Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

এখনো সংবিৎ ফিরে না পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে

Advertisement

Icon

মহিউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এখনো সংবিৎ ফিরে না পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে

Advertisement

আমাদের দেশে যারা কাজ করে খান, তাদের জন্য আছে দুটি কমিশন। যারা ‘হোয়াইট কালার’, তাদের জন্য আছে বেতন কমিশন। তারা ফাইল নাড়াচাড়া করেন, নোট লেখেন। তারা পান বেতন-ভাতা। আর যারা গায়ে-গতরে খাটেন, তাদের জন্য আছে মজুরি কমিশন। তারা বেতন পান না, মজুরি পান। এখানে একটা আশরাফ-আতরাফ বর্ণভেদ আছে।

সরকারি খাতে বেতন স্কেল ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যক্তি খাতে হইচই শুরু হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক এবং গণমাধ্যমের জন্য শিগ্গির হয়তো নতুন বন্দোবস্তের কথা শোনা যাবে। কলকারখানার শ্রমিকদের জন্য মাঝেমধ্যে মজুরি-স্কেল ঘোষণা করা হয়ে থাকে। সেটিও হবে আশা করি।

কাগজে-কলমে দেশের শ্রমশক্তি মোট জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কাগুজে হিসাবে বলা যায়, শ্রমশক্তির সংখ্যাগত পরিমাণ সাত কোটি ২০ লাখের কাছাকাছি। তার মধ্যে সাকুল্যে বিশ লাখ আছে পাবলিক সেক্টরে। এরাই আসছেন নতুন বেতন-স্কেলে। বাকি সাত কোটি মানুষ ব্যক্তি খাতে কিংবা স্বনিয়োজিত। আপাতত তাদের জন্য কোনো বেতন বা মজুরি স্কেল নেই।

এদিকে শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশ নিয়োজিত আছে কৃষি খাতে। বেতন বা মজুরি কমিশন তাদের জন্য নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক। দেশের সিংহভাগ মানুষের যেখানে জায়গা নেই। সরকারি খাতের বেতন-ভাতা নিয়ে রোজ সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। কর্তারা মাথা ঘামাচ্ছেন। তাদের জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়ছে। কারণ একটাই, এ শ্রেণিটি খেপে গেলে সরকার ঝামেলায় পড়ে যাবে। যে শ্রেণি যত বেশি সংগঠিত এবং যত বেশি চাপ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, সরকারকে তাদের কথা শুনতে হয়। তা ছাড়া বাজেট তো বানান সরকারি কর্মকর্তারা। সরকারের অর্থমন্ত্রী সেখানে কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য জুড়ে দেন। তিনি মূলত দুটি কথা বলেন। প্রথমত, দেশের যত সমস্যা, সব আগের সরকারের তৈরি। দ্বিতীয়ত, এবারের বাজেট হচ্ছে ইতিহাসের সেরা বাজেট।

কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত একটা হিসাব চোখে পড়েছে। বাজেট বিশ্লেষণের এ ধারাটিতে নতুনত্ব আছে। বুঝতে সুবিধা হয়, নাগরিকদের করের টাকা কোথায় যাচ্ছে। মোট রাজস্ব আয়কে যদি ১০০ ধরা হয়, তাহলে কোন খাতে কত শতাংশ যাচ্ছে, তার উপকারভোগী কারা হবেন, এটা মোটামুটি বোঝা যায়। এখান থেকেই অনুমান করা যায়, সমাজে কোন শ্রেণিটির কতটুকু ক্ষমতা এবং অগ্রাধিকার। তারা খুশি থাকলেই আমরা এটাকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বাজেট বলে ফতোয়া দিই।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম বাজেট দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭২ সালের ৩০ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের আয়-ব্যয়ের একটি বিবরণ দেন। ওই সাড়ে ছয় মাসে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছিল ৪৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। আয়ের প্রধান উৎস ছিল আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, যার পরিমাণ ছিল ১২৫ কোটি টাকা। এরপর আবগারি শুল্ক ৬৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং আয়কর ও করপোরেশন কর ৫১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আয়ের ৬৯ শতাংশ ব্যয় হয়েছিল অসামরিক প্রশাসন খাতে।

১৯৭২-৭৩ সালে মোট রাজস্ব ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। খাতওয়ারি ব্যয়ের শীর্ষে ছিল অসামরিক প্রশাসন, যার পরিমাণ ছিল ৬৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এ খাতে গিয়েছিল মোট রাজস্ব ব্যয়ের ৩২ শতাংশ। পরের বছর, ১৯৭৩-৭৪ সালে অসামরিক প্রশাসন চালাতে খরচ হয়েছিল মোট রাজস্ব ব্যয়ের ৪০ শতাংশ। এদেশে প্রশাসনিক ব্যয় বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। অন্যান্য খাত ধীরে ধীরে উপরে উঠে এলেও ‘প্রশাসন’ থেকেছে শীর্ষে।

সমস্যা হলো অর্থনীতিবিদদের নিয়ে। তাদের চোখে প্রশাসনকে ‘অনুৎপাদনশীল’ খাত হিসাবে ধরা হয়। প্রশাসনের লোকেরা হয়তো এটা মানতে চাইবেন না। তারা বলবেন, তারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এর একটা নতুন নাম হয়েছে-পরিচালন ব্যয়। রাষ্ট্র তো আর মুখের কথায় চলে না! এটাকে দেখভাল করতে হয়। যারা পরিচালনা করেন, তাদের তো মানমর্যাদা বজায় রেখে কাজ করতে হবে। করদাতারা যদি তাদের জন্য এটুকু ত্যাগ স্বীকার না করেন, তাহলে রাষ্ট্র চলবে কীভাবে? রাষ্ট্র তো আর অয়ারাম-গয়ারামদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না!

১৯৭৪ সালের ১৯ জুন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ একটি ‘সুষম’ বাজেট উপস্থাপন করেন। বরাবরের মতো এটিতেও অসামরিক প্রশাসনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। ২২ জুন ‘নয়া বাজেট’ শিরোনামে ইত্তেফাক পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয় ছাপা হয়। সম্পাদকীয় মন্তব্যে বলা হয় : “দেশের গোটা অর্থনীতিই যেখানে বিশৃঙ্খল, সেখানে বাজেট সুশৃঙ্খল, সর্বাঙ্গসুন্দর হইবে, এটা আশা করা বাতুলতা। কুশলী অর্থমন্ত্রী এ বাজেট তৈয়ার করিতে গিয়া ভাষা ও পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে দেশবাসীকে ‘সুগার কোটেড কুইনাইন’ পরিবেশন করিয়াছেন। ইহার দ্বারা খুব বেশি মানুষকে তিনি খুশি করিতে পারেন নাই। কথায় বলে, ডেগে থাকিলে ডৈ-এ উঠি। ডেগেই নাই, তা অর্থমন্ত্রীর ডৈ-এ উঠিবে কোথা হইতে?”

ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে ৫২ বছর। মনে হয়, আমরা যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি। আমরা নিত্যদিন উন্নয়নের গল্প শুনি। নতুন নতুন রাস্তাঘাট হচ্ছে। সন্ধ্যা হলে নিয়ন বাতির ছটায় চারদিক জ্বলজ্বল করে। ঢাকার স্কাইলাইন আমূল বদলে গেছে। তারপর দেখি, এর পাশাপাশি মধ্যযুগীয় অব্যবস্থাপনা। সুন্দর সুন্দর সড়ক অগুনতি ব্যাটারি রিকশার দখলে চলে গেছে। একদল সুশীল এতটাই গরিবের বন্ধু হয়ে উঠেছেন যে, এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তারা সড়কে পাঠাও বাইক আর ব্যাটারি রিকশার পক্ষ থেকে শ্রেণিসংগ্রাম করে বেড়াচ্ছেন। গণপরিবহণ বলতে কিছু নেই। করদাতারা টেম্পো-বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে ঝুলতে থাকেন, মেট্রোতে দাঁড়িয়ে থাকেন ঠাসাঠাসি করে। আর তাদের টাকায় কিছু লোক গাড়ি হাঁকিয়ে চলেন। তাদের গণপরিবহণ ব্যবহার করতে হয় না বলে এই খাতের কোনো উন্নয়ন হয় না।

কী এমন খরচ হয়, যদি ঢাকা শহরে পাবলিক সেক্টরে পাঁচ হাজার বাস নামিয়ে দেওয়া যায়। আমাদের সরকারের কর্তারা পরিবহণ মাফিয়ার ভয়ে কুঁচকে থাকেন। অথবা বলা যায়, সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী এ পরিবহণ মাফিয়ার সর্দার। আমি আর তাদের নাম বললাম না। পাঠক তাদের চেনেন। পাকিস্তান আমলে ইপিআরটিসির বাসে চড়ে আমরা স্কুল-কলেজে যেতাম। আমি এটাকে এখনো গণপরিবহণ ব্যবস্থার মডেল হিসাবে দেখি।

হাসিনা আমলে ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের কিছু প্রস্তাব ছিল। পরিবহণ মাফিয়াকে সঙ্গে নিয়েই তিনি ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজির কথা বলেছিলেন। সেটি আলোর মুখ দেখেনি। আসলে আমাদের মতো দেশে গণপরিবহণ থাকতে হবে সম্পূর্ণ পাবলিক সেক্টরে। মানুষ বাসে যাতায়াত করতে পারলে সড়কে অনিয়ন্ত্রিত রিকশা, পাঠাও বাইক, বেবিট্যাক্সি আর করদাতার পয়সায় মুফতে গাড়ি চড়ার বিলাস আপনা আপনি কমে আসবে।

আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার হাল দেখলে কেউ এটাকে সভ্য দেশ বলবে না। সড়কে যে নিত্যদিন হত্যাকাণ্ড চলছে, আমরা তার নাম দিয়েছি সড়ক দুর্ঘটনা। যার যা খুশি করে বেড়াচ্ছে। নিয়ম-শৃঙ্খলার বালাই নেই। উলটো পথে গাড়ি চলাচলের যে রেওয়াজ চালু হয়েছে, তা ক্রমে বাড়ছে। এ নিয়ম ভাঙার প্রতিযোগিতায় পুলিশ, উচ্চ আদালতের বিচারপতি আর মন্ত্রীরাও আছেন।

বাজেট প্রসঙ্গে অনেক কথা বললাম। ধান ভানতে শিবের গীতের মতো। কিন্তু কথাগুলো জরুরি মনে করি। এভাবে একটা দেশ চলতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে মানুষ ভাবতে শুরু করবে-‘দেশ গোল্লায় যাক। আপনি বাঁচলে বাপের নাম।’ এটা জেনেই অনেকে তাদের ছেলেপুলেদের বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন আর দেশে থেকে দেশবাসীকে দোহন করে চলেছেন। সরকার বদলে গেলে আমরা জানতে পারি, বিদেশে কার কয়টা বাড়ি।

ওপরে ওপরে চুনকাম করে কিংবা পলেস্তারা লাগিয়ে কাজ হবে না। ভেতরে ঘুণে ধরেছে, ক্ষয়ে গেছে। এখনো সংবিৎ ফিরে না পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তার আলামত দেখা যাচ্ছে।

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারি ফাঁস

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারি ফাঁস

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আস্থার সংকট

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আস্থার সংকট

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম