Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারি ফাঁস

Advertisement

Icon

অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারি ফাঁস

Advertisement

কিছুদিন আগেই বলেছিলাম, দিনকাল ভালো নয়। বিশেষ করে এই জেন-জি আন্দোলনের পর থেকে মিডিয়ার আকাশেও কেমন যেন টক টক গন্ধ। তো আজকে দুটো বিখ্যাত মিডিয়ায় ছাপা একটা খবর আর একটা সম্পাদকীয় নিয়ে আলোচনা করব, মন দিয়ে শুনুন। বুঝতে পারবেন দেশে গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন’, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আপাতত গড়ের মাঠে ঘাস খেতে গেছে।

ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন যে ব্যাপারটা আমাদের সামনে ছিল, অন্তত তার ধারণা ছিল, সেটা আর নেই। এমন নয় যে, এলাকার কিছু বদমাইশ, গুন্ডা, কিছু ভূতে ছাপ্পা ভোট দিচ্ছে, কোথাও ছোটখাটো গন্ডগোল করছে, কোথাও বুথ জ্যাম করছে, এরকম নয়। কোটি কোটি ভোট একসঙ্গে লোপাট করে দিয়ে গোটা নির্বাচনের চেহারাটাকে পালটে দিচ্ছে।

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে’ প্রথম পাতায় এক্সক্লুসিভ খবর-যেখানে তারিখ আর সময় আর বিষয় ধরে ধরে বোঝানো হয়েছে, ভারতের নির্বাচন কমিশন এখন একজন দালালের হাতে চলে গেছে। তিনি যা করছেন, আপাতত সেটাই নিয়ম, সেটাই নির্বাচন, সেটাই নিরপেক্ষতা। এই প্রতিবেদন সাফ বলে দিচ্ছে, ভোটার তালিকায় সুপরিকল্পিতভাবে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। একেবারেই ছক কষে। কোথাকার নাম বাদ দেওয়া হবে, কী নাম বাদ দেওয়া হবে, তার জন্য একটা এজেন্সি কাজ করেছে, অবশ্যই সে এজেন্সিটা নির্বাচন কমিশনের নয়। কাদের-তা বলা বাহুল্য। তারা খুব ধরে ধরে এলাকার এরকম ধরনের নামগুলো তৈরি করেছে এবং তারপরে সেই নাম বাদ দিয়েছে। কিছু নাম ঢোকানো হয়েছে এসআইআরে, পরের নির্বাচন আর যাই হোক, কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচন হতেই পারে না এভাবে।

২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে নির্দেশ দিয়েছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার আর অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগের জন্য একটা নির্বাচন কমিটি তৈরি করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট বলছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলের নেতা, ভারতের প্রধান বিচারপতি থাকবেন। সুপ্রিম কোর্টই রায় দিচ্ছে। এই রায় অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। একধারে প্রধানমন্ত্রী, একধারে বিরোধী দলনেতা এবং ধরে নেওয়া যায়, আমাদের মাননীয় বিচারপতি যিনি সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস, তিনি একটা নিরপেক্ষ ভূমিকা নেবেন।

কিন্তু এ রায়ের কার্যকারিতা, বলা যায় এই রায়টার স্পিরিটকে, মূল বিষয়টাকে একেবারেই নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য কেন্দ্র সরকার আলাদা করে ২০২৩ সালে একটা আইন আনলো। সুপ্রিম কোর্টের রায় তো মেনে নিতে হবে, কিন্তু যদি আইন হয়ে যায় নতুন করে, তাহলে সে রায় মানার আর কোনো দায় রইল না। এই নতুন আইনে বলা হলো, প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে একজন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে বসানো হলো।

তাহলে দাঁড়ালোটা কী? এর ফলে নির্বাচন কমিটির মধ্যে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ২:১ হয়ে গেল, যা কার্যত নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসছে। মানে সরকার যাকে চাইবে তাকেই চিফ ইলেকশন কমিশনার বা ইলেকশন কমিশনার বানাবে। আর সেই তিনি এক অনুগতজন হতেই পারেন, যিনি বিরোধী দলনেতার আনা অভিযোগের তদন্ত না করে সাংবাদিক সম্মেলনে দেশের সংসদের বিরোধী দলনেতাকে বলবেন, ‘অ্যাফিডেভিট করুন তারপরে দেখব।’

এ ঘটনাটা শুধু একটা প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এটা একটা সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ, যা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ব্যবস্থাকে ভেঙে খান খান করে দিয়েছে। গণতন্ত্রে আমার ভোট যদি চুরি হয়ে যায়, তাহলে সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ওপর আমার কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। আর দায় না থাকলে দেশের প্রতি ভালোবাসা উবে গেলে পড়ে থাকে একটা মানচিত্র, আর মানচিত্র তো মানচিত্র, মানচিত্র কখনো দেশ হতে পারে না।

ভোট লুট হচ্ছে। জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে একটা চক্র কাজ করছে। আমরা এই কথাগুলো বলেছিলাম। আজ তার তথ্যগুলো সামনে এসে হাজির হলো। নির্বাচন কমিশনের দুজন সদস্য গত ১০ মাসে ১৪টা ইমেল পাঠিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের কাছে, এমনকি ক্যাবিনেট সেক্রেটারির কাছে। তারা গিয়ে দেখা করছেন, কেন? তাদের বক্তব্য চিফ ইলেকশন কমিশনার তার নিজের ইচ্ছামতো কাজ করছেন, তাদের আপত্তি কানেও নিচ্ছেন না।

এবার আসুন দেখা যাক তাদের অভিযোগগুলো মূলত কী নিয়ে। এক. তাদের দুজনের বক্তব্য ভোটারের নাম যুক্ত করা বা বাদ দেওয়া বিষয়ক সিদ্ধান্ত থেকে তাদেরকে আলাদা রাখা হয়েছে, মানে এ ব্যাপারে তাদের কিছু জানানো হয়নি, তারা অন্ধকারে ছিলেন। কী অপূর্ব ব্যাপার তাই না? মানে ওই জ্ঞানেশ কুমারই ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া বা যোগ করা থেকে এই দুজন নির্বাচন কমিশনারকে বাদ দিয়েছিলেন। কেন? কেন তাদের কথা শোনা হলো না? কেন গোপন কম্ম সাধ-কোন গোপন কম্ম সাধনের জন্য তাদের অন্ধকারে রাখা হলো?

আমরা বহুবার বলেছি, এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার, চিফ ইলেকশন কমিশনার মিডিয়াকে, মানুষকে কিছু জানাচ্ছেন না। জানাচ্ছেন না বলেই মনে হচ্ছে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’, এখন জানা গেল তিনি বাকি যে দুজন নির্বাচন কমিশনার, তাদেরকেও কিছু জানাননি। মানে ভোটার লিস্টে যোগ হচ্ছে বা বাদ দেওয়া হচ্ছে, প্রসেসটা কী? তিনি জানাচ্ছেন না বাকি দুজনকে।

দ্বিতীয় অভিযোগ হলো-গোটা ব্যবস্থাটা চলে গেল দিল্লিতে। মানে ইচ্ছাখুশিমতো নাম যোগ করো, বাদ দাও-সবটাই ছিল ওই জ্ঞানেশ কুমারের অধীনে-জানিয়ে এই দুজন নির্বাচনি কমিশনার বারবার তাদের আপত্তি জানিয়েছেন-এক. ডিসেন্ট্রালাইজড সিস্টেমকে কেন একেবারে সেন্ট্রালাইজড সিস্টেম করা হলো? কিভাবে এখনো পর্যন্ত ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়লো, তা আমি, আপনি, মিডিয়া, বিরোধী দল বা মানুষ বাদই দিন, বাকি দুজন নির্বাচন কমিশনারও জানতেন না। সেটাই তারা চিঠিতে লিখে জানিয়েছেন। সেই চিঠি ফাঁস হয়েছে।

‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ‘The ECI is functioning as a tool of the Bharatiya Janata Party in West Bengal’, যার বাংলা অনুবাদ-ভারতের নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির হয়ে কাজ করছে। জিজ্ঞাসা চিহ্ন, কোটেশন-এসব কিছু না। সম্পাদকীয়তে সরাসরি দলের স্বীকৃতি আর প্রতীক সংরক্ষণ নিয়ে এই কথাগুলো বলা হয়েছে।

তাই বলছিলাম, জাতীয় সংবাদমাধ্যম যারা দেশের রাজনৈতিক হাওয়া খানিক আগেই টের পায়, যারা দেশের ক্ষমতার অলিন্দে অবাধ বিচরণের ফলেই খানিকটা বেশি খবর রাখে, তারা ঘুরছে, তারা অন্য সুরে কথা বলছে। এসব দেখে মনে হচ্ছে, একটা ইন্টারেস্টিং সময় আসতে চলেছে সামনে।

বাংলা বাজার ইউটিউব চ্যানেলের সৌজন্যে

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : ভারতীয় সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারি ফাঁস

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারি ফাঁস

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আস্থার সংকট

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আস্থার সংকট

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম