বাইফোকাল লেন্স
ভারতের ‘পুশইন’ চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন
Advertisement
একেএম শামসুদ্দিন
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করার পর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাঙালি মুসলিম নাগরিকদের জোরপূর্বক সীমান্ত পার (পুশইন) করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডও (বিজিবি) সতর্কব্যবস্থা হিসাবে সীমান্ত পাহারা জোরদার করেছে।
এ লেখা যেদিন লেখছি, তার ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বিজিবি এমন অন্তত ১০টি পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা ঠেকিয়েছে। এ নিয়ে বর্তমানে সীমান্তের সর্বত্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভারতের এ ‘পুশইন’ বা বলপূর্বক পুশব্যাক আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসাবে গণ্য করা হয়। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘পুশইন’ একটি স্পর্শকাতর ও অমানবিক বিষয়। মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘও এ ধরনের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক প্রটোকল ও দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার চরম লঙ্ঘন বলে চিহ্নিত করেছে। কেউ যদি অবৈধ উপায়ে সীমান্ত পেরিয়েও আসে, সেই অবৈধ অভিবাসীকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এবং বন্দুকের মুখে জোর করে অন্য রাষ্ট্রে ফেরত পাঠানো যায় না। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো ব্যক্তিকে সীমান্ত অতিক্রম করতে কেউ যদি বাধ্য করে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের যে তিনটি মূলনীতি আছে, সেই মূলনীতিগুলোও লঙ্ঘিত হয়। এ মূলনীতিগুলো হলো, ‘বাধ্যতামূলক প্রত্যাবর্তনের নিষেধাজ্ঞা’, ‘যৌথ বহিষ্কারের নিষেধাজ্ঞা’ এবং ‘আইনি সুরক্ষার অধিকার’। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, শরণার্থী আইন এবং আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনও এ ধরনের পদক্ষেপকে অনুমোদন করে না। ভারত আন্তর্জাতিক এসব আইন এবং নীতিমালা তোয়াক্কা না করেই পুশইনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ভারত অবশ্য এসব পদক্ষেপকে অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসাবে ব্যাখ্যা করে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে বলে নিজেদের ডিফেন্ড করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে বাংলাদেশে মনে করা হয়, এসব ঘটনার পেছনে কেবল প্রশাসনিক বা নিরাপত্তাগত বিবেচনা নয়, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল ও নির্বাচনি বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ভারতের রাজনীতিতে অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নটি নতুন কোনো বিষয় নয়। কয়েক দশক ধরে বিশেষ করে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য সীমান্তবর্তী রাজ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, অবৈধ অভিবাসন শুধু অর্থনৈতিক বা সামাজিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িত। ফলে এ ইস্যুটি দলটির রাজনৈতিক বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
বিজেপির রাজনৈতিক লাভের ক্ষেত্রটি হলো ভোটব্যাংক রাজনীতি। অভিবাসনবিরোধী অবস্থান ভারতের একটি অংশের ভোটারদের কাছে জনপ্রিয়। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোয় অনেক ভোটার মনে করেন, অবৈধ অভিবাসন স্থানীয় কর্মসংস্থান, ভূমি, সামাজিক সেবা এবং জনসংখ্যার ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যখন সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে বা কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়, তখন সেই ভোটারগোষ্ঠীর কাছে এটি একটি ইতিবাচক বার্তা হিসাবে পৌঁছায়। ফলে পুশইন বা অনুরূপ পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে সরকারকে দৃঢ় ও কার্যকর হিসাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করে।
বিজেপি দীর্ঘদিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন প্রশ্নে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছে। Citizenship amendment act (সিএএ) এবং National register of citizens (এনআরসি) নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল নাগরিকত্ব ও অনুপ্রবেশের প্রশ্ন। এ প্রেক্ষাপটে কথিত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ধারার একটি অংশ। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর আঞ্চলিক রাজনীতিতেও এর প্রভাব রয়েছে। আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ বহু পুরোনো। বিজেপি এসব উদ্বেগকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ফলে অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অবস্থান দলটির জন্য শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, আঞ্চলিক পর্যায়েও রাজনৈতিকভাবে লাভজনক।
আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনে বলা আছে, কোনো রাষ্ট্র এমন কোনো ব্যক্তিকে অন্য কোনো দেশে বা অঞ্চলে জোর করে ফেরত পাঠাতে পারবে না, যেখানে তার বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে; যেমন- ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি’ (আইসিসিপিআর)-এর ধারা ২২ অনুযায়ী, যে কোনো বহিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই করে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ভারতের পুশইন নীতিতে গণহারে ব্যক্তিদের দলবদ্ধভাবে সীমান্ত ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা বেআইনি। এছাড়া আন্তর্জাতিক রাইট টু ডিউ প্রসেস অনুযায়ী, যে কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশে ফেরত পাঠানোর আগে আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে রাতের অন্ধকারে পুশইন করা হলে তা একজন নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার পরিপন্থি কাজ হবে। যদি কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশি না হন অথবা তার নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে তাকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। কারণ, ওই ব্যক্তি সীমান্তের দুপাশেই পরিচয়হীন অবস্থায় পড়ে যেতে পারেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সরকার একাধিকবার এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি করে নিজ দেশেই সমালোচিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো, যে কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেওয়া। কোনো রাষ্ট্র যদি একতরফাভাবে মানুষকে অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হয়। জাতিসংঘ সনদের মূল চেতনা অনুযায়ী, প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ড ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। ফলে কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিদের সীমান্ত পার করিয়ে দিলে তা যেমন আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে, পাশাপাশি কূটনৈতিক সংকটও তৈরি করে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ আন্তর্জাতিক স্থলসীমান্ত হিসাবে বিবেচিত। এ সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত বৈধ ও অবৈধ উভয় ধরনের যাতায়াতের ঘটনা ঘটে। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, চোরাচালান, মানব পাচার অবৈধ অভিবাসন এবং সীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করেন বলেও সন্দেহ করা হয়, তাহলেও তার প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পন্থা। কিন্তু ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতারা বরাবরই বলে থাকেন, তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে নিজেদের সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষার চেষ্টা করছেন। তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইন তাদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নের অধিকার দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে তাদের এ দাবি সঠিক মনে হলেও এ অধিকার সীমাহীন নয়। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রয়োগের সময় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, মানবিক নীতি এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান দেখাতে হয়। অর্থাৎ অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলার বৈধ অধিকার থাকলেও তা প্রয়োগের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার সেই সৌজন্যটুকুও প্রদর্শন করছে?
ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এ দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ বাণিজ্য ইত্যাদি পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে চলে আসছে। এমনিতেই বিগত কয়েক বছর ধরে এ দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। এর মধ্যে পুশইনের মতো ঘটনা এ সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাবে সন্দেহ নেই। এর কিছু কিছু লক্ষণ ইতোমধ্যে ফুটে উঠেছে। জনমতের বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জনগণ, সীমান্তে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাগুলোকে জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত করে দেখবে-এটাই স্বাভাবিক। ফলে পুশইন নিয়ে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে কোণঠাসা করার জন্য পুশইনের ঘটনাকে পুঁজি করতে পারে। এর ফলে বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশে পরিণত হতে পারে। ভারত যদি অন্যায়ভাবে কিছু চাপিয়েও দেয়, রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে গিয়ে সব রাজনৈতিক দলকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সহযোগিতায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসা উচিত। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি ভারতের বিষয়ে বাংলাদেশে জনগণের মনোভাব বুঝতে ভুল করে, তাহলে তাদেরই বেশি ক্ষতি হবে।
একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক
