক্ষাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

৪. রিসাইক্লিং ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহারে উৎসাহ দিলে এ খাতে ছোট-মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরি হবে, যারা স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। প্লাস্টিক, কাচ, কাগজ ও ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কম দক্ষ তরুণদের জন্যও চাকরির সুযোগ তৈরি হবে।

দেশের বেকার যুবদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণ ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষে প্রতিষ্ঠিত কর্মসংস্থান ব্যাংক সম্প্রতি দেশের সচেতন যুব সমাজের মাঝে কর্মসংস্থান তৈরির উদ্দেশ্যে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে গ্রিন ফ্যাইন্যান্সিং স্কিম চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যেখানে সহজ শর্তে ও বিশেষ সুবিধা প্রদান করে সবুজ উদ্যোগে অর্থায়ন করা হবে।

তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবুজ অর্থায়ন বাস্তবায়নে বেশ কিছু বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যার মধ্যে তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে সবুজ প্রযুক্তি ও ব্যবসা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ঘাটতি, সবুজ প্রকল্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনাগ্রহ, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বয়ের অভাব ইত্যাদি অন্যতম।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মোটাদাগে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে-

* শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে সবুজ উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়ে কোর্স চালু করা;

* তরুণরা যাতে সহজে সবুজ অর্থায়নের তথ্য ও আবেদন পদ্ধতি জানতে পারে, সেজন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা;

* সরকারকে অবশ্যই সবুজ অর্থায়নের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করা;

* বেসরকারি খাত, এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় যৌথভাবে প্রকল্প গ্রহণ।

সবুজ অর্থায়ন বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষা করে না, বরং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দেয় এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে তরুণদের সংখ্যা ও উদ্যমকে কাজে লাগিয়ে সবুজ অর্থায়নভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুললে ভবিষ্যতে আমরা একটি পরিবেশবান্ধব, উদ্ভাবনী এবং কর্মসংস্থান সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণ করতে পারব। এজন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা, যথাযথ নীতি সহায়তা ও সবার সম্মিলিত প্রয়াস।

অরুন কুমার চৌধুরী : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কর্মসংস্থান ব্যাংক

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারি ফাঁস

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারি ফাঁস

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আস্থার সংকট

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আস্থার সংকট

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম