Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

জনগণের করের টাকায় শ্বেতহস্তী কেন পোষা হবে

Advertisement

Icon

মহিউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একটা নিয়ম আছে, সরকারকে প্রতিবছর বাজেট দিতে হয়। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রীতি অনুযায়ী, বাজেট উত্থাপন করতে হয় জাতীয় সংসদে। সংসদে বাজেট পাশ করাতে না পারলে সরকার টেকে না। বাংলাদেশে এ অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি।

আমাদের অর্থবছর হলো জুলাই থেকে জুন। নিয়ম করে প্রতিবছর জুনে সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। শুরুর দিকেই উত্থাপন করা হয় বাজেট। জুনের বাকি দিনগুলোতে এ নিয়ে কাটাছেঁড়া চলে। কিছু পরিমার্জন হয়। তারপর এটি সংসদে অনুমোদিত হয়। জুলাই থেকে চলে তার বাস্তবায়ন।

বাজেট হচ্ছে আয়-ব্যয়ের হিসাব। একটি সরকার যখন বাজেট দেয়, সেটি শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে সীমিত থাকে না। এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকে রাজনীতি। সরকারের অর্থমন্ত্রী সচরাচর বাজেট বক্তৃতা দেন। বক্তৃতার শুরুতে ও শেষের দিকে থাকে রাজনৈতিক কথাবার্তা। এর মধ্যে থাকে সরকারি দলের দৃষ্টিভঙ্গি, জীবিত ও মৃত নেতাদের নিয়ে প্রশস্তিগাথা, অগ্রাধিকারের তালিকা এবং শেষমেশ ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু আশাবাদ। আগে যে কিছুই হয়নি বা হলেও নিয়মের অনেক ব্যত্যয় ঘটেছে এবং এখন থেকে দেশ যে উন্নতির দিকে শনৈ শনৈ এগোতে থাকবে, অর্থমন্ত্রী এটি বলতেও ভোলেন না। স্ক্রিপ্ট লিখে দেন কর্মকর্তারা। সরকার বদলে গেলে বাজেটের রাজনৈতিক অংশটুকুর স্ক্রিপ্ট বদলে যায়। আয়-ব্যয়ের হিসাবের অংশটুকু প্রায় একই রকম থেকে যায়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবরণ ও চাহিদা সমন্বয় করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এটি তৈরি করে দেন। দেশে রাজনৈতিক সরকার না থাকলেও বাজেটের আকৃতি ও প্রকৃতিতে তেমন হেরফের হয় না। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যটুকু থাকে না বা থাকলেও তা ভিন্নরকমের হয়।

১৯৭২ সালে ৩০ জুন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রথম বাজেট উত্থাপন করেন তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ওই সময় দেশে জাতীয় সংসদ ছিল না। ছিল একটি গণপরিষদ। এর কাজ ছিল একটি সংবিধান তৈরি করা। তাজউদ্দীন আহমদ বাজেট উত্থাপন করেছিলেন একটি সংবাদ সম্মেলনে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের জন্য বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছিল ২৯১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং প্রস্তাবিত রাজস্ব ব্যয় ছিল ২১৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। আলাদা করে ৫০১ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল। আগের দিন যোগাযোগমন্ত্রী এম মনসুর আলী পৃথক রেল বাজেট উত্থাপন করেছিলেন। পাকিস্তান আমল থেকেই রেল বাজেট আলাদাভাবে তৈরি করা হতো। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের রেল বাজেটে প্রস্তাবিত রাজস্ব আয় ছিল ২৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। একইসঙ্গে উন্নয়ন বরাদ্দ রাখা হয় ১৪ কোটি ২১ লাখ টাকা। রেল বাজেট এখন আর আলাদা করে তৈরি হয় না।

৫৪ বছরে দেশ অনেক বদলে গেছে। মানুষ বেড়েছে। অর্থনীতি বড় হয়েছে। আয় ও ব্যয়ের খাতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কয়েক বছর আগে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত যখন ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণ করেছিলেন, তখন এটিকে একটি মাইলফলক হিসাবে দেখা হয়েছিল। এ বছর বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটিতে পৌঁছাবে বলে জানা গেছে।

১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটের অঙ্ককে পেছনে ফেলে দিয়েছে অনেকের ব্যক্তিগত আয়। এখন তো হাজার কোটি টাকার নিচে কোনো প্রকল্পই হয় না। আমরা বেশ কয়েক বছর আগেই ঢুকে গেছি মেগাপ্রকল্পের যুগে। এখন একেকটি প্রকল্পের ব্যয় ১০-২০-৩০ হাজার কোটি টাকা বা তারও বেশি। আমাদের জনসমষ্টির একটি বড় অংশ অসচ্ছল হলেও সামষ্টিক অর্থনীতি অনেক বড় হয়েছে।

রাজস্ব আয়ের উৎস হলো কর ও শুল্ক। রাজস্ব ব্যয়ের পর কিছু উদ্বৃত্ত থাকে। সেটি খরচ হয় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে। তবে এ উদ্বৃত্ত যথেষ্ট নয়। একটা বড় অর্থনীতির দেশ হতে হলে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়। এজন্য সরকার নানান অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ করে। সেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে বাজেটে টান পড়ে। তখন রাজস্ব আয় বাড়াতে হয়। এটা করতে গিয়ে বেশি বেশি শুল্ক ও কর আদায় করতে হয়।

করের অন্যতম উৎস হলো ব্যক্তিগত আয়কর। আমরা প্রায় সবাই ‘ইনকাম ট্যাক্স’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। এটি ব্যক্তি আয়ের ওপর ধার্য করা হয়। আমাদের জাতীয় আয়ের তুলনায় করের পরিমাণ খুব কম। এটি অর্থনীতির জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। রাজস্ব আয়ের সিংহভাগ আসে উৎপাদন ও বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত শুল্ক থেকে।

আয়কর আরও বাড়ানো দরকার। কিন্তু কীভাবে? অনেক করদাতা মনে করেন, তাদের যা আয়, তাতে জীবন চলে না। এর চেয়ে বেশি কর দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। কথাটা একেবারে অমূলক নয়। কর আদায়ের ক্ষেত্রে দুনিয়াজুড়ে একটি সাধারণ নিয়ম আছে-যার আয় যত বেশি, তিনি তত অধিক হারে কর দেবেন। আমাদের দেশেও এটি অনুসরণ করা হয়। সেজন্য ব্যক্তি আয়করের ক্ষেত্রে অনেক স্ল্যাব রাখা হয়েছে। এখানে একটি সমস্যা আছে। সরকারের সঙ্গে করদাতার একটি দ্বন্দ্ব আছে। সরকার চায় বেশি কর আদায় করতে। করদাতা চান কর যত কম দেওয়া যায়।

এখন যারা আয়কর দেন, নানান ছুতোয় তাদের ওপর দফায় দফায় কর বাড়ানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এর কোনো কোনোটি অর্থনীতির জন্য খারাপ। একটা উদাহরণ দিই। ব্যাংক আমানতের ওপর কর দিতে হয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সঞ্চয়ের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। কর এড়াতে অনেকেই তখন তাদের টাকা ব্যাংকে না রেখে সোনাদানা কেনেন বা বালিশের নিচে রেখে দেন। অথচ সরকারের উচিত নাগরিকদের বেশি করে সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। কেননা সঞ্চয় হচ্ছে বিনিয়োগের প্রধান উৎস।

আয়কর আদায় বাড়ানোর একটি ভালো উপায় হলো আয়করের জাল বিস্তৃত করা। অর্থাৎ কিছু লোকের ওপর বেশি করের বোঝা না চাপিয়ে বেশি বেশি লোককে করের আওতায় নিয়ে আসা। সম্প্রতি মোটরবাইকের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের একটি প্রস্তাবের কথা শোনা গেছে। এ নিয়ে অনেক হইচই হচ্ছে। আমাদের দেশে ব্যক্তি আয় বছরে সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি না হলে কর দিতে হয় না। তার মানে, মাসিক গড় আয় ৩০ হাজার টাকা হলে তাকে কর দিতে হবে। প্রশ্ন হলো, যাদের মোটরবাইক আছে, তাদের মাসিক আয় কি ৩০ হাজারের নিচে?

আমরা অনেকেই করজাল বিস্তৃত করতে বলি। কিন্তু সেই জালে যদি আমরা কেউ আটকে পড়ি, তাহলে আমরা উশখুশ করি, প্রতিবাদ করি, মানববন্ধন করি। তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসেন নাগরিক সমাজের জনতুষ্টিবাদী প্রতিনিধিরা। একটা কথা আমাদের ভাবতে হবে। আজ হোক, কাল হোক, আমাদের অর্থনীতি ডিজিটালাইজ্ড হবে। কে কত আয় করেন, সেটি জানা যাবে। এই প্রক্রিয়া হয়তো আমরা দীর্ঘকাল ঠেকিয়ে রাখতে পারি। তাতে আমি ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হলেও সমষ্টিগতভাবে আমাদের ক্ষতি হবে।

এ দেশে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে, অনেক পেশা আছে, যেখান থেকে কর আদায় করা হয় না। কারণ সেখানে যথার্থ অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম কাজ করে না। উদাহরণ হিসাবে কোচিং সেন্টার, ডাক্তারের চেম্বার, আইনজীবী, দোকানদার প্রমুখের কথা বলা যায়। তাদের সবাইকে করজালের আওতায় আনা হোক। তাহলে রাজস্ব আয় বাড়বে। কর দেওয়ার অভ্যাসটা গড়ে উঠবে।

কর দেওয়ার ব্যাপারে অনীহার একটি প্রধান কারণ হলো, করের বিনিময়ে যথেষ্ট সেবা পাওয়া যায় না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বেশির ভাগই সরকারি খাতে। মানুষ তো প্রশ্ন করবেই-আমার টাকা কোথায় যায়?

আমরা দেখি, সরকারি খাতে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের কোনো সামাজিক উপযোগিতা নেই। সংগত কারণেই তাদের নাম উল্লেখ করলাম না। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু খরচ করে। কোনো আয় নেই। আয় থাকলেও তা খুবই সামান্য। করদাদাতের টাকায় ভর্তুকি দিয়ে বছরের পর বছর চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। এর সুফল ভোগ করে শুধু ওইসব প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও তাদের পোষ্যরা। এগুলো প্রায় সবই শ্বেতহস্তী। সাধারণ নাগরিকের করের টাকায় এদের কেন পোষা হবে?

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

দিল্লিতে কী হচ্ছে

দিল্লিতে কী হচ্ছে

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

হালফিল বয়ান ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম