Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

উন্নয়নের রূপকার শহীদ জিয়া

Advertisement

Icon

ড. নুরুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উন্নয়নের রূপকার শহীদ জিয়া

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান্রর।

Advertisement

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা, দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা, রাষ্ট্রনায়ক, সংগঠক, উন্নয়ন-চিন্তক এবং সমাজসেবামূলক রাষ্ট্রদর্শনের প্রবর্তক হিসাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তার স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধে জাতিকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীরউত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি সেনাবাহিনীর উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে যখন জনগণের আর্থ-সামাজিক মুক্তি নিশ্চিত করা যাবে। এ উপলব্ধি থেকেই তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেন আত্মনির্ভরতা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, কৃষি আধুনিকায়ন, যুব উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের নীতি।

জিয়ার সমাজসেবামূলক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল গ্রামবাংলা। এ কারণেই ১৯৭৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচি’ গ্রহণ করেন। স্বনির্ভর আন্দোলনের সঙ্গে কৃষি, সেচ, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, বৃক্ষরোপণ, গৃহনির্মাণ, আইনশৃঙ্খলা এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নকে যুক্ত করা হয়। তিনি ‘খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা’কে জাতীয় নীতি হিসাবে ঘোষণা করেন। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত পরিচালিত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ তার অন্যতম যুগান্তকারী উদ্যোগ। প্রায় ২৬,০০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের মাধ্যমে কৃষিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়। এ উদ্যোগের ফলে কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক অগ্রগতি ঘটে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ১৯৭৭ সালে তিনি ‘বিশেষ কৃষি ঋণ তহবিল’ গঠন করেন এবং ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে জামানতবিহীন কৃষিঋণ প্রদান শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে চালু করেন ‘শস্য গুদাম ঋণ কর্মসূচি’। কৃষকদের ফসল সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি হয়। তার সময়ে আশুগঞ্জ সার কারখানা প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সম্প্রসারণ, গম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং চিনি শিল্প আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তিনি পাট, রেশম ও রাবার শিল্প সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার কৃষিবান্ধব নীতির ফলে পরপর দুবছর দেশে খাদ্যশস্যের রেকর্ড উৎপাদন হয় এবং বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে যায়।

জিয়াউর রহমান শিক্ষা বিস্তারকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসাবে বিবেচনা করতেন। ১৯৮০ সালের ২১ ফেরুয়ারি তিনি ‘গণসাক্ষরতা কর্মসূচি’ ঘোষণা করেন। এর লক্ষ্য ছিল ১৯৮৫ সালের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার হার ৮০ শতাংশে উন্নীত করা। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একইসঙ্গে শিশুদের মেধা বিকাশের জন্য ১৯৭৭ সালের ১৫ জুলাই বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেন। স্থানীয় সরকারে নারীদের সংরক্ষিত আসন এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পথ সুগম করেন। নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার উদ্যোগ সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যুবসমাজকে জাতীয় উন্নয়নের মূল শক্তি হিসাবে বিবেচনা করে তিনি ১৯৭৭ সালের ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় যুব সম্মেলনের আয়োজন করেন। ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো যুব মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং যুব উন্নয়ন কমপ্লেক্স গড়ে তোলেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতেও তিনি ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গ্রামীণ নিরাপত্তা ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালে ভিডিপি বা গ্রাম প্রতিরক্ষা দল গঠন করেন। ১৯৮০ সালের ৩০ মে ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা চালু করেন এবং ২১ জুন জাতীয় সংসদে গ্রাম সরকার বিল পাশ হয়। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার স্থানীয় সমাধানের পথ সুগম হয়।

জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল তার সমাজসেবামূলক রাষ্ট্রদর্শনের সংক্ষিপ্ত রূপ। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল ঘোষিত এ কর্মসূচিতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, আত্মনির্ভরশীলতা, কৃষি উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা, নারীর মর্যাদা, যুব উন্নয়ন, বেসরকারি খাতের প্রসার, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রকে একটি উৎপাদনমুখী, আত্মনির্ভরশীল ও গণমুখী কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা বাতিল করে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম আবার চালুর সুযোগ সৃষ্টি করেন। তার প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণা ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভূখণ্ড ভিত্তিক একটি সমন্বিত জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা ধর্মে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান; ভাষায় বাঙালি, কিন্তু জাতীয়তায় বাংলাদেশি।’

পররাষ্ট্রনীতিতেও জিয়াউর রহমান বাস্তববাদী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচয় দেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন, ওআইসিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক প্রতিষ্ঠার ধারণা তার উদ্যোগ থেকেই আসে। ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সফর করে তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তোলেন। তার এ উদ্যোগের ফলেই ১৯৮৫ সালে সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করেন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ভিত্তি স্থাপন করেন। পোশাকশিল্প, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া ও হস্তশিল্প রপ্তানিতে তার সময়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। আজকের বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ভিত্তি তার আমলেই গড়ে ওঠে। তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় ঘটানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নেও তার অবদান ছিল অনন্য। আজকের ‘ব্লু ইকোনমি’ ধারণার প্রাথমিক ভিত্তি তার সময়েই রচিত হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে সমাহিত করা হয়। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করলেও তার আদর্শ, উন্নয়ন দর্শন এবং সমাজসেবামূলক কর্মসূচি আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

পরিশেষে বলা যায়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুধু একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন জনগণের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ এক উন্নয়ন-দর্শনের প্রবর্তক। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যুব উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন, স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে তার বহুমাত্রিক অবদান বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়াকে নতুন ভিত্তি প্রদান করে। তার সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মূল দর্শন ছিল আত্মনির্ভরতা, উৎপাদনশীলতা, ন্যায়বিচার এবং জাতীয় ঐক্য। তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন সামরিক বীর বা রাজনৈতিক নেতা নন, বরং একজন সমাজসংস্কারক ও জাতি পুনর্গঠনের অন্যতম স্থপতি হিসাবেও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ড. নুরুল ইসলাম : অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ক্ষমা চাওয়ার আগে পুনর্মিলন হতেই পারে না

ক্ষমা চাওয়ার আগে পুনর্মিলন হতেই পারে না

নেতানিয়াহুর লক্ষ্য বিরোধীদের পথ রুদ্ধ করাও

নেতানিয়াহুর লক্ষ্য বিরোধীদের পথ রুদ্ধ করাও

প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদে মূল্য সংযোজন ঘটে না

প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদে মূল্য সংযোজন ঘটে না

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম