Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সংকটের অর্থনীতি, প্রত্যাশার বাজেট

Advertisement

Icon

ড. হাছান উদ্দীন

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সংকটের অর্থনীতি, প্রত্যাশার বাজেট

Advertisement

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এমন একসময়ে প্রণীত হতে যাচ্ছে, যখন দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর প্রবৃদ্ধি, দুর্বল রাজস্ব কাঠামো, ব্যাংক খাতের অনিয়ম এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মতো বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলা করছে। গত এক দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির অগ্রগতি সত্ত্বেও অর্থনীতির অভ্যন্তরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা এখন সরাসরি মানুষের জীবনমানকে প্রভাবিত করছে। মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় কমেছে, নিম্ন-আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে এবং তরুণদের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ফলে আসন্ন বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি হতে হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিপত্র।

আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল আর্থিক খাত, কম কর-জিডিপি অনুপাত এবং বিনিয়োগ স্থবিরতাকে বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বাস্তবতায় শুধু বড় বাজেট ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য ও গণমুখী বাজেট প্রণয়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। বাজেটের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা। বাজেটের মূল দর্শন হতে পারে ‘উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি’, যেখানে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হবে মানুষ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের লক্ষ্য হবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমানো ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার। অনেক সময় রাজনৈতিক বক্তব্যে অত্যন্ত বড় বাজেটের কথা বলা হয়, যেন বড় অঙ্কই উন্নয়নের একমাত্র সূচক। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা ভিন্নকথা বলে। বাজেটের আকার নির্ধারণ করতে হয় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রাজস্ব সংগ্রহের বাস্তবতা, ঋণ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নির্ধারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারের পরিচালন ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। খাদ্য আমদানি, কৃষি ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি কর্মচারীদের ব্যয় আগের তুলনায় অনেক। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির হার আগের মতো শক্তিশালী নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির মূল্যায়নে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, বিনিয়োগের গতি কমেছে এবং বেসরকারি খাত এখনো আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তৃতীয়ত, রাজস্ব সংগ্রহ সক্ষমতা এখনো সীমিত। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম; যা বড় বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ, ডলারের সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সীমিত করেছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে সুদ পরিশোধ ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ফলে অত্যধিক বড় বাজেট নিলে সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে, যা ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার বিপরীতভাবে খুব সীমিত বাজেট হলে সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি সহায়তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানবিষয়ক খাতগুলো পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পাবে না। অর্থাৎ সরকারকে এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে, যেখানে অর্থনীতি চাঙা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় থাকবে, কিন্তু সেই ব্যয় আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না।

এ বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের একটি যৌক্তিক আকার হতে পারে ৮ লাখ ৪০ হাজার কোটি থেকে ৮ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। এটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় ৬ থেকে ৯ শতাংশ বেশি। বর্তমান মূল্যস্ফীতি, সামাজিক ব্যয়ের প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বাস্তবতা বিবেচনায় এ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সংযত; কিন্তু কার্যকর বলা যায়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-শুধু বাজেটের আকার বাড়ালেই কাক্সিক্ষত ফল আসবে না। বাংলাদেশের বড় সমস্যা বরাদ্দ নয়, বরং বাস্তবায়ন সক্ষমতা। কয়েক বছরে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, সময়ক্ষেপণ এবং নিম্নমানের বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছে। ফলে আগামী বাজেটে ‘কম প্রকল্প, বেশি কার্যকারিতা’ নীতি গ্রহণ করা জরুরি। অর্থাৎ এমন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেগুলো সরাসরি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি, পরিবহণ, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়া আগামী বাজেটকে অবশ্যই রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

কোন খাতে কত বরাদ্দ এবং কেন : বর্তমান বাস্তবতায় এমন একটি বাজেট কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়কে আরও ফলপ্রসূ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে। অর্থাৎ আগামী বাজেটের মূল দর্শন হতে পারে ‘মানুষকেন্দ্রিক উৎপাদনমুখী অর্থনীতি’।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো দুর্বল রাজস্ব কাঠামো। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্নপর্যায়ে অবস্থান করছে, যা সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সীমিত করে রেখেছে। ফলে আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান কৌশল হওয়া উচিত করের হার বৃদ্ধি নয়; বরং করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। বর্তমানে দেশের বড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো কর কাঠামোর বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের নগর সম্পত্তি, অনলাইন ব্যবসা, ডিজিটাল লেনদেন এবং অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে কর ফাঁকি, অর্থ পাচার এবং অপ্রদর্শিত সম্পদের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা জরুরি। প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব। সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামো এমন হওয়া প্রয়োজন, যা একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে, অন্যদিকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করবে। অর্থাৎ আগামী বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল উন্নয়নের পরিসংখ্যান বৃদ্ধি নয়; বরং মানুষের জীবনমানের বাস্তব উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

বাজেটের রাজনৈতিক দর্শন কী হতে পারে : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের রাজনৈতিক দর্শন হতে পারে ‘উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি’। অর্থাৎ এ বাজেটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে মানুষ, কেবল পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রবৃদ্ধি নয়। গত এক দশকে উন্নয়ন আলোচনায় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও বর্তমানে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং আয় বৈষম্যের প্রশ্নগুলো অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে আগামী বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যাতে উন্নয়নের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়।

এ দর্শনের মূল ভিত্তি হবে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা। বিশেষ করে কৃষিকে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি হিসাবে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে কৃষি সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হতে পারে। একই সঙ্গে তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান আগামী বাজেটের অন্যতম কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বার্তা হওয়া উচিত। বর্তমানে শিক্ষিত বেকারত্ব অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তাই আইটি, এআই, ডিজিটাল সেবা, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘চাকরি সৃষ্টি ছাড়া প্রবৃদ্ধি নয়’ নীতি সামনে আনা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতেও মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ব্যয় বিবেচনায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ জরুরি।

এ বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে স্থানীয় অর্থনীতির শক্তিশালীকরণ। দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণের ফলে স্থানীয় সরকার কাঠামো দুর্বল হয়েছে। তাই ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌর পর্যায়ে সরাসরি উন্নয়ন বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন, ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, ই-গভর্ন্যান্স এবং ব্যয় মনিটরিংয়ের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, এ বাজেটের মূল রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে ‘রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রতিফলিত হয়।’

ড. মো. হাছান উদ্দীন : অধ্যাপক, ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ এবং চেয়ারম্যান, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শতফুল ফুটতে দাও পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

ইতিহাসের বয়ান বদলাবে কবে

ইতিহাসের বয়ান বদলাবে কবে

উচ্চশিক্ষায় সংখ্যা নয়, গুণগত মানই মুখ্য

উচ্চশিক্ষায় সংখ্যা নয়, গুণগত মানই মুখ্য

অন্যমত ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম