Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব

Advertisement

Icon

ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

বর্তমানে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চলসহ রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা আরাকান আর্মির (এএ) নিয়ন্ত্রণে; তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চকপিউ ও সিতওয়ে বন্দর এখনো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দখলে রয়েছে এবং তা রক্ষায় বিমান ও নৌ হামলা জোরদার করেছে। এ দুই বন্দর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে পুরো রাখাইন রাজ্য এএ-এর দখলে চলে যাবে। একটি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বাধীন রাখাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই এএ-এর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। মিয়ানমারের সরকার এএ-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে ঘোষণা করলেও রাখাইনে তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এএ-এর রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ) বর্তমানে রাখাইনে একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করছে। তাদের নিজস্ব পুলিশ ও নিরাপত্তা কাঠামো, আদালত ও বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা রয়েছে। এএ-এর রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্ভাব্য নতুন প্রশাসনিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।

এএ-এর অধিকৃত অঞ্চল থেকে তাদের অত্যাচারের কারণে রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে আসছে কিংবা মিয়ানমার ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এএ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের বদলে আরও নিষ্ঠুর আচরণ করছে বলে জানা যায়। এএ প্রকাশ্যে রোহিঙ্গাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতার কথা বললেও রাখাইনে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের থেকে জানা যায়, এএ তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হাত দিয়েছে। তারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা চালু করছে, যা ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থি। একই সঙ্গে এএ রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের চলাচলের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। রোহিঙ্গাদের জীবিকা অর্জনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এবং চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করার কারণে তাদের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

রাখাইনে এএ-এর বিরুদ্ধে পুরো পরিবারকে নির্বিচারে গ্রেফতার, সম্মিলিত শাস্তি, যৌন সহিংসতা এবং বাড়িঘর এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এএ রোহিঙ্গাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং অবৈধ ও বৈষম্যমূলক কর আরোপের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে দিচ্ছে। এএ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের কারণে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছাড়ছে এবং অনেকে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ খুঁজছে। বিদ্যমান পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইউএলএ যদি ন্যায়বিচার এবং বৈধতা চায়, তবে তাদের রাখাইনে বসবাসকারী সব জাতিগত গোষ্ঠীর সঙ্গে সমান আচরণ এবং নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে।

রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নিপীড়নের জন্য এএ মিয়ানমার জান্তা সরকারকে দায়ী করলেও রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনে রাখাইন জনগোষ্ঠী ও এএ-এর সম্পৃক্ততা ছিল। এএ-এর মুখপাত্র জানায়, ভবিষ্যৎ রাখাইন রাষ্ট্রে সব জাতিগোষ্ঠীর নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেবে এবং রাখাইনে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে। অতীতের গণহত্যা ও নির্যাতনের বিচার তারা তাদের নিজস্ব আদালতে করবে বলে জানায়। শুধু নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিলেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থানও নিশ্চিত করতে হবে।

এএ তাদের সামরিক শক্তির পাশাপাশি একটি বিস্তৃত মাদক অর্থনীতির মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত করছে। তাদের বৈধ অর্থনৈতিক আয়ের উৎস না থাকায় ইয়াবা ও আইস পাচার তাদের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। এ অর্থই সংগঠনটি অস্ত্র সংগ্রহ, খাদ্য ও রসদ সরবরাহ এবং স্থানীয় প্রশাসন, ট্যাক্সব্যবস্থা ও বিচার কাঠামো পরিচালনায় ব্যয় করছে। সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক ও চোরাচালানের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত। প্রতিমাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি ইয়াবা নাফ নদী, সাগরপথ এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের আনুমানিক ৬৫ পয়েন্ট ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে মানব ও অস্ত্র পাচারের অভিযোগও রয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ, মাদক ও চোরাচালান রোধে সীমান্তে কড়া পাহারা ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে। বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় মাদক উদ্ধার, পণ্য পাচার ও স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো এ এলাকায় প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এএ, আরসা ও আরএসওর মধ্যে ত্রিমুখী গোলাগুলি ও মর্টার শেলের বিস্ফোরণে বান্দরবানসংলগ্ন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও চোরাচালান রুট দখলকে কেন্দ্র করেই এসব সংঘর্ষের সূত্রপাত হচ্ছে। কোস্ট গার্ড ও বিজিবি এসব এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা বৃদ্ধি করে মাদক-সন্ত্রাস মোকাবিলা সম্ভব হবে না। আঞ্চলিক সহযোগিতা, সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশল এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়ে এ মাদক নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এএ-এর সহিংসতার কারণে সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এএ-এর বাংলাদেশি জেলেদের অপহরণ ও পানিসীমা লঙ্ঘনে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া এখন জেলেদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে, নাফ নদে এএ’র অনুপ্রবেশ ও জেলেদের অপহরণের ফলে হাজার হাজার জেলে পরিবার কর্মহীন হয়ে পড়েছে, তাদের জীবিকা এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে এবং স্থানীয় অর্থনীতি, খাদ্য সরবরাহ ও মৎস্য খাত মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশকে তৎপর হতে হবে।

সংঘাতের কারণে রাখাইন অঞ্চলে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে খাদ্য ও অর্থ সংকট মোকাবিলায় এএ সীমান্তে তৎপরতা বাড়িয়েছে। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকায় রাখাইনে ভারতের মিজোরাম সীমান্ত হয়ে চাল, তেলসহ নিত্যপণ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে যেতে পারছে না। এএ নিয়ন্ত্রিত রাখাইনের ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ থেকে স্থল ও নৌপথে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মিয়ানমারে পাচার করছে। বিনিময়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সীমান্তে পণ্য পাচার ও মাদক বিনিময় এখন বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য চালু এবং সীমান্তে স্থিতিশীলতা নিশ্চিতসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে এএ বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী বলে জানা যায়।

চলমান প্রেক্ষাপটে এএ-কে প্রথমে রাখাইনে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। আরাকান আর্মিকে রাখাইন সম্প্রদায়ের বিষয়ে রোহিঙ্গাদের যে অবিশ্বাস ও ভীতি রয়েছে, তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের চলাচল, জীবিকা অর্জন, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অন্যান্য মানবিক অধিকার নিশ্চিতে বিরাজমান বাধাগুলো দূর করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অস্ত্র পাচার বন্ধে এএ-কে আরও তৎপর হতে এবং বাংলাদেশের পানিসীমা থেকে জেলেদের অপহরণ বন্ধ করতে হবে। এএ বাংলাদেশের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের বিষয়ে আলোচনা করে বাণিজ্য সহজ করার মাধ্যমে চোরাচালান বন্ধের ব্যবস্থা নিতে পারে। রাখাইনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না পেলেও চলমান পরিস্থিতিতে এএ তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গা ও রাখাইন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার ব্যবধান গুছিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারে। রাখাইনে রোহিঙ্গা ও রাখাইন সম্প্রদায়ের মধ্যকার বিভেদ দূর হলে সামনের দিনগুলোয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সহজ হবে।

ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন : মিয়ানমার ও রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

দিল্লিতে কী হচ্ছে

দিল্লিতে কী হচ্ছে

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

হালফিল বয়ান ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম