অতিকায় শ্বেতহস্তী হয়ে উঠেছে জাতীয় সংসদ
Advertisement
মহিউদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৭ জুন জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্য মিজানুর রহমান সংসদ-সদস্যদের বরাদ্দ দেওয়া ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও পর্দা দেওয়ার দাবি জানান। এটি নিয়ে কিছু আলোচনা-সমালোচনা হয়।
এ নিয়ে ১৮ জুন সরকারি জোটের সদস্য আন্দালিব রহমান পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, জামায়াত এমপির ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও পর্দা চাওয়া বৃহৎ অর্থে সংসদকে ‘এফেক্ট’ করেছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে অনেকের টেলিফোন পেয়েছেন। গণমাধ্যম প্রতিবেদন করেছে। এটি সংসদের জন্য লজ্জার। বলেছেন, তিনি নিজ থেকে সংসদ-সদস্য মিজানুর রহমানকে মাইক্রোওভেন দিতে চান। একই সঙ্গে তিনি ওই সদস্যের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ওয়াশিং মেশিন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পর্দা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।
তার বক্তব্যের পর বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান পালটা প্রশ্ন রাখেন, ‘ওনার কাছে চাইছে নাকি?’ আর আন্দালিবের বক্তব্যের বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টি পয়েন্ট অব অর্ডারের মধ্যে পড়ে না।
এখানে দুটি বিষয় আমার নজর কেড়েছে। এক. আন্দালিব রহমান বলেছেন-এটি সংসদের জন্য লজ্জার। এটি তিনি কেন বলেছেন, তিনিই তার ব্যাখ্যা দেবেন। আমি তো তার মন পড়তে পারি না! হতে পারে, তিনি হয়তো ভেবেছেন, এসব গৃহস্থালি সামগ্রীর জন্য আবদার করায় সংসদের মানমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। সংসদ তো মহান, পবিত্র। সেখানে দাঁড়িয়ে এসব তুচ্ছ বস্তুর জন্য বায়না ধরা কতটুকু শোভন? বোঝা গেল, তার লজ্জা-শরম আছে। তার আরেকটি কথায় মনে হয়েছে, ওই সংসদ-সদস্য যা চাইছেন, সেটি অনেকটা ভিক্ষার পর্যায়ে পড়ে। তার দয়ার শরীর। তিনি নিজেই আগ বাড়িয়ে একটা সামগ্রী তাকে দান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং বাকি দুটো যাতে লিল্লায় পাওয়া যায়, সেজন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন।
দুই. বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, ‘ওনার (আন্দালিবের) কাছে চাইছে নাকি’? এই চাওয়াটা কতটুকু শোভন ও যৌক্তিক, এ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা কিছু বলেননি। তার কথা থেকে মনে হয়েছে, এসব জিনিস চাওয়া যেতেই পারে। তবে তা কেন ‘ভিক্ষা’ হবে? এটা তো ‘প্রাপ্য’।
স্পিকার সংসদের প্রচলিত বিধিতে পড়ে না বলে বিষয়টি থামিয়ে দিয়েছেন। কোনো রুলিং দেননি। অর্থাৎ, এসব জিনিস চাওয়া ঠিক না বেঠিক, সে প্রসঙ্গ তিনি এড়িয়ে গেছেন। এখান থেকে একটা কথা আন্দাজ করা যায়, জামায়াতের ওই সদস্য যা চেয়েছেন, সেসব যদি বরাদ্দ করা হয়, তাহলে তার সুবিধা শুধু তিনিই পাবেন না, সংসদের সব সদস্যই পাবেন। এখানে সরকারি দল আর বিরোধী দলের মধ্যে কোনো ফারাক থাকবে না।
আমরা অতীতে দেখেছি, সংসদ-সদস্যদের বেতনভাতা, সুবিধা ও ক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে যেসব প্রস্তাব বা বিল উত্থাপন করা হয়, তাতে সবাই ‘হ্যাঁ’ বলেন। একমাত্র এ ক্ষেত্রেই আমরা ‘জাতীয় ঐকমত্যের’ পরাকাষ্ঠা দেখি। আর প্রায় সব ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে দেখি আড়াআড়ি। ইনি যদি বলেন ‘হ্যাঁ’, তো তিনি বলেন ‘না’। দেখা যাচ্ছে, নিজেদের স্বার্থ-সুবিধার ব্যাপারে তাদের একটি গোষ্ঠীগত একতা আছে। সে ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি, সংসদ-সদস্যরা একটি শ্রেণি বা গোষ্ঠী। সিন্ডিকেটও বলা যেতে পারে। ৩৫০ জন সদস্যের এ ‘সিন্ডিকেট’ হচ্ছে দেশের ‘মালিক সমিতি’। তারা সিদ্ধান্ত নেন, তারা কীভাবে চলবেন, আর কীভাবে আমাদের চালাবেন। আমাদের কাজ হলো খাজনা দিয়ে যাওয়া।
আমাদের সংসদ-সদস্যরা সবাই মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মাননি। সংসদে তাদের যাওয়ার আগের অবস্থা সম্পর্কে আমরা কিছু জ্ঞান রাখি। গত দশ-বিশ বছরের একটা হিসাব নিলে বোঝা যাবে, কে কোথায় ছিলেন এবং এখন কোথায় পৌঁছেছেন। খুব সাদামাটা পোশাকে চলাফেরা করা অনেক পুরুষ সদস্য সংসদে গিয়েই স্যুটেড-বুটেড হয়ে যান। যাকে জীবনে কোনোদিন কোট-টাই পরতে দেখিনি, তিনি এই ইউরোপীয় পোশাক পরে সংসদ আলো করে বসে থাকেন। তাদের ধারণা, সেখানে পৌঁছাতে পারলে ‘এলিট’ হওয়া যায়। আর এলিট হলে তো লুঙ্গি-খদ্দর পরা চলে না। আধুনিক কেতায় নিজেকে সাজাতে হয়।
পোশাকের আবার দলীয় পরিচয়ও আছে। অনেক সময় পোশাক দেখলে বোঝা যায়, তিনি কোন দলের লোক। একটি দল ছিল, যার সদস্যদের দেখলে পেঙ্গুইনের মতো লাগত। এ সংসদে তারা নেই। এখনো একটি দল আছে, ঢিলেঢালা পোশাক দেখেই তাদের চেনা যায়।
আমাদের একটি সংবিধান আছে। সংসদের কতজন সদস্য এটি পড়েছেন, বলা মুশকিল। যদি সবার একটি লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাহলে বেশির ভাগই নির্ঘাত ফেল করবেন বলে আমার আশঙ্কা। তারা আবার সংবিধানের হেফাজতকারী। ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।’
তো সংবিধানে লেখা আছে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। এ কথার মোজেজা কী? আমার যা বুঝে আসে, তার ভিত্তিতে বলছি। দেশের মালিক দেশের নাগরিকরা। তাদের হয়ে দেশের দেখভাল করবে জাতীয় সংসদ। তাদের মধ্য দিয়ে নাগরিক ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে। বলা যায়, তারা রাষ্ট্র নামক সংসারের ‘কেয়ারটেকার’। সংবিধানে জনগণের দেওয়া নিয়মনীতি মেনে তারা দেশটা চালাবেন।
আমরা আমাদের অনেকের বাড়িতে কেয়ারটেকার রাখি। কেয়ারটেকারের কাজ হলো আমাকে নির্দিষ্ট কিছু সেবা দেওয়া। তার কাজকর্ম আমার পছন্দ না হলে আমি তাকে পত্রপাঠ বিদায় করে দেব। সে জায়গায় আরেকজনকে নিয়োগ দেব। সংসদকে আমরা সেভাবে দেখতে পারি। একদল লোককে আমরা ভোট দিয়ে সেখানে পাঠাই আমাদের হয়ে কথা বলতে ও কাজ করতে। তাদের কথা ও কাজ যদি পছন্দ না হয়, যদি ক্ষতিকর মনে হয়, তাহলে পরবর্তী নির্বাচনে আমরা তার বদলে আরেকজনকে নিয়ে আসি। গণতন্ত্র বলতে আমি এটাই বুঝি। ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করার এ সার্বভৌম ক্ষমতা আমাকে দিয়েছে সংবিধান।
কেউ কেউ ভাবতে পারেন, জাতীয় সংসদ হচ্ছে সার্বভৌম। এ কথার মধ্যে একটা ফাঁকি আছে। সংসদ নয়, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হচ্ছেন জনগণ। সংসদ হচ্ছে তাদের প্রতিনিধিত্বশীল একটি ফোরাম। সংসদ যদি জনগণের ওপর সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসে, তাহলে বুঝতে হবে, সংসদ-সদস্যরা সংবিধান মানছেন না, আইন ভাঙছেন, অনধিকার চর্চা করছেন, জনগণের ক্ষমতা রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে কেড়ে নিয়েছেন। তখন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়। বিদ্রোহে জনগণ জয়ী হলে তারা বলেন বিপ্লব হয়েছে। যারা হেরে যান, তারা বলেন, ষড়যন্ত্র হয়েছে।
শুরু করেছিলাম জনৈক সংসদ-সদস্যের আবদার নিয়ে। আবদার একবার মিটলে সেটি আর সেখানেই শেষ হবে না। এরপর আসবে গাড়ি, প্লট, প্রাইভেট কার। মানুষের ক্ষুধার অন্ত নেই।
কথা হলো, সদস্য যা-ই চান, সেটি মেটাতে হলে চাপটা গিয়ে পড়ে সাধারণ করদাতাদের ওপর। সাধারণ নাগরিকদের যে আয়-রোজগার, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন-ভাতা পান সংসদ-সদস্যরা। এটি দৃশ্যমান। অদৃশ্য আছে অনেক কিছু। আমার কথা হলো, সীমিত আয়ের মধ্যে থেকে আমি যদি আমার বাসার জন্য এসব সামগ্রী কিনতে পারি, এত বেতন-ভাতা পেয়ে তিনি কেন পারেন না?
আমাদের মধ্যে যাদের আর্থিক সামর্থ্য কম, আমরা বাজেট কাটছাঁট করে সংসার চালাই। পরিবারের কেউ অসুখে পড়লে তার চিকিৎসার খরচ নিয়ে হিমশিম খেতে হয়। সংসদ-সদস্যরা ফ্রি চিকিৎসা পান দেশে এবং বিদেশে। এই যে শুনি, অমুক কর্তা হাঁচি সারাতে ছুটে গেছেন সিঙ্গাপুর কিংবা লন্ডন, তিনি তার গাঁটের পয়সা খরচ করে যাননি। তার চিকিৎসার খরচ বইতে হয়েছে জনগণকে। তাকে যাতায়াতের জন্য যে গাড়ি, চালক ও তেল দেওয়া হয়, সবটাই জনগণের টাকায়। তারা কি চোখে দেখেন না, চিকিৎসা না পেয়ে অনেক আদমসন্তান হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে পড়ে পরপারে চলে যাচ্ছেন? যাদের টাকায় তিনি এসইউভি চড়েন, সেই জনগণ টেম্পো-বাসে ঝুলতে থাকেন!
একটা গরিব দেশ। বিভিন্ন সময়ে ‘মালিক সমিতি’র সদস্যরা দেশটিকে দোহন করতে করতে ছ্যাবড়া বানিয়ে ফেলেছে। তারপরও এটা থেমে নেই। এটা কি কখনো বন্ধ হবে না? কোথায় আমাদের সংসদ-সদস্যরা দেশের উন্নয়নের কথা বলবেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল বন্ধু তৈরি করবেন, পাসপোর্টের মর্যাদা বাড়াবেন, স্কুল-কলেজ-হাসপাতালে যে নৈরাজ্য চলছে, সেটি থামাবেন, তা নয়। তারা আছেন তাদের ব্যক্তিগত চাহিদা আর সুবিধা নিয়ে। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমাদের জাতীয় সংসদ একটি অতিকায় শ্বেতহস্তী হয়ে উঠেছে। আমরা পরিত্রাণ চাই।
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক
