প্রণোদনা প্যাকেজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে
Advertisement
ড. মোস্তফা কে মুজেরী
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি নির্বাচনি অঙ্গীকার হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি অর্জন। বর্তমানে দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। এজন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৮ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণেরও বড় করতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন সন্দেহ নেই, কিন্তু অসম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বর্তমানে চলমান কাঠামোগত রূপান্তর প্রক্রিয়ার মৌলিক পুনর্গঠন এবং একটি নতুন উন্নয়ন কাঠামো গ্রহণ, যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নে সহায়ক হবে। এ ধরনের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কাঠামো দেশের জিডিপিকে স্বল্প সময়ের মধ্যে কমপক্ষে ৮ থেকে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং অর্থনীতিকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম করবে। ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। বিদ্যমান অবস্থায় অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারকে সব খাতে, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং সামাজিক সুরক্ষায় সহায়ক পরিবেশ তৈরির জন্য বাজেট ব্যয় আরও বাড়াতে হবে, শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে গতিশীল করতে হবে। প্রতিবছর বেসরকারি খাতে অন্তত ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির অনুপাত ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হয়। বর্তমানে এ অনুপাত ২২ শতাংশের কাছাকাছি, যা বিগত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এ অবস্থায় গত ২৩ মে চলমান দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যে বন্ধ ও সংকটগ্রস্ত শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং সার্বিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এ প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো থেকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা সরকারি গ্যারান্টির অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রদান করা হবে।
এ পুনঃঅর্থায়ন সহায়তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান, কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট-মাঝারি শিল্প পুনরুজ্জীবন, কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়ন। এ প্যাকেজের আওতায় বৃহৎ শিল্পের জন্য গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের ক্ষেত্রে সুদের হার কিছুটা বেশি হতে পারে। বর্তমানে উন্মুক্ত বাজারে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রচলিত সুদ হারের চেয়ে অর্ধেক সুদে এ ঋণদান করা হবে।
পুনঃঅর্থায়ন অংশের অধীনে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান আবার চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ কার্যক্রমের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই’র জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ কার্যক্রমের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উত্তরবঙ্গের কৃষি হাব উদ্যোগের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে কয়েকটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়নও পরিচালনা করবে, যার মধ্যে রয়েছে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্সিংয়ের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, চামড়া ও জুতা রপ্তানি এবং হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানির জন্য ২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া স্টার্টআপ, সৃজনশীল অর্থনীতি প্রকল্প, সবুজ অর্থায়ন ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং বেকার যুবকদের জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক, কোভিড-পরবর্তী ধাক্কা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান শ্রেণিবদ্ধ ঋণ, দুর্বল বিনিয়োগ আস্থা এবং শিল্প উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ প্যাকেজ চালু করা হয়েছে। তারল্য সংকট এবং প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কারণে ১ হাজার ২০০টির বেশি শিল্প ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে অথবা আংশিকভাবে চালু রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী। আমাদের দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ব্যাংক থেকে চাহিদামতো ঋণের জোগান না পাওয়া; বিশেষ করে সিএমএসএমই, নারী উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপগুলোর জন্য সাম্প্রতিক এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, ৮৪ শতাংশ সিএমএসএমই উদ্যোক্তার শিল্প-কারখানা স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে চাহিদামতো ঋণ না পাওয়া।
এই প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্যাকেজের অধীনে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ কীভাবে এবং কাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই ঋণদান কার্যক্রম কীভাবে বাস্তবায়িত করবে এবং কারা এ বিশেষ তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এসব বিষয়ে কোনো বিস্তারিত নীতি নির্দেশিকা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। প্রণোদনা তহবিল থেকেই যদি সঠিকভাবে ঋণ প্রদান করা না হয়, তাহলে এ প্যাকেজের লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে। কাজেই শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কারা এ তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। যারা চিহ্নিত ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, তারা যাতে কোনোভাবেই এ বিশেষ ঋণদান কার্যক্রমে যুক্ত হতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করে যারা কখনোই কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হননি তাদের; এবং নতুন উদ্যোক্তাদের এ বিশেষ ঋণদান কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। যেসব উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের মাধ্যমে নিজেদের ‘ক্লিন’ দেখিয়েছেন, তারা যাতে কোনোভাবেই এ বিশেষ ঋণদান কার্যক্রমে যুক্ত হতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
যেসব প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ১-২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এক এবং দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করে নিয়েছে, তাদের সতর্কতার সঙ্গে এ বিশেষ তহবিল থেকে ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে দূরে রাখতে হবে। এর আগেও ঋণখেলাপি উদ্যোক্তা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। পূর্বে নিয়ম ছিল কোনো উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর যদি একাধিক শিল্পকারখানা থাকে এবং তার মধ্যে যদি একটিমাত্র শিল্পও ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে, তাহলে গ্রুপের অবশিষ্ট শিল্পগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হবে। খেলাপি ঋণের এ বিধান পরিবর্তন করে বলা হয়, কোনো শিল্পগোষ্ঠীর এক বা একাধিক শিল্পকারখানা ঋণখেলাপি হয়ে পড়লেও অবশিষ্ট শিল্পগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে পারবে। কোনো উদ্যোক্তার একটি প্রকল্প ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে তার মালিকানাধীন অন্য প্রকল্পগুলোকে ঋণপ্রাপ্তির অযোগ্য বিবেচনা করতে হবে।
কিছুদিন আগে একক ঋণসীমা বাড়ানো হয়েছে। আগে কোনো একক শিল্পগোষ্ঠী বা উদ্যোক্তা একটি ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সরাসরি ঋণ হিসাবে গ্রহণ করতে পারতেন। কিছুদিন আগে সে বিধান পরিবর্তন করে একক ঋণসীমা ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এটা পরিবর্তন না করা হলে ব্যাংক ঋণ মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে পড়বে।
যারা নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করেন, তারা ব্যাংক থেকে কার্যত কোনো বিশেষ সুবিধা পান না। বাংলাদেশ ব্যাংক যে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তা যেন পরীক্ষিত সৎ ও ভালো উদ্যোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সেটা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হবে। কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃত, অভ্যাসগত ও অপ্রণোদিত ঋণখেলাপিদের এ কার্যক্রমে যুক্ত হতে দেওয়া কাম্য নয়। বিশেষ এ ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও পরিচালনগত ঝুঁকি রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে ঋণের অপবণ্টন, নৈতিক ঝুঁকি এবং খেলাপি ঋণ ঝুঁকি। যদি যথাযথভাবে কাঠামোবদ্ধ ও পর্যবেক্ষণ করা না হয়, তাহলে এ ভর্তুকিপ্রাপ্ত তহবিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার পরিবর্তে প্রায়ই অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যায় অথবা খেলাপি বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। বড় বড় উদ্যোক্তা গোষ্ঠীকে ঋণদানের পাশাপাশি সিএমএসএমই, নারী উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণদান করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এগুলোই দেশের দ্রুত প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য নিরসনের প্রকৃত চালিকাশক্তি। হাতে পর্যাপ্ত পুঁজি থাকলেই কেউ সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন না। উদ্যোক্তা হতে হলে তার মাঝে কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা, পরিবর্তনশীল বাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার অভিযোজন সক্ষমতা এবং পরিমিত ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা। সফল উদ্যোক্তাদের স্বতঃপ্রণোদিত, দূরদর্শী ব্যক্তি হতে হয়, যারা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়নে সক্ষম। প্রণোদনা প্যাকেজ যদি পরিচালনগত দক্ষতা বৃদ্ধি, স্কেলআপ ও বর্ধিত উৎপাদন ও রপ্তানি বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব সুবিধার ক্রমাগত মেয়াদ বৃদ্ধি বা নতুন সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য তদবির করতে ব্যস্ত রাখে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা কঠিন হবে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্যাকেজটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। (অনুলিখন : এম এ খালেক)
ড. মোস্তফা কে মুজেরী : অর্থনীতিবিদ; নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট
