রাজস্ব সংস্কার : সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পূর্বশর্ত
Advertisement
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত রাষ্ট্রে উত্তরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এ যাত্রায় বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য। একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও করদাতাবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। তাই সময়ের দাবি, একটি সমন্বিত ও দূরদর্শী রাজস্ব সংস্কার।
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজস্ব হলো প্রাণশক্তি। মানবদেহে যেমন হৃৎপিণ্ড রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে শরীরকে সচল রাখে, তেমনি রাষ্ট্রের প্রতিটি কার্যক্রম পরিচালিত হয় রাজস্ব আয়ের ওপর ভিত্তি করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিক সেবার প্রায় সব ক্ষেত্রই রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল। তাই রাজস্ব ব্যবস্থার শক্তিশালী ভিত্তি ছাড়া কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করলেও বাংলাদেশে এখনো কাঙ্ক্ষিত কর-সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রাজস্ব আহরণে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু নীতিগত দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা, প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, কর ফাঁকি এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি রাজস্ব ব্যবস্থাকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি। ফলে অর্থনীতির আকার বাড়লেও রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি।
বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় দিনদিন বাড়ছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বাস্তবতায় অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই রাজস্ব সংস্কারকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কর-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে : বাংলাদেশে কর প্রদানকে এখনো অনেকেই বোঝা হিসাবে বিবেচনা করেন। অথচ রাষ্ট্রের সব ধরনের সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পেছনে করদাতাদের অবদান রয়েছে। একজন কৃষক যখন কোনো পণ্য ক্রয় করেন, একজন শ্রমিক যখন ভ্যাট প্রদান করেন কিংবা একজন ব্যবসায়ী যখন আয়কর দেন-সবাই রাষ্ট্র পরিচালনায় অবদান রাখেন। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় কর প্রদানকে নাগরিক দায়িত্ব ও দেশপ্রেমের অংশ হিসাবে দেখা হয়। বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। করদাতাদের সম্মান দেওয়া, সেবার মান বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থাকে সহজ ও বোধগম্য করার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা সম্ভব। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
রাজস্ব প্রশাসনে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন : চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রযুক্তি ছাড়া কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখা সম্ভব নয়। রাজস্ব প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে হবে। কর নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল, কর পরিশোধ, অডিট, আপিল এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিসহ সব কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার কর ফাঁকি শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে করদাতা ও কর কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ কমানো গেলে দুর্নীতি ও হয়রানিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। অটোমেশনে প্রাথমিক ব্যয় কিছুটা বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সময় সাশ্রয় এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।
গবেষণাভিত্তিক রাজস্ব নীতি প্রণয়ন : রাজস্ব সংস্কারকে সফল করতে হলে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিভিন্ন দেশের করনীতি, রাজস্ব প্রশাসন এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে একটি শক্তিশালী গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণ ইউনিট গড়ে তোলা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করে রাজস্ব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
কর নেট সম্প্রসারণের বিকল্প নেই : বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখনো কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। রাজস্ব বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি করা। প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যভান্ডার, ব্যাংকিং তথ্য, সম্পদ নিবন্ধন, ব্যবসায়িক তথ্য এবং অন্যান্য সরকারি ডেটাবেজের সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন করদাতাদের চিহ্নিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে অযৌক্তিক কর অব্যাহতি ও কর সুবিধাগুলোও পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। করের হার না বাড়িয়ে কর নেট সম্প্রসারণ করা গেলে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং কর ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারও প্রতিষ্ঠিত হবে।
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা জরুরি : আধুনিক রাজস্ব প্রশাসনের জন্য দক্ষ, সৎ এবং প্রযুক্তিবান্ধব জনবল অপরিহার্য। শুধু প্রযুক্তি স্থাপন করলেই হবে না; সেই প্রযুক্তি পরিচালনায় সক্ষম মানবসম্পদও গড়ে তুলতে হবে। কর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দক্ষতা ও কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে প্রণোদনা প্রদান করলে প্রশাসনের কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন : কর কর্মকর্তা ও করদাতার সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে অবিশ্বাস ও সন্দেহের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে হবে। করদাতাকে প্রতিপক্ষ নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে করদাতাদেরও সঠিক তথ্য প্রদান এবং নিয়মিত কর পরিশোধের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের ভিত্তিতে একটি আধুনিক কর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
সমন্বিত রাজস্ব নীতি প্রয়োজন : রাজস্ব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। করনীতি, কর আইন, প্রশাসনিক কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে অধিকতর সমন্বয় নিশ্চিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কর ব্যবস্থা সহজীকরণ করতে হবে, যাতে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে উৎসাহিত হন।
শিক্ষাব্যবস্থায় কর বিষয়ে অন্তর্ভুক্তি : কর সংস্কৃতি গড়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কর, ভ্যাট এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা যদি ছোটবেলা থেকেই করের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা দায়িত্বশীল নাগরিক ও সচেতন করদাতায় পরিণত হবে।
নিয়মিত করদাতাদের জন্য প্রণোদনা : যারা দীর্ঘদিন নিয়মিতভাবে কর প্রদান করেন, তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করা যেতে পারে। সম্মাননা, বিশেষ সেবা, সহজ ঋণ সুবিধা কিংবা অবসরকালীন সুরক্ষামূলক কর্মসূচি করদাতাদের উৎসাহিত করতে পারে। করদাতারা যখন অনুভব করবেন, রাষ্ট্র তাদের অবদানকে মূল্যায়ন করছে, তখন স্বেচ্ছায় কর প্রদানের প্রবণতাও বৃদ্ধি পাবে।
রাজস্ব সংস্কার কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় কর্মসূচি। করদাতা, রাজস্ব প্রশাসন, ব্যবসায়ী সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি নয়, বরং একটি টেকসই কর-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। কারণ শক্তিশালী রাজস্ব ভিত্তি ছাড়া উন্নত, আত্মনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সময়ের দাবি সাহসী, দূরদর্শী এবং সমন্বিত রাজস্ব সংস্কার। আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই আগামী দিনের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করবে।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : রাজস্ব, সমাজ ও পরিবেশ বিশ্লেষক; নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ
