Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

সমস্যা হলে একটু বুঝে চলতে হয়

Advertisement

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সমস্যা হলে একটু বুঝে চলতে হয়

Advertisement

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে; ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশেও এর আঁচ লাগতে শুরু করেছে। এমনিতেই দেশের অর্থনীতি একটা ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে রয়েছে, তার ওপর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এ ভঙ্গুরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজস্ব আদায় কম, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা, ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের অচলাবস্থা-সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি নিয়ে আশঙ্কার মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। যুদ্ধের প্রভাবে সব ধরনের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে চাপে পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। দেশের অর্থনীতির এ শঙ্কা কাটাতে অনেকে ট্যাক্স বাড়ানোর কথা বলছেন। প্রশ্ন হলো, ট্যাক্স কোথা থেকে বাড়াবে? কারণ ইকোনমি স্লোডাউন হলে রাজস্ব সংগ্রহেও ঘাটতি দেখা দেয়। সুতরাং, চাইলেই রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব নয়। উচ্চ সুদে উচ্চ রাজস্ব নির্ধারণ করা, এটি কোনো সমাধান নয়। লো ইন্টারেস্টে লো ট্যাক্স রিজিম হলে ভালো। সাধারণত লো ইন্টারেস্টে লো ট্যাক্স রিজিমেই ইকোনমি এক্সপান্ড করে। এটি আমাদের বুঝতে হবে এবং সেভাবেই এগোতে হবে। তবে এখন যেটা করা যেতে পারে, সেটা হলো, সরকারের পরিচালন ব্যয় যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখা। অবশ্য সরকার সেভাবেই পথচলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, সেটা হলো, টাকার অভাবে চলমান প্রকল্পগুলো যেন বন্ধ রাখা না হয়। চলমান প্রকল্পগুলো বন্ধ রাখলে সরকার একটা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বে। কেননা প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ রাখলে টাকার প্রবাহ কমে যায়। অর্থাৎ লোকের হাতে টাকা প্রবাহিত হয় না। আর লোকের হাতে টাকা প্রবাহিত না হলে ডিমান্ড যেখানে আছে, সেটা আরও সংকুচিত হতে থাকে। ফলে অর্থনীতি আশানুরূপ এগোতে পারে না। এখন একটু মূল্যস্ফীতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে সঙ্গে যদি চাহিদাটাও প্রকট হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে, বিনিয়োগ বাড়ে, তাহলে জনগণ মূল্যস্ফীতি সহ্য করে নেবে। কিন্তু শুধু মূল্যস্ফীতি হলো, কর্মসংস্থান বাড়ল না, বিনিয়োগ বাড়ল না, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হারও শূন্যের কোঠায় চলে যায়, তাহলে এটি খুবই ক্ষতিকর হবে আমাদের জন্য। যদি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার বাড়ে, কর্মসংস্থান বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতি ঠিক আছে। এটাই হচ্ছে অর্থনীতি বিজ্ঞানের শিক্ষা।

সুদের হার কমানো রেপো রেট, পলিসি রেট কমানো উচিত। এর সঙ্গে রেভিনিউ বাজেটকে ছোট রাখতে হবে। রেভিনিউ বাজেটকে ফাইন্যান্সিং করার জন্য ইতঃপূর্বে যে ঋণ আমরা করেছি, সেটাকে আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। বিশ্বব্যাংক, এডিবি-এদের থেকে ঋণ নিতে পারলে ভালো হয়। কারণ এদের ঋণের সুদহার কম। প্রকল্পের কার্যক্রম যেহেতু একটু দীর্ঘমেয়াদি হয়, ফলে সুদহার যদি কম থাকে, তবে সেটা আমাদের জন্য মঙ্গলময়। সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট আর বাইলেটারাল ঋণ অনেক সময় আমাদের সহ্যের মধ্যে থাকে না। তাছাড়া আমাদেরও দোষ আছে। একে তো প্রকল্পের কাজে ধীরগতি, তার ওপর প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরও সেটা নিয়ে কালক্ষেপণ করা হয়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল আমরা এক বছর বসিয়ে রেখেছি। এই এক বছর বসিয়ে রাখার ফলে এটা মেইনটেন্যান্স করতে গিয়ে সরকারের অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এখন এটার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে। যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছে জাপানি কনসোর্টিয়াম। এ লক্ষ্যে সরকার ও জাপানি প্রতিনিধিদের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। তবে আলোচনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব বণ্টন কাঠামো। সংশোধিত প্রস্তাবে জাপানি কনসোর্টিয়াম যাত্রীপ্রতি রাজস্বের ২২.৫ শতাংশ দাবি করেছে। একই সঙ্গে কার্গো খাতে তারা ২২.৫ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব চেয়েছে। প্রস্তাবে আরও যুক্ত করা হয়েছে ‘ঝুঁকি ভাগাভাগি মডেল’। কনসোর্টিয়ামের পক্ষ থেকে এই কাঠামোকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে দেশের বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের প্রস্তাব উদ্বেগজনক। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে যাত্রীপ্রবাহ বা কার্গো চাহিদা প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। বিশেষ করে জাইকার ঋণের বোঝা মাথায় রেখে এ ধরনের দায়ভার নেওয়ার বিষয়টি নতুন সরকারের জন্য চিন্তার বিষয়। এ অবস্থায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাংলাদেশ সরকার আবারও কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে সংশোধিত প্রস্তাব আহ্বান করেছে।’ আসলে তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী আমাদের দেখতে হবে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে আমাদের যাতে ফার্দার কোনো ব্যয় করতে না হয়। এর পরিচালনা ব্যয় যদি ওরা বেশি চায়, তাহলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডার আহ্বান করা যেতে পারে। যেহেতু জাপানিরা থার্ড টার্মিনালের কাজ করেছে, সেহেতু জাপানিদের এ ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতেই পারে। ওটা থেকে যদি আমাদের লাভ হয় এবং ওটা থেকে যদি নতুন করে আমাদের কোনো ব্যয় করতে না হয়, তাহলে তাদের সঙ্গে অ্যাগ্রিমেন্টে যেতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বিমান কর্তৃপক্ষকে এ দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে আমি নই। কারণ, তাদের ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আর সে অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। নিউমুরিং টার্মিনালের ব্যাপারেও একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিত। নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বও ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডার আহ্বান করে বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে। তবে ওটা বিদেশিদের হাতে গেলে আমি কোনো অসুবিধা দেখি না। সারা পৃথিবীতেই বিদেশিদের দিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করা হচ্ছে। তাহলে আমাদের অসুবিধা কোথায়? এগুলো তো আমাদের দেশের কোম্পানির হাতে ছিল। এ ব্যাপারেও আমাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। পণ্য খালাস করতে ১২ দিন লাগে। যারা এর বিরোধিতা করে, তারা চার দিনে মাল খালাস করে দেখাক না। দেশের ইন্টারেস্ট সার্ভিসিং করতে গেলে তো আমরা এগোতে পারব না। আসলে দেশের কায়েমি স্বার্থবাদীরা এটাকে বছরের পর বছর জিম্মি করে রেখেছে। দেশে ভালো কিছু হোক, তারা তা চায় না। সুতরাং, এসব ক্ষেত্রে সরকারের দূরদর্শিতার প্রয়োজন।

আর একটি বিষয় না বললেই নয়। সেটা হলো, সরকারের হাতে যথেষ্ট আইডল রিসোর্স রয়েছে, যেগুলো খুব একটা কাজে আসছে না। সুতরাং, এগুলো ফেলে রেখে কোনো লাভ নেই। সরকারের হাতে পড়ে থাকা এসব আইডল রিসোর্সগুলো শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বিক্রয় করে দেওয়া উচিত। নতুন করে রেজ্যুলেশন করে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে এগুলো বিক্রি করা যায়, বন্ড ইস্যু করে বিক্রি করা যায়। এতে করে সরকারের হাতে টাকা আসবে।

শেয়ারবাজারে কোন কোন কোম্পানি ভালো, এগুলো ইতোমধ্যেই আইডেন্টিফাই করা হয়েছে। সুতরাং, এগুলো নিয়ে নতুন করে আশা করা যায়। শেয়ারবাজার নিয়ে আরেকটি খুশির খবর হলো, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা স্টেট মিনিস্টার র‌্যাংকের একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে পুঁজিবাজারের ব্যাপারে উনি যথেষ্ট পরিমাণ অভিজ্ঞ। বেশ অনেক দিন তিনি বিদেশে ছিলেন। প্রকৃত শেয়ারবাজার কীভাবে ডেভেলপ করা যায়, এ ব্যাপারে তার যথেষ্ট পরিমাণ জ্ঞান আছে। সামনে তাকে নিয়ে আমরা সবাই আশাবাদী। আশা করি, শেয়ারবাজারে আলোর দেখা মিলবে। প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, কথা বলেছেন। এ বৈঠকে ব্যবসায়ীদের সুবিধা-অসুবিধার কথা উঠে এসেছে। এটার প্রয়োজন ছিল। আশা করছি, ব্যবসা বাণিজ্যেও একটা গতি আসবে।

চলমান প্রকল্পের পাশাপাশি ব্রিজ, কালভার্টের মতো বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষ যখন দেখবে, সরকার বোল্ডলি ও সিনসিয়ারলি এগোতে চাচ্ছে, তখন অর্থনীতির আপাতত দুরবস্থা দেখলেও মানুষ সহ্য করবে, এর প্রশংসা করবে। কিন্তু সরকার কিছু না করে সময়ক্ষেপণ করলে সমস্যা আমাদের বাড়বে, বৈ কমবে না। এজন্য আমাদের অর্থনীতি যাতে আর নিুমুখী না হয়, এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। সরকারের অলস পড়ে থাকা রিসোর্সগুলো বিক্রি করলে সরকারের হাতে অর্থ এসে যাবে, ট্রেজারে ডেভেলপমেন্ট বাজেট ফান্ডিং করা যাবে, আরও নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়া যাবে। তখন মানুষের হাতে টাকা যাবে, ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা এমপ্লয়মেন্ট জেনারেট করবে। ফলে অর্থনীতি চাঙা হবে। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, অর্থনীতিকে চাঙা করা, নিুমুখিতার দিকে ঠেলে দেওয়া নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনীতি যদি মৃত অবস্থায় থাকে এবং নিুমুখিতার দিকে যায়, সেটা হবে বেদনাদায়ক। আমরা কখনই সেটা চাই না। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)

অধ্যাপক আবু আহমেদ : অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

দৃষ্টিপাত সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম