Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

চামড়াশিল্প হতে পারে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা

Advertisement

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চামড়াশিল্প হতে পারে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা

Advertisement

এবারের কুরবানির ঈদে পশুর চামড়া নিয়ে যে মহা কেলেঙ্কারি হয়ে গেল তাতে দেশবাসী ক্ষুব্ধ ও চরমভাবে অসন্তুষ্ট। কয়েক বছর ধরে কুরবানির ঈদের সময় পশুর চামড়া নিয়ে একই ধরনের কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। ৪-৫ বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। কুরবানির পশু জবাই করার পর পশুর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম নিয়ে পুরোদস্তুর দরকষাকষি করত। কিন্তু গত কয়েক বছরে কোথাও এরকম দৃশ্য দেখা যায়নি।

এবার যা ঘটেছে, তা উদ্বেগজনক। যারা নামমাত্র দামে কুরবানির পশুর চামড়া কিনেছিল মোকামে নিয়ে সেগুলো বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে, তারা কেনা দাম তো পায়ইনি, এমনকি চামড়া পরিবহণের খরচও উঠাতে পারেনি। রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া খালে, ডোবায় ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছে অথবা গর্ত করে পুঁতে ফেলেছে। চামড়ার মতো একটি মূল্যবান সম্পদ এভাবে বিনষ্ট হতে দেখে কান্না চলে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ তার দেশকে বলেছিলেন, ‘দুর্ভাগা দেশ।’ কেন তিনি নিজ মাতৃভূমি সম্পর্কে এমন ক্ষুব্ধ মন্তব্য করেছিলেন, তা আজ পশুর চামড়া মূল্যহীন হয়ে পড়তে দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না।

গত কয়েক বছরে খামার পদ্ধতিতে গবাদি পশু লালনপালন ও মোটাতাজাকরণ ব্যাপকভাবে হচ্ছে। একসময় কুরবানির ঈদে দেশীয় পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় আমাদের ভারতীয় পশুর ওপর নির্ভর করতে হতো। সীমান্তপথে যখন চোরাচালানের পশু দেশের ভেতরে প্রবেশ করত, তখন আমাদের সীমান্তরক্ষীরা এসব দেখেও না দেখার ভান করত। কারণ দেশে পশুর ঘাটতি ছিল। আন্দাজ করা যায়, বিগত কয়েক বছরে কুরবানির পশুর চাহিদা বেড়েছে। পশুর বাজার নিয়ে সাধারণ মানুষের ঔৎসুক্যেরও ঘাটতি নেই। পশুর হাট ইজারা নিয়ে অনেক ব্যবসায়ী ভালো ব্যবসা করে। তদুপরি হাটকেন্দ্রিক নানা কর্মকাণ্ডে সাময়িকভাবে অনেকের কর্মসংস্থান হয়। সব মিলিয়ে বলা যায় পশুর হাটকে কেন্দ্র করে কুরবানির অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।

অধিক সংখ্যক পশু কুরবানি হওয়ার ফলে চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণের চাহিদাও বাড়ে। এবার অনেকে অভিযোগ করেছেন, পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় লবণের দাম বেড়ে গিয়েছিল। পর্যাপ্ত লবণ থাকলে সংরক্ষণ করে চামড়ার মূল্য ধরে রাখা যায় এবং চামড়া পরবর্তী পর্যায়ে অধিকতর প্রক্রিয়াকরণে কাঁচা চামড়াকে ব্যবহার করা সম্ভব।

দেশব্যাপী কুরবানির পশুর চামড়ার কার্যত কোনো মূল্য না থাকায় শেষ বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পশুর খামারিরা। কারণ পশু লালনপালন করে বড় করে তুলতে পারলে চামড়ার পরিধিও বিস্তার লাভ করে এবং প্রতিটি পশুতে মূল্য সংযোজন হয়। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, পশু বিক্রয় করে খামারিরা যে দাম পেত চামড়ার দাম মারাত্মকভাবে পড়ে যাওয়ায় তেমন দাম পায় না। অর্থনীতির ভাষায় বলা যায় জিডিপির একটি অংশ কাজে না লাগায় হারিয়ে যায়। জাতীয় অর্থনীতির জন্য এ ক্ষতি খুবই উদ্বেগজনক এবং চিন্তার বিষয়। নানাভাবে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি হয়। দুর্যোগ ঘটনায় যেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়, তেমনই কুরবানির পশুর চামড়ার দাম না থাকার ফলে এ ক্ষতি আরও গভীর হয়। ’৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে যে সংখ্যক কুরবানি দেওয়া হতো, তার প্রতিটি চামড়া ২-৩ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। ওই সময় চামড়ার বাজার চাহিদার দিক থেকে এতই তেজি ছিল যে, চামড়া হয়ে উঠেছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্য। জানি না আওয়ামী লীগের শাসনক্ষমতার সঙ্গে চামড়ার কি যোগসূত্র যে, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিনের জন্য ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে বিশাল এই শিল্পে ধস নামতে শুরু করে।

চামড়া বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় মাল্টি বিলিয়ন ডলার খাত। বাংলাদেশে পোশাক খাতে যে আকর্ষণীয় বিকাশ হয়েছে তার বাইরে অন্য কোনো খাতে শিল্পের তেমন বিকাশ হয়নি। বছরের পর বছর পেশাক মালিকরা যে মুনাফা করেছেন তা যদি তারা পোশাকশিল্পের বাইরে অন্য খাতে, বিশেষ করে চামড়াশিল্প খাতে বিনিয়োগ করতেন; তাহলে চামড়াশিল্প রমরমা হয়ে উঠতে পারত। দুষ্টুলোকরা বলে, পোশাক খাতের মালিকরা বছরের পর বছর প্রণোদনাপুষ্ট হয়ে যে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে তার একটি অংশ তারা বিদেশেই রেখে দেয়। যদি তারা পোশাক খাত থেকে লব্ধ অর্থ চামড়াসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ করত তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখী হতো। এতে অর্থনীতির শক্তি সামর্থ্য অনেক গুণ বেড়ে যেত।

চামড়া খাতকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শুধু ফাঁকা আশ্বাসে কাজ হবে না। প্রয়োজন নীতি সংস্কার এবং সাভার ট্যানারি পল্লির পরিবেশগত সমস্যা দূর করা। চামড়া খাতে পুনর্জাগরণ সম্ভব হলে এ খাতটি পোশাক খাতের মতোই মূল্যবান একটি খাতে পরিণত হবে। বস্তুত পোশাক খাতের তুলনায় বাংলাদেশে চামড়া খাতের অধিকতর সুবিধা রয়েছে। কারণ এর কাঁচামাল হলো পশুর চামড়া। এই চামড়া এ দেশেরই একটি পণ্য।

চামড়াশিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্ভাবনাময় একটি শিল্প এবং এ শিল্পে ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। দুর্ভাগ্যের বিষয় ট্যানারি স্থানান্তরে সুপরিকল্পনার অভাব, পরিবেশগত দায়দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা এবং চামড়ার বাজারে চরম কারসাজিকারী ব্যক্তিদের উপস্থিতি চামড়াকে সত্যি সত্যি পচনশীল পণ্যে পরিণত করেছে। এবার মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্রদের চামড়া সংগ্রহে উৎসাহিত হতে দেখা যায়নি। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল, এ চামড়া বিক্রি করতে গেলে তারা কিছুই পাবে না বরং চামড়া হবে তাদের গলার ফাঁস। এভাবে মাদ্রাসা ও এতিমখানার গরিব ছাত্র ও বাসিন্দারা তাদের বেঁচে থাকার একটি বড় উৎস থেকে বঞ্চিত হলো।

পুরান ঢাকার হাজারীবাগ ছিল চামড়াশিল্পের মূল কেন্দ্র। হাজারীবাগের ট্যানারির বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলা হতো। চামড়ার বর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্যরে দূষণে বুড়িগঙ্গার পানি ভয়াবহভাবে দূষিত হয়ে পড়ে। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্প সাভারের হরিণধরায় স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় আজ অবধি হরিণধরার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ শোধন প্লান্টটির বর্জ্য শোধন ক্ষমতা ২৫ হাজার কিউবিক মিটার। কিন্তু কুরবানির ভরা মৌসুমে বর্জ্যরে পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ হাজার কিউবিক মিটারে। ফলে অপরিশোধিত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ধরেশ্বরী নদীতে গিয়ে পড়ছে এবং পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটছে। বুড়িগঙ্গাকে এখন পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি। কিন্তু নতুন করে হত্যা করা হচ্ছে ধলেশ্বরীকে। হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্প সাভারের হরিণধরায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে সঠিক হলেও এ প্রকল্পের ব্যাপ্তি ও ভবিষ্যৎ বিকাশ সম্পর্কে সুষ্ঠু ধারণা না থাকায় সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। দেশে মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা সম্ভব হলেও হরিণধরার ট্রিটমেন্ট প্লান্টটির প্রতি যথাযোগ্য মনোযোগ দেওয়া হয়নি। এটা সীমাহীন দায়িত্বহীনতার পরিচয়বাহী।

পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে না পারায় বাংলাদেশ বৈশ্বিক মানদণ্ড ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ সনদ পাচ্ছে না। এ সনদ না থাকায় ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত চামড়া যথাযোগ্য গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না। ফলে দেশের ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে এবং ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চামড়া যাচ্ছে এমন কিছু দেশে যেখানে চামড়ার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কম। এক কথায় বাংলাদেশের চামড়া পরিবেশগত মান অর্জন করতে না পারায় দুর্দশার মধ্যে পড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অভিঘাত নিপতিত হয়েছে দেশীয় তৃণমূলের কাঁচা চামড়ার বাজারে। যেখানে গরুর গোশতের দাম ও গবাদি পশুর মূল্য দ্বিগুণ হয়েছে, সেখানে চামড়ার দাম নেমে গেছে ৪ ভাগের ১ ভাগে।

কাঁচা চামড়ার বাজারে যে ধস নেমেছে তার জন্য অভিযোগের তীর নিক্ষিপ্ত হচ্ছে ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের যোগসাজশের ওপর। কাঁচা চামড়ার বাজারে এ যোগসাজশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। সরকার প্রতিবছর কাঁচা চামড়ার দাম বেঁধে দিলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই। আড়তদাররা ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা না পাওয়ার অজুহাতে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নামমাত্র দামে কাঁচা চামড়া কিনে। এর পাশাপাশি রয়েছে ব্যাংক ঋণের অপর্যাপ্ততা।

সমস্যার সমাধানকল্পে সাভারের বর্জ্য শোধনাগারের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। ট্যানারি শিল্পে বিনিয়োগকারী ব্যক্তিরা যাতে নিজেরাই প্রয়োজন মতো বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনমাফিক ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিতে হবে। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ সনদ অর্জন ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত চামড়ার চাহিদা বাড়বে এবং ভালো মুনাফাও পাওয়া যাবে। দেশের প্রধান প্রধান চামড়ার মোকামগুলোতে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও হিমাগার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সহজ শর্তে ট্যানারি মালিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের জন্য মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ব্যাংক ঋণ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের শহর ও নগরের ফুটপাতগুলোতে বিচিত্র ডিজাইনের পাদুকার যে সমাহার দেখতে পাওয়া যায়, তা থেকে মনে হয় বাংলাদেশে ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে একটি পাদুকার বাজার তৈরি হয়েছে। এ প্রাথমিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে চামড়াশিল্পকে যথার্থ অর্থে একটি মাল্টি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত করার জন্য সময় উপযোগী জাতীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শতফুল ফুটতে দাও মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

অন্যমত স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম