মিয়ানমার সীমান্ত, গোয়েন্দা ও ভূরাজনীতি
Advertisement
মেজর জেনারেল এইচআরএম রোকন উদ্দিন (অব.)
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মিয়ানমারের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নিরাপত্তা কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে এমন এক ‘গোয়েন্দা-রাষ্ট্র’ মডেলে গড়ে উঠেছে, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামরিক আধিপত্য এবং গোয়েন্দা তৎপরতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৯১৭ সালের ‘টাউন অ্যাক্ট’ এবং ‘ভিলেজ অ্যাক্ট’র মতো ঔপনিবেশিক আইনের ধারাবাহিকতা আজও মিয়ানমারের সমাজে নিয়ন্ত্রণমূলক প্রশাসনের ভিত্তি হিসাবে কাজ করছে। এ আইনের ফলে নাগরিকদের চলাফেরা, বিশেষ করে রাতযাপন পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে-যা কার্যত একটি নজরদারি রাষ্ট্রের সূচনা করে। স্বাধীনতার পর থেকেই মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্ব গোয়েন্দা কাঠামোকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে। বিশেষ করে জেনারেল জে. নেউইনের শাসনামলে (১৯৬২-১৯৮৮) গোয়েন্দা তৎপরতা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। পরবর্তীকালে খিন ন্যুন্টের নেতৃত্বে ডিরেক্টরেট অব ডিফেন্স সার্ভিসেস ইন্টিলিজেন্স (ডিডিএসআই) একটি শক্তিশালী ও প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ডিডিএসআই, ওএসএস (অফিস অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ) এবং ওসিএমআই (অফিস অব চিফ অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স)-এর মতো সংস্থাগুলো কেবল নিরাপত্তা নয়, অর্থনীতি, কূটনীতি ও প্রশাসনের ওপরও গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
মিয়ানমারের গোয়েন্দা ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য হলো এর বিস্তৃত মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। ১৯৯০-এর দশক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন এবং প্রতি ১০ জন সরকারি কর্মচারীর জন্য একজন করে নজরদারির অভিযোগ ওঠে। যদিও এসব সংখ্যার নির্ভুলতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তথাপি বাস্তবতা হলো-মিয়ানমারে পারস্পরিক অবিশ্বাস্য একটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। নাগরিকরা নিজেদের মধ্যে সংবেদনশীল তথ্য ভাগাভাগি করতে ভয় পায়, কারণ যে কেউ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য হতে পারে-এমন ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ ভয় ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি শুধু বাস্তব প্রশাসনিক কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও প্রভাব ফেলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পত্রিকা এবং সিরিজধর্মী গল্পে গোয়েন্দা তৎপরতার নানা মিথ ও কাহিনি প্রচার করা হয়, যা জনগণের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমারের গোয়েন্দা তৎপরতা উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৭ সালে আসিয়ানের সদস্যপদ লাভের পেছনে কূটনৈতিক লবিং ও গোয়েন্দা সংযোগের ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়। একই সময়ে থাইল্যান্ডের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, মিয়ানমার তার সামরিক বাজেটের ২০-৩০ শতাংশ গোয়েন্দা খাতে ব্যয় করে, যা পরবর্তী সময় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এ সংস্থাগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বৈধ ও অবৈধ ব্যবসা, বিশেষ করে মাদক অর্থনীতি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তারা নিজস্ব অপারেশন পরিচালনা করে। অং সান সু চি গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে আসার পরও গোয়েন্দা ও সামরিক কাঠামোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তার সরকারের ক্ষমতা মূলত সীমিত ছিল, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত মন্ত্রণালয় সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই থেকে যায়।
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় মিয়ানমার একটি ‘সন্দেহপ্রবণ রাষ্ট্র’ হিসাবে পরিচিত। ভারত, চীন, বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মাঝখানে অবস্থিত এ দেশটি প্রায় সব প্রতিবেশীকেই সম্ভাব্য হুমকি হিসাবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের এ গোয়েন্দাপ্রধান রাষ্ট্রব্যবস্থা কেবল একটি প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা নয়; বরং এটি সরাসরি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব বিস্তারকারী একটি জটিল বাস্তবতা। এ প্রভাবকে তিনটি প্রধান মাত্রায় আরও গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন।
প্রথমত, সীমান্ত নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ দিন দিন আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত প্রায় ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর একটি বড় অংশ দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল ও বনভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত, যা কার্যকর নজরদারিকে স্বাভাবিকভাবেই কঠিন করে তোলে। মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন প্রদেশে চলমান সংঘাত, বিশেষ করে সামরিক জান্তা ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ, সীমান্তকে একটি ‘অস্থিতিশীল সীমান্ত’-এ পরিণত করেছে। এর সরাসরি ফলাফল হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল, যেখানে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এ মানবিক সংকটের আড়ালে অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা (মেথামফেটামিন) ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের চোরাচালান একটি বড় নিরাপত্তা হুমকিতে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে টেকনাফ-কক্সবাজার করিডর এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাদক ট্রানজিট রুট হিসাবে পরিচিত। সীমান্তে অনুপ্রবেশ, মানব পাচার, এমনকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের গোপন চলাচল-এসবই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
দ্বিতীয়ত, গোয়েন্দা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি একটি ‘নীরব হুমকি’ হিসাবে কাজ করে, যা দৃশ্যমান না হলেও অত্যন্ত গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। মিয়ানমারের মতো একটি রাষ্ট্র, যেখানে গোয়েন্দা কাঠামো রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রে অবস্থান করে, সেখানে প্রতিবেশী দেশে প্রভাব বিস্তারের জন্য মানব গোয়েন্দা ব্যবহার করা একটি স্বাভাবিক কৌশল। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির, সীমান্তবর্তী বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক, এনজিও কার্যক্রম কিংবা এমনকি অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যেও অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ধরনের অনুপ্রবেশ শুধু তথ্য সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি, সামাজিক অস্থিরতা উসকে দেওয়া, বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা কৌশলগত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ব্যবহার হতে পারে। ফলে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য ‘কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স’-এর সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে। মিয়ানমার ভূরাজনৈতিকভাবে এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে ভারত ও চীন দুই পরাশক্তিরই স্বার্থ জড়িত। চীন মিয়ানমারে তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসাবে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, পাইপলাইন ও অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে ভারত অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি-এর আওতায় উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ও সংযোগ বৃদ্ধির জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এ প্রতিযোগিতার ফলে মিয়ানমার এক ধরনের ‘ভারসাম্য রক্ষাকারী রাষ্ট্র’ হিসাবে কাজ করে, যা কখনো চীনের দিকে, কখনো ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
বাংলাদেশ এ ভূরাজনৈতিক খেলায় একটি সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে। একদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক-এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা একটি সূক্ষ্ম কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমার যদি কোনো এক পক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে, বিশেষ করে নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য করণীয় কেবল প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া নয়, বরং একটি প্রোঅ্যাক্টিভ ও সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা। সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সমন্বয়, এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান-এ তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই একটি কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান ও আন্তর্জাতিকীকরণও বাংলাদেশের কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ হওয়া উচিত।
মিয়ানমারের গোয়েন্দানির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা-যেখানে নিরাপত্তা, কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ জটিল বাস্তবতা মোকাবিলায় প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি, দক্ষ নেতৃত্ব এবং আধুনিক রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের করণীয় সুস্পষ্ট ও বহুমাত্রিক হওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা-ড্রোন, স্যাটেলাইট নজরদারি ও স্মার্ট ফেন্সিং-জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক তথ্য বিনিময় শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকটের কূটনৈতিক সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে, যাতে মিয়ানমারের ওপর মানবিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়। চতুর্থত, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোকে আধুনিক ও পেশাদার করতে হবে, যাতে বাহ্যিক প্রভাব মোকাবিলা করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, মিয়ানমারের গোয়েন্দানির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা কেবল তার নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে না, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের জন্য এ বাস্তবতা বোঝা এবং একটি সমন্বিত, কৌশলগত ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
মেজর জেনারেল এইচআরএম রোকন উদ্দিন (অব.) : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
