Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

গোড়ায় গলদ

Icon

সলিমুল্লাহ খান

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গোড়ায় গলদ

ছবি: যুগান্তর

Advertisement

আমাদের এই বিচিত্র দেশে মাঝেমধ্যেই একটা সংস্কার সংস্কার আওয়াজ শোনা যায়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও এই আওয়াজ হইতে অব্যাহতি পায় না। কিছুদিন হইল একই ধ্বনি আবারও কানে পশিতেছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করিতে হইবে।

সংস্কার করিবেন, ভালো কথা। কিন্তু কীসের সংস্কার করিবেন তাহা তো আগে জানিতে হইবে। না জানিয়া সংস্কার করিবেন তো শুদ্ধ সংকটের গভীরতাই বাড়াইবেন। কাজের কাজ কিছুই হইবে না।

এই মুহূর্তে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গোড়ার সমস্যাটা কী? সরকারি হিসাব অনুসারে এদেশে শতকরা ৭৪ জন নরনারী নিজ নিজ নাম দস্তখত করিতে পারে। মানে শতে ২৬ জন পারে না। নাম দস্তখত করিতে পারাটাই শিক্ষার মাপকাঠি নহে। তবে এই হিসাব প্রচার করা হয় বলিয়া আমরাও তাহা সত্য মনে করি। তাহাতে অনেকটা একপ্রকার গণভোটের ফলাফল পাওয়া যায়। হইতে পারে বিখ্যাত মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েন সাহেবের মৃত্যুসংবাদের মতন সংবাদটা হয়তো একটু অতিরঞ্জিত, তারপরও আনুষঙ্গিক মানুষ বিশ্বাসী জীব। অধিকন্তু বিশ্ববাসী।

এই ধরনের পরিসংখ্যান পুরাণে যাহাদের আস্থা অসামান্য নহে কিংবা যাহারা সন্দেহবাতিকের রোগী, তাহারা শিক্ষার আরেকটা মাপকাঠি বিবেচনা করিলে মন্দ করিবেন না।

এই বছর (২০২৬ সালে) দেশের সব কয়টি শিক্ষা বোর্ড মিলাইয়া কতজন ছাত্রছাত্রী এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার টেবিলে বসিয়াছে? পত্রিকাপাঠ জানিলাম সংখ্যাটি ১৮ লাখ বা তাহার কিছু বেশি হইবে। আর এক্ষণে দেশের জনসংখ্যা কত? ১৮ কোটি বা তাহার কিছু কমবেশি হইবে। আজ হইতে পনেরো-ষোলো বছর আগে জনসংখ্যা কিছু কম ছিল। সেই সময়ের জাতকেরা এ বছর এসএসসি দিতে বসিয়াছে। আপাতত ইতরবিশেষ হিসাব না করিবেন তো দেখিবেন আমাদের দেশে জনসংখ্যার প্রতি কোটিতে এক লাখ (মানে শতে একজন) এসএসসি পরীক্ষায় বসে। কতজন উতরাইতে পারে সে হিসাব স্বতন্ত্র।

পনেরো-ষোলো বছর আগেকার জন্মহার যদি কম করিয়াও ধরেন তো এক শতে চারিজন জন্ম লইত ধরিতে পারেন। যদি জন্মগ্রহণকারী সকলেই এসএসসি তক উঠিতে পারিত তো মোট পরীক্ষার্থী সংখ্যা কত দাঁড়াইত? হয়তো সর্বমোট ৭২ লাখের কাছাকাছি। এই বছর সাকুল্যে ১৮ লাখের মতো এই স্তরে উঠিলে যাহারা উঠিতে পারিল না তাহাদের সংখ্যা অগণিত। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫৪ লাখ) তর্কের বিষয় নহে।

এক্ষণে না বুঝিবার কারণ নাই এদেশে এখন পর্যন্ত প্রতি চারি শিশুর মধ্যে গোটা তিনজনই এসএসসি বা সমমানের পড়াশোনা শেষ করিতে পারে না। কতজন পাশ করিয়া থাকে সে কথা আজ না হয় নাই বা তুলিলাম!

এই বঞ্চনা বা বহিষ্কারই আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার আসল সংকট বা গোড়ায় গলদ। ইহাই আমাদের একমাত্র বা এক নম্বর শিক্ষাসমস্যা, ইংরেজিতে বলিলে ‘দি এডুকেশন কোশ্চেন’। আর আর সমস্যা সকলই ইহার সঙ্গে যুক্ত উপসংহার বা ইহার উপজাতবিশেষ। শুদ্ধ আমাদের নহে, সকল সাবেক পরাধীন কিংবা হালফিল স্বাধীন দেশের সমস্যাও এইটাই।

পাশের দেশ ভারতে এই সমস্যা আরও প্রকট রূপ ধরিয়াছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পণ্ডিতা শ্রীমতি মায়া জন লিখিয়াছেন, ‘আজিকার ভারতবর্ষে শতকরা ৮২ জনের মতো ১৭-২৩ বছর বয়সী যুবক-যুবতী উচ্চশিক্ষার কিম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না। ইহার অর্থ যাহারা এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষার সংকট (১২ বছর ধরিয়া পড়াশুনা) পার হয়, তাহাদের সামান্য একটা অংশই মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ দেখে।’ ইহা ২০১৩ সালের কথা। এখনো পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়াছে এমন কথা বলা যাইতেছে না। বঞ্চনাই ভাগ্য যাহাদের, তাহাদের নাম ‘গণ’।

সকলেই জানেন স্কুল পর্যায়ের দুই দলীয় ব্যবস্থা পরাধীনতার যুগেই চালু হইয়াছিল। ভারতে ব্রিটিশ রাজের মতো হয়তো এই ব্যবস্থাও ঘুমঘোরে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। আজিকালি ইহার পরিপূরক দ্বিদলীয় উচ্চশিক্ষার আয়োজনও সম্পূর্ণ হইতেছে। শুদ্ধ গণ (বা পাবলিক) ও পুঁজিঘন (বা প্রাইভেট) বিশ্ববিদ্যালয় বিভাজন নহে, দুই ধরণির মধ্যেও আছে নানাবিধ গ্রেড, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, বাজে বিশ্ববিদ্যালয় আর ভাইবেরাদারের এজমালি বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উন্নতিসাধনের জন্য যাঁহারা নিত্য দুশ্চিন্তার আশ্রয় লইয়া থাকেন, তাঁহারা বিশ্বব্যাংকের উপদেশ পরামর্শ ও সাহায্য গ্রহণ করিতে সংকোচ করেন না। বিশ্বব্যাংক উচ্চশিক্ষার উন্নতি ও রূপান্তরের জন্য অনেক টাকাপয়সা দিতেছেন তাঁহাদের। তাঁহারাও চাহিতেছেন আমরা যেন শিল্পকারখানার চাহিদামাফিক শিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত ছেলেমেয়ে তৈরি করি। দাবি একটাই। সেই চাহিদা অনুসারেই শিক্ষার বিষয়বস্তু বা কারিকুলাম পরিবর্তন করিতে হইবে। আমাদের কাজকর্ম করিতে সক্ষম এমন ছেলেমেয়েদের নিয়োগ করিতে পারে তেমন শিল্পকারখানা তৈরি করার কথা তাঁহারা আদৌ তুলিবেন না। অন্য কেহ তুলিলেও গায়ে মাখিবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম বদলাইতে হইবে, অথচ নতুন নতুন শিল্পকারখানার গোড়াপত্তন করা হইবে না। তখন এই ছেলেমেয়েদের গতি কী হইবে? যে দেশের পুঁজি গতিশীল সেই দেশে যাতায়াত শুদ্ধ নহে, হিজরত করিতে হইবে। তাহাই তো আকছার হইতেছে।

বিশ্বব্যাংক যাহা বলিতেছেন তাহার সারকথা ইউরোপ মহাদেশে প্রথম মহাযুদ্ধের পরপরই তোলা হইয়াছিল। প্রথম মহাযুদ্ধের পর ইতালির রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন বেনিতো মুসোলিনি ও তাঁহার ফ্যাসিতন্ত্রী দল। জোবানি জেন্তিলে (১৮৭৫-১৯৪৪) নামক একজন খ্যাতনামা দার্শনিক ফ্যাসিতন্ত্রের পক্ষে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাহার ঝান্ডাসদৃশ একটা বইয়ের নাম : ‘শিক্ষার সংস্কার’ ইংরেজি অনুবাদে ‘দি রিফর্ম অব এডুকেশন’। সেকালের সেরা দার্শনিক বেনেদেত্তো ক্রোচে (১৮৬৬-১৯৫২) তাঁহার এই কেতাবের ভূমিকা লিখিয়া দিয়াছিলেন। মুসোলিনি সরকারে শিক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হইবার পর জেন্তিলে সাহেব ১৯২৩ সালের ৬ই মে তারিখে যে শিক্ষা সংস্কারের প্রবর্তন করেন, তাহার অনেক বৈশিষ্ট্যের এক বৈশিষ্ট্য ছিল ‘ক্লাসিকাল’ বা মানবিক শিক্ষা হইতে আলাদা করিয়া ‘টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল’ বা কারিগরি ও বৃত্তিগত শিক্ষা। এই সংস্কার ইতালির পুরানা শিক্ষাব্যবস্থার অবসান ঘটাইয়াছিল। এখানে বলিলে বোধকরি অধিক ইহবে না, পুরাতন ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটিয়াছিল ১৮৫৯ সালে, ইতালির একদেশ নীতি প্রবর্তনের বা একত্রীকরণের যুগে। জেন্তিলে সংস্কারের ফলে নানান ধরনের পরীক্ষা-টরীক্ষা লইয়া ‘মানবিক’ শিক্ষাগ্রহণ করিবার খাতিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার মতো ছাত্র অতি অল্পসংখ্যায় নির্বাচন করা হইত।

আমি এখানে ‘ছাত্রছাত্রী’ লিখিতে পারিলাম না, কারণ ফ্যাসিতান্ত্রিক সরকার সজোরে ঘোষণা করিত, নারীজাতির প্রধান দায় সন্তানধারণ ও সন্তানপালন। এই ফ্যাসিতান্ত্রিক সংস্কার শুদ্ধমাত্র নারীজাতির বিরুদ্ধেই দাঁড়ায় নাই, সাধারণ হিসাবে যাহাদের কৃষক ও শ্রমিক বলা হয়, সকলের বিরুদ্ধেও অবস্থান গ্রহণ করে।

ফ্যাসিতন্ত্রের হইতে নির্যাতিত মনীষী ও মজুরনেতা অ্যান্তোনিও গ্রামসি (১৮৯১-১৯৩৭) সেই সময় কারাগারে বসিয়া আপন আশঙ্কার কথা লিখিয়াছিলেন। নতুন সংস্কার শুদ্ধ বৈষম্যমূলক নহে; এই সংস্কার অতি অল্প বয়সে ‘কারিগরি ও বৃত্তিগত’ খাতে চালান দিয়া কৃষক ও মজুর শ্রেণির সন্তানসন্ততিকে সমাজদেহে প্রভাব বিস্তারকারী উচ্চস্তর হইতে আলাদা করার ব্যবস্থাকে একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত করিবে। আমাদের দেশে বিশ্বব্যাংকের উপদেশ অনুযায়ী আমদানি করা সংস্কারও এই মুহূর্তে সেই ফ্যাসিতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করিতেছে।

আমাদের দেশে এসএসসি পরীক্ষায় বসিবার মতন শিক্ষার সুযোগ কতজন পায়, তাহার শতকরা পরিসংখ্যানটি মোটের উপর অকাট্য। ইহাকে সাক্ষরতাবিষয়ক পরিসংখ্যানের নাহান সচিবালয়ে উৎপাদিত পণ্য বলিবার উপায় নাই। তথ্যটি নিছক বিষণ্ন সংবাদও নহে। একটা ছক ইহার পশ্চিমে আছে।

আমাদের রাষ্ট্র যে শিক্ষানীতি এতদিন ধরিয়া সযত্নে অনুসরণ/অনুশীলন করিতেছে, ইহাকে তাহার একপ্রকার বিশ্বস্ত দলিলই বলা চলে। বলা বাহুল্য, এই নীতির পূর্বপুরুষ ইতালির পরিত্যক্ত ফ্যাসিতন্ত্র। এই নীতির নতুন নিশানবরদার হইয়া বর্তমানে বিশ্বব্যাংক ইহাকে একটা আভিজাত্য দান করিয়াছে। আর পুরাতন যুগে যাহাকে আমরা তৃতীয় বিশ্ব বলিতাম, তাহাতে কায়েম করিতেছে। ইহা যে বর্ণবাদের নতুন চেহারা তাহা বর্ণচোরা সাহিত্যিক ছাড়া আর সকলেই বুঝিবেন।

আমাদের এই আনমনা বা অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড অবস্থায় একই শিক্ষানীতি গ্রহণ করিয়াছি। এই নীতির লক্ষণ কি কি? ইহাকে বলা যায় পাবলিক স্কুল ও প্রাইভেট স্কুল সমন্বিত একটা দুই দলীয় বা ডুয়াল শিক্ষানীতি। এই শিক্ষানীতির হস্তক্ষেপের ফলে বা মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত সার্বভৌমের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ (শ্রমিক ও নিুবিত্ত শ্রেণির তরুণ-তরুণী) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উপযুক্ত মেধার অধিকার অর্জন করিতে পারে না।

আমাদের উচ্চশিক্ষার সমস্যা কি? এই প্রশ্ন করিলে বেশির ভাগ উত্তরদাতা বলিবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কিংবা সরকারের খবরদারি। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বার অতিক্রম করিবার পর এই সমস্যার দেখা পাইবেন। এই প্রবেশদ্বারের বাহিরে যাহারা পড়িয়া আছেন তাহাদের সমস্যা অন্য।

১১ জুন ২০২৬

(লেখকের বানান ও ভাষারীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

সলিমুল্লাহ খান : অধ্যাপক ও চিন্তাবিদ

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

দৃষ্টিপাত সংকট মোকাবিলায় জাগতিক কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি

সংকট মোকাবিলায় জাগতিক কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি

প্রশ্ন যখন সরকারের ‘অস্তিত্ব’

প্রশ্ন যখন সরকারের ‘অস্তিত্ব’

হৃদরোগকে অবহেলা নয়

হৃদরোগকে অবহেলা নয়

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম